ভেরোনিকার সাথে তিনদিন, একরাত

ইউরোপ হচ্ছে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ভান্ডার

ইউরোপ হচ্ছে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ভান্ডার। হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের পুরাকীর্তির অফুরান  সম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দর্শনীয় স্থান দেখার পাশাপাশি ইতিহাস জ্ঞানপিপাসু পর্যটকরা সারা বছরজুড়ে ইউরোপ ভ্রমনে আসেন।

২০০৯ সালের জুন মাসে জার্মানীর শিলার ল্যাংগুয়েজ স্কুলের আমন্ত্রনে বন গিয়েছিলাম। সেবার আমার সহযাত্রী হয়েছিলেন সাংবাদিক চয়ন রহমান।  বনে আমাদের নির্ধারিত কর্মসুচী ছিল দুইদিনের।  শিলার স্কুলের এডমিনিস্ট্রেশন হেড বেঞ্জামিন ইফার বিদায় ডিনারে আমাকে প্রলুব্ধ করেন, রনি সময় যেহেতু আছে ইতালী থেকে ঢাকায় না ফিরে  তুমি পুর্ব ইউরোপ ঘুরে যাও। সামারে ইউরোপ ঘোরার আনন্দই অন্যরকম।

- Advertisement -

আমি হা না কিছু বলার আগে বেঞ্জামিন আবার বললো,শোনো নিদেনপক্ষে প্রাগ ঘুরে যাও। আমার বিশ্বাস তোমার ভাল লাগবে। তুমি যদি যেতে চাও আমি সব ব্যবস্থা করবো।

কেন যেন রাজী হয়ে গেলাম। প্রাগ সম্পর্কে বন্ধু কথাসাহিত্যিক মাহবুব রেজার কাছে অনেক গল্প শুনেছিলাম। তার বর্ননায় প্রাগের প্রতি অন্যরকমের ভাললাগা তৈরি হয়েছিল। তাই বেঞ্জামিনের কথায় মনে হলো একবার প্রাগ ঘুরেই যাই।

চয়নভাই অবশ্য রোম থেকে কোপেনহেগেন যাবেন পুর্ব নির্ধারিত শিডিউল, বিমানের টিকেট কেটে রেখেছেন।

পরেরদিন সকালে রাইনএয়ারে আমরা ইতালীর রোম যাব তিনদিনের জন্য। আমার দেশে ফেরার কথা আরো ৬ দিন পর প্যারিস থেকে।

ডিনারের পর স্টুডেন্টদের ডিজে পার্টি শেষ করে মধ্যরাতে হোটেলে ফিরি । ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ ওপেন করে দেখি বেঞ্জামিনের মেইল। রোম থেকে প্রাগ এবং প্রাগ থেকে প্যারিস টিকেট কেটে, হোটেল বুকিং দিয়ে  মেইল করেছে। ফিরতি মেইলে ওকে থ্যাংকস জানাতে পাল্টা রিপ্লাই দেয়, আই এম শিওর ইউ উইল এনজয় দ্যাটস ট্যুর এন্ড  হোপ ইউ উইল মেইল মে এগেইন দ্যাট ফর গ্রেট হাগ।

২.

রোমে দুইদিন ছিলাম বন্ধু মঞ্জুভাইয়ের বাসায়। আমি যাব শুনে তিনি আগে থেকে ছুটি নিয়ে রেখেছিলেন। তার প্ল্যান অনুযায়ী রোম, ভ্যাটিক্যান সিটি ঘুরে ঘুরে দেখা হয়। অনেকটা দৌড়ের ওপর। এক রোম ঘুরে দেখতে হলে মিনিমাম তিনটা দিন হাতে থাকলে মোটামুটি সব ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান দেখা যায়। ভ্যাটিক্যান একবেলায় ঘুরে দেখার পর আসলে আর কিছু দেখার থাকে না। রোম , ভ্যাটিক্যান ট্যুর নিয়ে আগের পর্বে লিখেছি।

রোমের ফুমিসিনো এয়ারপোর্ট থেকে  ইতালীয়ান এয়ারলাইনসের ছোট্ট একটি বিমানে প্রাগ পৌছাই যখন বিকেলের সুর্য পশ্চিমাকাশে ডুবি ডুবি করছে।

সাঁজানো গোঁছানো দৃষ্টিনন্দন ছোট্ট বিমান বন্দর।কোন হাংগামা ছাড়াই ইমিগ্রেশন ক্রস করে টার্মিনাল টু’র গেট পেরিয়ে লাউঞ্জের দিকে এগুতে অল্পবয়সের একটি মেয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে এগিয়ে এলো। প্ল্যাকার্ডে লেখা মিঃ হাসান। দৃষ্টি বিনিময় হতে মেয়েটি মিস্টি হেসে হাত বাড়িয়ে বলল,মিঃ হাসান, ওয়েলকাম টু প্রা। আই এম ভেরোনিকা ফ্রম শিলারস। আই উইল গিভ ইউ একোম্পানি ফ্রম টুডে ফর নেক্সট থ্রি ডেইজ। আই বিলিভ ইউ উইল এনজয়  প্রা।

আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না বেঞ্জামিন এই মেয়েকে আমার জন্য গাইড হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। মুহুর্তের পরিচয়ে বুঝতে পারি অতি কথাবলা এ মেয়েটি আগামী ক’দিন আমার কান ঝালাপালা করবে।

৩.

বিমান বন্দর থেকে আমরা  বাসে যাব সেন্ট্রাল প্রাগে।

প্রাগে কোন হোটেলে উঠবো, কোথায় কোথায় ঘুরবো বেঞ্জামিন সবকিছু নিজে থেকে বুকিং ও লোকাল গাইড ঠিক করে রেখেছিল। হোটেল বুক দেওয়া হয়েছিলো কোবিলিসি স্টেশনের কাছে। কোবিলিসি প্রাগের এক বিখ্যাত জায়গা। ওল্ড টাউন ও নিউ টাউনের মিশ্রনে গড়ে উঠেছে। ওল্ডটাউন থেকে হোটেলের দুরত্ব হাঁটাপথে মাত্র সাত মিনিট। স্টেশন হতে ৩/৪ মিনিট। প্রাগ ক্যাসেল থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দুরত্ব। একজন পর্যটকের জন্য এটা অবশ্যই চমৎকার লোকেশান।

বাসে আসার সময় হঠাৎ মনে হলো জিগেস করি, ভেরোনিকা বারবার কেন প্রাগাকে প্রাহা বলছিল।

– ও প্রাহা কেন বলি?  শোনো এখানকার মানুষ খুব শান্তিপ্রিয়  ও ভালবাসায় তাদের জুড়ি নেই। আমাদের প্রিয় শহরকে আমরা ভালবেসে আদর করে প্রাহা বলে ডাকি।

প্রাগে আমার আগামী তিনদিন থাকা হবে হোটেল হেনরিয়েটায়। চেক-ইন সেরে তিনতলায় ৩০৯ নাম্বার রুমে ঢোকার আগে ভেরোনিকাকে বলি, তুমি  রিসেপশান হতে শহরের একটা ম্যাপ সংগ্রহ করে নিয়ে আসো। ইন বিটুইন আমি ফ্রেশ হয়ে রেডি হবো। আমি রাতে প্রাগের নাইটলাইফ দেখতে চাই।

৪.

রাত আটটায় আমরা দু’জন হোটেল হতে ট্রাম স্টেশনে এসে দাঁড়াই। প্রাগের ট্রাম অনেকটাই প্যারিসের ট্রামের আদলের কিন্তু আভিজাত্যে পুরানো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে বহিরাঙ্গনে। ট্রাম ছুঁটে চলে পুরানো শহরে। যে শহরে আছে চার্লস ব্রিজ, ক্লক টাওয়ার,আলবার্ট আইনস্টাইনের আবাসস্থল।

রাতের প্রাগ আসলেই জৌলুসময়। চোখ ধাঁধানো নিয়ন আলোয় দেখা মেলে শত শত ট্যুরিস্টের। ইউরোপের নানান প্রান্ত থেকে এরা সামার ভ্যাকেশানে এসেছে। বেশ কিছু জাপানীও চোখে পড়ে। কারো কাঁধে ঝোলা, কারো হাতে ক্যামেরা  আবার কেউ কেউ সংগীনির কোমড় জড়িয়ে হাঁটছে। কোথাও কোথাও তিন চারজনের দল বিয়ার বা ওয়াইনের বোতল নিয়ে বসেছে। কেউ গিটার বাঁজিয়ে মিস্টিসুরের ঝংকার তুলছে।

রাস্তার দু’ধারে রয়েছে খাবার দোকান আর নানা রকম উপহার সামগ্রীর দোকান। আছে মানি এক্সচেঞ্জ আর এটিএম । যেহেতু প্রাগে ক্রোন চলে তাই মানি এক্সচেঞ্জ করে নেয়াই ভাল। তা না হলে ইউরোতে পে করতে গেলে অনেক বেশি পে করতে হয়। তাই  কিছু ইউরো এক্সচেঞ্জ করে ক্রোন নিলাম।

ওল্ড টাউনের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাশের নাইটক্লাব, বার, পাব, রেস্টুরেন্ট থেকে ভেসে আসে হৈচৈ, হাসির হুল্লোড়। আমরা একটা ছোট্ট ক্লাবে ঢুঁ মারি। ভিতরে আলো আধারিতে  ধুন্ধুমার মিউজিকে নাচছে একদল তরুন।  প্রথম রাতেই মনে হলো এ শহরে প্রান আছে। স্ফুর্তি আছে। বেঁচে থাকার জন্য এরচেয়ে বড় রসদ আর কি হতে পারে?

ক্লাব থেকে বের হয়ে আমার গাইড ভেরোনিকার বকবকানি বেড়ে যায়। নিরবে তা সহ্য করে হাঁটতে হাঁটতে আমার দু’পা ব্যাথা হয়ে যায়। মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতি। সহজে বুঝতে পারে আমি টায়ার্ড ও হাংরি।

-হাসান, রাত যদিও টু ইয়াং। তোমাকে টায়ার্ড মনে হচ্ছে। চলো হোটেল ফিরে যাই। রাত ১১টা বাঁজে। আরেকটু পর গেলে হয়ত ডিনার পাবে না। তোমাকে না খেয়ে থাকতে হলে আমার কস্ট হবে।

এ কথা শোনার পর আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় সর্তক হয়ে উঠে। আমি না খেয়ে থাকলে ও কেন কস্ট পাবে!

হোটেলে ফিরে ডিনার পাব কিনা সেই রিস্ক থাকায় ভেরোনিকাকে বললাম, দেখো কোন টার্কিশ রেস্টুরেন্ট পাওয়া যায় কিনা।

-টার্কিশ কেন, তুমি চেকের ট্র‍্যাডিশনাল ফুডস নিতে পারো।

দেখো ডিনারে আমি টার্কিশ কেবাব, নান বা তরতিলা ও গ্রীন সালাদ পছন্দ করি। এটা না হলে অন্য ফুডসের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। আর খাওয়া নিয়ে আমার তেমন কোন সংস্কার নেই।

কথাগুলো একটু বিরক্ত হয়ে কঠিন স্বরে বলায় ভেরোনিকা চুপসে যায়। সারাটা পথ সে আর স্বাভাবিক হতে পারেনি। সে চুপচাপ থাকা মানে আমার কানের আরাম। তাই তাকে স্বাভাবিক করার ইচ্ছে হলো না।

৪.

প্রাগে আমার দ্বিতীয় দিন খুব ভাল কেটেছে। চমৎকার আবহাওয়া ছিল।  একটু শীতল হাওয়া আর মিস্টি রোদে সকাল থেকে ঘুরে বেড়াতে মন্দ লাগেনি। গতরাতে ভেরোনিকা ম্যাপ ও সিটিগাইড এনে দিয়েছিল। গাইডবুক দেখে নির্ধারন করে রেখেছিলাম কোথায় কোথায় যাব।

সকাল দশটায় ভেরোনিকা এলে রুম সার্ভিসের দেয়া দু’কাপ কফি খেয়ে আমরা দিনের প্রাগ দেখতে বেরিয়ে পড়ি। ওল্ডটাউনে  বাস থেকে নেমে আমরা হাঁটি। ঘুরতে ঘুরতে কত ঐতিহাসিক, দর্শনীয় স্থাপনা দেখি।  কোন কোন স্থাপনা দুইশত বছরের পুরানো। গোথিক ও রোমান স্থাপত্যের অপুর্ব নির্দশন। স্থাপনাগুলোতে দৃস্টিনন্দন কারুকাজ সহজে মন কেঁড়ে নেয়।

হাঁটতে  হাঁটতে একটি বড় দরজার দেয়ালে চোখ আটকে গেল। দেয়ালে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মুখোচ্ছবি ও কিছু উক্তি খোদাই করা।  নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনেস্টাইনের সঙ্গে এখানে দেখা হতো বিখ্যাত লেখক ম্যাক ব্রেড ও ফ্রানসৎ কাফকার। আইনস্টাইনের স্মৃতি বিজড়িত বিল্ডিং দেখে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। দিব্যচোখে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম আইন্সটাইন, কাফকা মুখোমুখি বসে আলাপচারিতায় মগ্ন। আহা কাফকা, আহা আইন্সটাইন! তোমরা দু’জনেই এ শহরে থাকতে, জেনে ভাল লাগল।

ভেরোনিকা বকবক করছে। একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে, বুঝলে হাসান, ১৯১১-১৯১২ সালে আইনস্টাইন প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। ঠিক এই সময় লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্র  দ্য থিওরি অফ রিলেটিভিটি।

শুনেই আমি চিৎকার করে উঠি, ওয়াও। কি বলো তুমি!

ভেরোনিকা আমার উত্তেজনা টের পেয়ে উৎসাহি হয়ে উঠে।

শোনো, এ শহরে অসংখ্য বিখ্যাত মানুষের পদচারণা  ছিল। তাদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে প্রাগে।

আমি তন্ময়ে হয়ে ভেরোনিকার কথা শুনি। ভেরোনিকা দরজা পেরিয়ে কয়েকটি পুরানো বাড়ি দেখিয়ে বললো , এখানেই এই পুরনো শহরেই থাকতেন আইস্টাইন। যদিও তার বাসস্থানটি সংরক্ষণ করা হয়নি। তবুও ইতিহাসনুৎসন্ধানীরা এখানেই বারবার ফিরে আসে।

ওল্ডটাউনের  ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখতে দেখতে এতোই বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম যে, কখন লাঞ্চের সময় পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। ভেরোনিকা স্মরন করিয়ে দেয়, চলো লাঞ্চ করি।

আমরা সস্তা একটি হোটেলে ঢুকে পড়ি। বড় সাইজের পিজ্জা ও সালাদে লাঞ্চ সেরে আবার বেরিয়ে পড়ি। পূর্ব নির্ধারিত চার্লস ব্রিজ দেখতে যাই। ট্রামে করে স্টারমোয়েস্কা স্টেশনে নেমেই ব্রিজ যেতে দুই মিনিটের হাঁটাপথ।

ভেরোনিকার একটাই কথা। তুমি প্রাগ বেড়াতে এসে  চার্লস ব্রিজ না দেখে ফিরে যাবে, তাহলে তোমার প্রাগ দেখা অপুর্ন থেকে যাবে৷

আমি গুগল ঘেটে জেনে নেই, প্রায় সাড়ে ছ’শ বছরের এই পাথরের সেতুটি ৩০টি ভাস্কর্য দিয়ে সাঁজানো। যদিও সেগুলো আসল নয়, নকল৷ আসল ভাস্কর্যগুলো রাখা আছে চার্লস ব্রিজ মিউজিয়ামে৷ প্রাগ হচ্ছে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ভলটাভা নদী৷ নদীর উপর আছে ১৫টি সেতু। চার্লস ব্রিজ যার মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী, পুরনো৷ ৫০০ মিটার লম্বা এই সেতুটি ইউরোপের দীর্ঘতম গোথিক স্থাপত্যের ব্রিজ৷ ১৩৫৭ সালে সম্রাট চতুর্থ চার্লস সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁরই নামে এই সেতুর নামকরণ।

ব্রীজের দু’পাশে প্রচুর দর্শনার্থী। অনেকেই নদীর পাড়ে বড় টাওয়েল বিছিয়ে শুয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমরা তাদের পাশ কাটিয়ে ব্রীজের পূর্বপাড়ে দাঁড়িয়ে ভলটাভা নদীর বয়ে যাওয়া দেখি। এখান থেকে চার্লস ব্রিজকে তার ধনুকের আকারের ১৬টি খিলানসহ সম্পূর্ণ দেখা যায়৷

ঘুরতে ঘুরতে সময় গড়িয়ে যায়। বিকেলের সুর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়তে দেখি নদীর স্বচ্ছ জলে।

রোদে বেশীক্ষন থাকলে আমার মাইগ্রেনের পেইন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মাইগ্রেনের যন্ত্রনায় বেশীক্ষন টিকতে না পেরে হোটেলে ফিরে আসি ট্যাক্সি চেপে।

ভেরোনিকা আমার অসহ্য যন্ত্রন দেখে অস্থির হয়ে উঠে।

হাসান, কিছু মনে না করলে আমি কি আজ তোমার সাথে থাকতে পারি।  আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তোমার ব্যাথা কমবে মনে হয়।

আমার তখন কথা বলার মতন অবস্থা নেই। আমি ইশারায় তাকে বলি, না থাকতে পারো না। আমি লাইট অফ করে ঘুমিয়ে গেলে কিছুটা বেটার ফিল করবো।প্লিজ তুমি যাও।সকালে চলে এসো।

মন খারাপ করে ভেরোনিকা চলে যাবার আগে রুম সার্ভিসে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিল আমার রাতের ডিনার রুমে দেয়ার জন্য।

৫.

পরের দিন আমার প্রাগে শেষদিন। আগামীকাল  আমার প্যারিসের ফ্লাইট সকাল ন’টায়। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়ি। নিউ টাউন বা ডাউনটাউন দেখার জন্য।

প্রাগ ছবির মত সুন্দর একটি শহর। শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ভলটাভা নদী। গতকালই দেখেছি নদীটি বেশ প্রশস্ত ও খরস্রোতা। কোনো খড়কুটো ভাসতে দেখি নাই । পরিস্কার জল। ভলটাভার ওপর দেড়শ’ বছরের পুরনো চার্লস ব্রিজ ও আরো অনেক ব্রীজ রয়েছে,যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।

নিউটাউনের বেশীরভাগ স্থাপনায় যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া, তেমনি কিছু স্থাপনায় পুরানো ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে অপুর্ব লাগে প্রাগ শহরটি।

প্রাগ চেক প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তম শহরও । এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৪তম বৃহত্তম শহর। এ শহরে ১.২৬ মিলিয়ন মানুষের বাস। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। গ্রীষ্মকালে কিছুটা  উষ্ণ এবং শীতকালে খুবই ঠাণ্ডা পড়ে। ভেরোনিকা জানায়, প্রাগ হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সর্বনিম্ন ঠাণ্ডার শহর। বেকারত্বের হারও কম নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশেগুলোর মধ্যে প্রাগের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন রয়েছে তেমনি প্রাগ অর্থনৈতিক কেন্দ্রও। দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধের পর চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগ হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে প্রাগের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর কমিউনিস্ট আমলে চেক প্রজাতন্ত্র  ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

নিউ টাউনে হেঁটে হেঁটে ইতিহাসের সাথে সারাবেলা ভালই কাটে। ভেরোনিকা আমাকে একে একে ঘুরিয়ে দেখায় প্রাগ কাসল ,ওল্ড টাউন স্কয়ার , প্রাগ জ্যোতির্বিদ্যা ঘড়ি , ইহুদি কোয়ার্টার,পেতরিন পাহাড় , জাদুঘর , থিয়েটার, গ্যালারী। কি অপুর্ব সব দর্শনীয় স্থান! এখানে না এলে সত্যি আমি বঞ্চিত হতাম ইউরোপের সেরা ট্যুরিস্ট স্পট দেখা হতে। মনে মনে বেঞ্জামিন ইফারকে স্যালুট দেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ একটি শহর দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। একটা গ্রেট হাগ আসলেই পাওনা হয়ে গেল বেঞ্জামিন।

৬.

বিকেলে ওল্ডটাউনে ঘুরে ঘুরে কিছু স্যুভেনিয়র কিনি। খুব সস্তা তা কিন্তু নয়। সব ঐতিহাসিক শহরের মতন প্রাগে স্যুভেনিয়র চড়া মুল্যে বিক্রি হয়। দু’টো টি-শার্ট কিনি ৮০ ইউরো দিয়ে। নিকেলের তৈরি দু’টো প্রাগ সিটি মেমোরিয়াল হল ও চার্লস ব্রীজের রেপ্লিকা কিনি ১০০ ইউরোতে।

আজ আমার প্রাগে শেষ রাত। কাল সকালে আমি প্যারিস চলে যাব। ভেরোনিকার মন খারাপ। গত তিনদিনে মেয়েটিকে অনেক জ্বালিয়েছি। কঠিন কথায় কস্ট পেয়েছে। তার মন ভাল করার জন্যই বলি, তুমি আমাকে একটা ভাল রেস্টুরেন্টে নিয়ে চলো। আমরা সেখানে ডিনার করতে চাই।

ভেরোনিকা হেসে বলল, ভালোর কি শেষ আছে রনি।

এই প্রথম সে আমার ডাকনাম ধরে কথা বললো। আমি ওর মুখের দিকে তাকাই। মেয়েটার অদ্ভুত দু’টো চোখ। অনেকটাই টানা নীলনয়না। চুলগুলো ছোট করে রাখা।

এ প্রথম ওর প্রতি আমার কেমন যেন মায়া লাগে। এ কদিনে একবারও জিগেস করা হয়নি তুমি কোথায় থাকো,কে কে আছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই যাবার সময় সদ্যকেনা একটি টি-শার্ট ওকে গিফট করবো।ডিনারে অনেক কথা হবে যা গত দুইদিনে জানতে চাইনি।

আমরা রাতে মোটামুটি ভাল একটা চেক রেস্টুরেন্টে খেতে বসি। বিফ স্টেক, রিজোতো,ব্রেড, অনিয়ন স্যুপ ও গ্রীন সালাদ অর্ডার করি। ভেরোনিকা আমাকে আগে বলে রেখেছিল ডিনারে সে স্পেশাল একটা ওয়াইন অর্ডার করবে। যার মুল্য ও পরিশোধ করতে চায়। আমি ওকে বাঁধা দেই না।

আমরা ডিনার টেবিলে অনেক গল্প করি। কথা প্রসংগে বাংলাদেশ দম্পর্কে জানতে চায়। তার ধারনা ছিল বাংলাদেশ মানে ইন্ডিয়ার অংগরাজ্য। আর আমাদের অঞ্চল বন্যা খরাপীড়িত। আমার কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা,অর্থনৈতিক উন্নয়ন,আধুনিক ঢাকার কথা শুনে ওর চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। কোনদিন সুযোগ হলে ঢাকা দেখার ইচ্ছের কথা জানায়।

ডিনার শেষ করে আমরা দু’জন অনেক রাত অবধি আলো আঁধারিতে প্রাগের ওল্ডটাউনে ঘুরি। কোন একটি বিষয় নিয়ে হাসতে হাসতে ভেরোনিকা কখনো  আমার শরীরের ওপর এসে পড়ে। কখনো হাত ছুৃঁয়ে হাঁটে।  কখনো শক্ত করে হাত চেপে হাঁটে।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা হোটেলে চলে আসি। কাল সকালে আমার ফ্লাইট। ব্যাগ গোছানোই ছিল।  রুমে ফিরে স্যুভেনিয়রগুলো ল্যাগেজে দেয়ার আগে ভেরোনিকাকে একটা টি-শার্ট হাতে দিতে মেয়েটার চোখ দু’টো ছলছল করে। খুশিতে পারলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। সামান্য একটা টি-শার্ট  পেয়ে কেউ এতো খুশি হতে পারে,  তা আমার জানা ছিল না। ওর ভাললাগা, খুশি দেখে ভীষন মায়া লাগে। খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেরোনিকা। ওর বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়াতে বেশ বেগ পেতে হয়। মেয়েটা জড়িয়ে কেঁদে ফেলে।

– শোনো,  আমি অনেকের সাথে কাজ করেছি। কিন্তু তোমাকে কেন যেন একটু অন্যরকম মনে হয়েছে। তুমি এজইউজুয়াল ট্যুরিস্টদের মতন নও। তাদের মতন আচরনও  তোমার ব্যবহারে নেই।

হঠাৎ রুমের বিশাল আয়নায় চোখ পড়তে চমকে উঠি। জড়িয়ে ধরে ভেরোনিকা কখন যেন আমার গালে চুমু দিয়ে লিপস্টিক লাগিয়ে দিয়েছে! ভাগ্যিস এখানে আমার পরিচিত কেউ নেই।

-আমাকে তুমি এক্ষুনি চলে যেতে বলো না রনি। আমি আজ তোমার সাথে থাকবো। সকালে তোমাকে এয়ারপোর্টে পৌছে দিয়ে তারপর বাসায় ফিরে ঘুমাবো। প্লিজ রনি আমার কথাটা রাখো।

কি যে মুশকিল পড়লাম, একটা মেয়ের এমন বায়না আমি কিভাবে রাখবো? এক রুমে আমরা দু’জন থাকবো, এ আমার জন্য অসম্ভব।

রুম লাগোয়া বারান্দায় এসে সিগারেট টেনে কোন সমাধান খুৃঁজে পাই না। ঠান্ডা মাথায় অনেক ভেবে বলি, হ্যা তুমি থাকতে পারো,ভোর হতে আর তো মাত্র চার ঘন্টা বাকী। চলো আমরা লবিতে বসে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাই।  সকাল সাতটায় আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাব।

ভেরোনিকা আমার এমন উত্তরের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। আমি ওকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে ট্রাউজার চেঞ্জ করে শর্টস পড়ি। বের হয়ে এসে একরকম হাত টেনে লবির দিকে পা বাড়াই।

৭.

আমার বিদেশ ভ্রমনের জীবনে প্রাগ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। হ্রদয়জুড়ে আছে ভেরোনিকার মতন নিপাট ভাল একটি মেয়ে। যখনই প্রাগের কথা মনে হয়, ভুলতে পারি না বিদায়ের শেষ রাতটি।

প্রাগ থেকে আমি প্যারিস ফিরেছিলাম ভেরোনিকার চোখের জলে সিক্ত হয়ে।

 

মন্ট্রিযর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent