সামাজিক অস্থিরতার নেপথ্যে রুচি সংস্কৃতি ও মুল্যবোধের অবক্ষয়

সম্প্রতি কুমিল্লায় এক ধর্ষিতা নারীর বিবস্ত্র ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে চরমভাবে আরো একবার অপমান করা হলো ভিডিও ধারন ও প্রচারকারী একবারও ভাবলো না এই নারীকে সারাজীবনের জন্য লোকসমাজের কাছে মেরেই ফেলা হলো

সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে কিছু ভিডিও দেখে আশাহত ও উদ্বিগ্ন হই। ক’দিন আগে দেখলাম জাতীয় ফল উৎসবে কিছু নারী পুরুষ ফল লুটপাট করে নিচ্ছে। এদের পোষাক দেখে মনে হয়নি কেউ অভাবী,ফল কিনে খাবার মত তাদের পয়সা নেই।

অন্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি হোটেলের বুফেতে কেতারদুস্তর পোষাক পরিহিতরা লাইন ধরে খাবার গ্রহন না করে হামলে পড়েছে। কে কার আগে খাবার প্লেটে তুলে নিবে তার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এদের পোষাক আশাক চেহারা দেখে মনে হলো, সবাই শিক্ষিত ও খুবই ভাল চাকুরি বা ব্যবসা বানিজ্যে যুক্ত। কিন্তু এরা কেন বুফে খাবার গ্রহনের সময় এরকমটি করলেন?

- Advertisement -

কিসের এতো তাড়াহুড়ো ছিল?

নাকি কেড়ে না নিলে পরে খাবার পাওয়া যেত না?

সম্প্রতি কুমিল্লায় এক ধর্ষিতা নারীর বিবস্ত্র ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে চরমভাবে আরো একবার অপমান করা হলো। ভিডিও ধারন ও প্রচারকারী একবারও ভাবলো না, এই নারীকে সারাজীবনের জন্য লোকসমাজের কাছে মেরেই ফেলা হলো। এরকম অসভ্যতা আমরা আগেও দেখেছি। কিন্ত এসবের বিরুদ্ধে পূর্বে কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করতে না পারায় উত্তরোত্তর নারী নিপীড়ন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় হেনস্তার ভিডিও প্রকাশের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব যারা করছেন তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে আমার যথেস্ট সন্দেহ রয়েছে। তাদের রুচি,সংস্কৃতি, মুল্যবোধ কিছু আছে বলে ভাবার কোন কারণ দেখি না।

একটু পিছনে ফিরে তাকাই। গত ১১ মাস আগে ফ্যাসিবাদের পতনের দিন গনভবন লুটপাট হতে সবাই দেখেছেন। বিশ্ব মিডিয়ায় সেই সংবাদ ফলাও করে ছাপা হয়েছে। হাঁস, মুরগি, পুকুরের মাছ, বাগানের সবজি হতে শুরু করে রান্না করা খাবার লুটপাট হয়েছে। লুটপাট হয়েছে গনভবনের আসবাবপত্র। এমন কি পলাতক প্রধানমন্ত্রীর শাড়ি,কাপড়, অর্ন্তবাস পর্যন্ত। কেউ কেউ লুটপাটের জিনিস হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে ছবি তুলেছে হাসিমুখে। সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়েছেন। সবচেয়ে ভয়ংকর ও অশ্লীলতার সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে অর্ন্তবাস হাতে নিয়ে দাঁত কেলিয়ে তোলা ছবি। কি জঘন্য মানসিক বিকারগ্রস্থ না হলে মানুষ এরকম অসভ্যতা করতে পারে।

এবার একটু ভাবুন, সমাজ কি এরকম ছিল?

কিভাবে মানুষ এতো অস্থির, রুচিহীন ও বিবেকশুন্য হয়ে গেল?

এর দায় কার মানুষের নাকি রাস্ট্রের ?

২.

আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, কিছু মানুষের এই অস্থিরতা, মুল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে বিপথগামীতার পথে ঠেলে দিয়েছে। তাদের বেপরোয়া আচরন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে আতংকিত করে তুলেছে। এসব ভিডিও চোখে আংগুল দিয়ে দেখাচ্ছে সামাজিক মুল্যবোধের অবক্ষয়ের করুন চিত্র।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুল্যবোধের অবক্ষয় কি একদিনে হয়েছে?

স্বভাবতই বলা যায়, একদিনে সমাজিক বিপর্যয়ের সুচনা হয়নি।

আমরা জানি,মাছের পচন ধরে মাথায়। তারপর সারা দেহে। ঠিক একইভাবে সমাজের পচন ধরে উঁচুতলা হতে। রাস্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি যখন দূর্নীতিগ্রস্থ হয়, তখন তার প্রভাব প্রশাসন হতে শুরু করে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। নীতি নৈতিকতার চরম ধ্বস নামে। অবক্ষয়ের সুচনাটি সেখান হতে শুরু হয়।

একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, রুচি ও সংস্কৃতির অবনম একদিনে হয়নি। মোটাদাগে বললে, ফ্যাসিবাদী শাসনের মধ্য দিয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একদল সুবিধাবাদী মানুষ তৈরি হয়েছে। এই সুবিধাভোগীরা এবং ক্ষমতাসীন দলের অনুগত প্রশাসন ফ্যসিবাদ টিকিয়ে রাখতে সমাজের উপর থেকে নীচুস্তরে  মেরুদন্ডহীন মানুষ তৈরি করার জন্য প্রথমে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছে। ফলে তারা একদল বশংবদ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

অন্যদিকে উন্নত সংস্কৃতি ও রুচির দুর্ভিক্ষতে সাধারণ মানুষের মাঝে লোভ,হিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতার বীজ রোপিত হয়েছে। যা সময় ও সুযোগের অভাবে প্রকাশিত হয়নি। কিংবা ফ্যাসিবাদের কঠিন স্টিমরোলারের ভয়ে নিশ্চুপ ছিল।  বিগত ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের পর যে মবোক্রেসি দেখা হলো, তা বিগত রেজিমের নীচে ঘটে যাওয়া মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলাফল।

কিন্তু এর জন্য পলাতক ফ্যাসিস্টের দোসর ও কিছু সুবিধাবাদী দালাল গোস্টি চব্বিশের গণভ্যুত্থানকে নানানভাবে দোষারোপ করছেন। এরা এতোটাই দলান্ধ যে, ভুলে গিয়েছে গত ১৫ বছর এর চেয়ে ভয়াবহ অবক্ষয় তারা ঘটিয়েছেন। রাস্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে চুরি চামারি,খুন,গুম,লুটপাটতন্ত্র কায়েম শুধু ধ্বংস করেনি দেশের মানুষের নীতি নৈতিকতা, মুল্যবোধও ধ্বংস করেছে।

তাই চব্বিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে লাভ নেই। যদি ফ্যাসিবাদের পতন না হত, ছাব্বিশ কিংবা সাতাশে এর প্রকাশ অনিবার্য ছিল।

এই রুচিহীন, অনুন্নত সংস্কৃতি আবহমানকাল চলতে পারে না। কয়েক বছর বা আরো বেশী সময়ের পর হলেও মানুষ তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। ইতিহাস তাই বলে।

 

মন্ট্রিয়ল, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent