
কোরবানির ঈদের পর থেকে আমার বউয়ের মেজাজ চারশো চল্লিশ। কেননা কাজের লোক বাড়িতে গিয়ে আর ফেরত আসেনি।
মুর্শিদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রথম কয়েকদিন সে নীলার ফোনই ধরেনি। আমার ফোন থেকে ফোন করার পর সে ধরে বলেছে
মামা আমিতো আর আসতে পারুম না।
কেন আসতে পারবি না?
আমারে জোর করে বিয়ে দিছে।
এরমধ্যে আমার কাছ থেকে ফোন নিয়ে নীলা তার সঙ্গে কথা বলছে।
তোরে জোর করে বিয়ে দেয় কেমনে? তোর না আগে আরো দুইবার বিয়ে হইছে। তুই যতবার বাড়ি যাস ততবার তোরে জোর করে বিয়ে দেয় কেমনে? এর আগে তুই দুইবার বাড়ি গেছোস। দুইবারই আসিস নাই কেননা তোরে নাকি জোর করে বিয়ে দিছে। আবার সেই বিয়ে ছয় মাসের মধ্যে ভাঙ্গে কেমনে?
মামী আমার কোন দোষ নাই। এলাকায় বউ হিসেবে আমার একটা সুনাম হইছে। তাই আমি বাড়ি গেলেই ছেলেরা সব হুমড়ি খাইয়া পড়ে আমারে বিয়ে করার লাইগা। এইবার মনে হয় আর ভাঙবো না।
কেন ভাঙবো না?
এইবার যারে বিয়ে করছি তার আচার ব্যবহার মামার মতো। আমি চিৎকার চেঁচামেচি করলেও খালি মামার মতো হাসে। তাই মনে হয় বিয়া এইবার আর ভাঙবো না।
নীলা ফোন কেটে আমার দিকে কটমটে চোখে তাকিয়ে বলছে
বাহ কাজের মেয়ে মুর্শিদাও তোমার মতো জামাই পাইছে। কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়বো না।
আমি ফিসফিস করে বললাম
সেটাতো আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়বে না।
করে না কো ফোঁসফাঁস
মারে নাকো ঢুসঢাস,
এমন জামাই তুমি কই পাবে?
চান্দু তার জন্য বলি নাই যে ছাড়বো না। মুর্শিদার এই তৃতীয় বিয়ের কারণও তুমি।
কি বলছো। আমি আজ পর্যন্ত কখনো প্রথম বিয়ের ঘটকালি করি নাই। তৃতীয় বিয়ের ঘটকালি করার প্রশ্নই আসে না।
যখন মেয়েটা গ্রামের বাড়ি যেতে চাইলো। আমি মানা করলাম। আমি বলেছি হবে না। তুই যেতে পারবি না। মেয়েটারও তেমন আগ্রহ ছিলো না।
মাঝখান দিয়ে তুমি এসে বললো
মানবিক কারণে হলেও ওকে গ্রামের বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটাতে পাঠানো উচিৎ।
আর এখন সেই মেয়ে বিয়ে করে বসে আছে। এরজন্য শতভাগ দোষী তুমি।
এরমধ্যে নীলা দেখি কাজের বুয়া সাপ্লায়ারকে তেল মারা শুরু করেছে।
আপা কতদিন আপনাকে দেখি না। আপনার জন্য গরুর ভুঁড়ি রেখে দিয়েছি। আপনাকে ছাড়া খেতে ইচ্ছে করে না। পায়াও রেখে দিয়েছি। একদিন আসেন। দুজন নান রুটি দিয়ে পায়া খাই। আরেকদিন পরোটা দিয়ে গরুর কালা ভুনা খাবো। আপনার সঙ্গে গল্প করে যে মজা পাই সেই মজা নিজের জামাইয়ের সঙ্গেও পাই না।
সাপ্লায়ার কয়েকজন বুয়াকে নিয়েও এসেছে। কিন্তু নীলার সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া হচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে নীলা আমাকে বললো
শুনো যেহেতু তুমি কাজের মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে যেতে দিয়ে তাকে বিদায় করেছো। এখন নতুন কাজের বুয়া তোমাকে ম্যানেজ করতে হবে। এই বুয়াগুলো কেমন আজব টাইপের। আমি যাই বলি, এরা আমার বাসায় কাজ করতে চায় না। এইবার তোমাকেই বুয়া ম্যানেজ করতে হবে।
আমি মিনমিন কণ্ঠে বললাম
সংসারে বুয়া ম্যানেজ করাও কি আমার কাজ?
অবশ্যই তোমার কাজ।
বাজখাই স্বরে নীলার উত্তর।
আজকে সাপ্লায়ার নতুন বুয়া পাঠিয়েছে। নীলা আমাকে বলেছে বুয়ার ইন্টার্ভিউ নিতে।
আমি নতুন শার্ট প্যান্ট পরে ড্রয়িং রুমে ঢুকলাম। দেখি সোফার উপর এক মেয়ে বসে আছে। তাকে বুয়ার মতো যদিও মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে কিছু এসিস্ট্যান্ট থাকে যারা কুতকুতে চোখে সবজান্তার মতো করে তাকিয়ে থাকে।
এইতো কিছুদিন পূর্বেই আমি দাঁত দেখাতে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। এই চেহারার এসিস্ট্যান্ট এসে বললো
একটু বসেন। ডাক্তার এখন একটা ছোট ঘুম দিচ্ছে। ঘুম থেকে উঠেই আপনার দাঁত ফেলে দিবে।
আমি ভয় পেয়ে বললাম
আমিতো দাঁত ফেলতে আসিনি। দাঁত দেখাতে এসেছি।
উনি হেসে আমাকে বললেন
ঐ একই কথা। আপনি কেন দাঁত দেখাতে এসেছেন? নিশ্চয় ব্যথা করছে।
জি জি। দাঁতে ব্যথা।
তার মানে হয় আপনার দাঁত ফেলতে হবে। নাহয় নতুন দাঁত মানে ক্যাপ লাগাতে হবে। দুটোর একটা। এছাড়া দাঁতের আর কোন কাজ নেই। আমি যতটুকু বাইরে থেকে দেখছি। দাঁত ফেলাই লাগবে। এখন একটা টস করা যেতে পারে ম্যাডাম আপনার কোন দাঁত ফেলবে। আমি হলে আপনার আট নম্বরটা কিংবা নয় নম্বরটা ফেলতাম। টসে যেটা উঠতো।
সেই কথা শুনে আমি ভয়ে বাসায় চলে এসেছি। আজকে বুয়াকে দেখেও আমার একই টাইপের ভয় লাগছে।
সে আমার চেহারা দেখে বুঝতে পেরেছে কিনা বুঝলাম না। আমাকে জিজ্ঞেস করলো
স্যার আমার কাজ কি আপনার সঙ্গে? সারাদিন কি আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন?
আমি দ্বিগুণ আতংকিত হয়ে বললাম। আমি সারাদিন তোমার সঙ্গে থাকবো কেন?
স্যার ভুল বুইঝেন না। আমি জিজ্ঞেস করছি আপনি হাউজ হাজব্যন্ড কিনা। ঘরে থাকেন কিনা। আমিতো গুলশান কাজ করেছি। সেখানে অনেক হাজব্যন্ড বাসায় থাকতো। আমার সঙ্গে গল্প গুজব করতো। সুখ দুঃখের কথা কইতো। আজকে আপনারে দেখে মনে হচ্ছে আপনিও একই রকম দুঃখী মানুষ।
না না। আমি অফিস করবো। আমার বউ বাসায় থাকবে।
বুঝতে পারছি স্যার। তবে আপনি চিন্তা কইরেন না। আমি গুলশানে কাজ করছি। সবকিছুর আইডিয়া আছে। এই ধরেন যদি ড্রিংকস ট্রিঙ্কস করেন। খালি ইশারা দিবেন। আমি বরফ মিশাইয়া সার্ভ করুম।
আরে না না। আমরা ড্রিংকস করি না। আমরা তিনজন মাত্র মানুষ। তেমন কাজের চাপ নেই। বুয়াকে আমরা বাসার লোক মনে করি। সুখ দুঃখে পাশে থাকি।
স্যার এটা ভালো কইছেন। আমার অনেক দুঃখ। মাঝে মধ্যে সিগারেট খাইতে খাইতে দুঃখের কথা কইতে ভালো লাগে। স্যার আপনার সিগারেটের ব্রান্ড কি?
আমিতো সিগারেট খাই না।
কি কন স্যার। পুরাইতো নিরামিষ পরিবার। কেমনে কাজ করুম?
এরমধ্যে নীলা ড্রয়িং রুমে ঢুকে।
আরে না এটা কোন অসুবিধাই না। ও সিগারেট খায় মাঝে মধ্যে। এখন আমার ভয়ে স্বীকার করছে না। আমরা তোমাকে সিগারেট কিনে দিবো। তুমি রাতে তোমার ঘরে খাবে। আগের দিনে আমাদের মা-রা কাজের বুয়াদের পান কিনে দিতো না। এখনতো দিন বদলিয়েছে।
ম্যাডাম আপনাদের ভালো লাগছে। আমি আপনাদের কাজই নিমু। মাঝেমধ্যে বিদেশ গেলে আমারে নিয়া যাইয়েন। আমার পাসপোর্ট করা আছে। বিদেশে গেলে মন ভালো থাকে।
নীলা মাথা নাড়ে
অবশ্যই। অবশ্যই।
সেই কাজের মেয়ে একফাকে আমাকে বলছে
স্যার ফুট ম্যাসাজ দরকার হইলে আমারে কইয়েন। আমি আগে পার্লারে কাজ করতাম। একদম থাই ম্যাসাজ কইরে দিবো। মনে হইবো আপনি ব্যাংকক আছেন।
আমি বেডরুমে এসে নীলাকে বললাম
এমন একটা অতি আধুনিক কাজের মেয়ে কি আমাদের রাখা ঠিক হচ্ছে?
খ্যাতের মতো কথা বলবে না। নিজেকে আপডেট করো। গুলশানের হাইফাই কাজের লোক পাইছি।
সকাল বিকাল সুশি দিয়ে লাঞ্চ ডিনার করবো। রাতের বেলায় স্পা করবো। আর আমার বড়লোক্স ফেসবুকের পোস্ট দেখে সবার জ্বলবে।
আর এদিকে আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি
নিলা আমার এবং সেই মেয়ের সিগারেট টানার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছে
মাই হাব্বি এন্ড মাই কাজের মেয়ে। দুজন একসঙ্গে সিগারেট টানছে। আমরা তাকে পরিবারের অংশ মনে করি এবং আমরা আধুনিক।
আমি ভাবছি এই পোস্ট করার পর আমার কি হবে?
