জানালার ওপারে

তখন আকাশের রং ছিল ধূসর নীল বাতাস কাঁপছিলো শব্দহীন হয়ে

মাধুরী চলে গিয়েছিল এক অক্টোবর সন্ধ্যায়।

তখন আকাশের রং ছিল ধূসর নীল, বাতাস কাঁপছিলো শব্দহীন হয়ে। সায়েফের মনে হয়েছিল, পৃথিবী থেমে আছে এক অজানা শূন্যতার সামনে। ঘরের জানালায় পর্দা উড়ছিল ধীরে ধীরে—যেন বিদায় জানাতেও ক্লান্ত।

- Advertisement -

তারা ছিলো না ঠিক প্রেমিক-প্রেমিকা, আবার পুরোপুরি বন্ধুও নয়। সায়েফ বলতো, “তুই আমার ভিতরের সেই জায়গাটা—যেখানে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই।”

মাধুরী হেসে বলত, “তুই শুধু শব্দ দিয়ে ভালোবাসিস সায়েফ, আমি ছোঁয়ার ভাষায় বাঁচি।”

মাধুরী খুব বেশি কথা বলতো না। কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত বিস্ময় ছিল—যা দেখে সায়েফের কবিতা জন্ম নিতো। আর সায়েফের কবিতা মাধুরী পড়তো এমনভাবে, যেন সে নিজেকেই খুঁজছে সেসব শব্দের ভিতরে।

সেই শেষ সন্ধ্যায় সায়েফ কিছু বলেনি। শুধু তাকিয়েছিল নিঃশব্দে।

মাধুরী বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকিয়েছিল। তার চোখে তখন কিছু একটা জ্বলছিল—হয়তো মায়া, হয়তো ক্ষমাহীন বিদায়।

“ভালো থাকিস,” মাধুরী বলেছিল।

সায়েফ উত্তর দেয়নি। শুধু জানালায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সেই জানালা, যেটা এখনো খোলা।

দুই বছর পর—

সায়েফের ঘরটা এখন কেমন একটা নির্জন জাদুঘর। বই, কবিতার খাতা, একাকী পানির বোতল, শুকিয়ে যাওয়া ফুলের গোলাপি পাপড়ি।

ঘরে যারা আসে, তারা অবাক হয়—পূর্বদিকে জানালাটা সবসময় খোলা থাকে কেন?

সায়েফ কোনো উত্তর দেয় না। প্রতিদিন ঠিক সূর্য ওঠার আগেই সে পর্দা সরিয়ে দেয়। আলো ঢোকে ঘরে। কিছু বাতাস আসে।

কিন্তু কেউ আসে না।

একদিন এক পাঠিকা এল সায়েফের ঘরে।

তার হাতে সায়েফের কবিতার বই— “তুমি না”।

সে বললো,

— “এই কবিতাটা লিখেছিলেন যেদিন, সেদিন কি কেউ চলে গিয়েছিল?”

সায়েফ তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।

— “হ্যাঁ। কেউ চলে গিয়েছিল। এখনো যায় প্রতিদিন, ফিরে না এসে।”

পাঠিকা প্রশ্ন করে,

— “তাকে কি আপনি ভালোবাসতেন?”

সায়েফের চোখ নেমে আসে জানালার দিকে,

— “আমি আজও ভালোবাসি… তবে তার অনুপস্থিতিকে।”

একদিন এক ঝড় আসে রাতে।

বিদ্যুৎ কাঁপে। সায়েফ দরজা বন্ধ করলেও জানালাটা বন্ধ করেন না।

ঝড়ের পর ভোরে উঠে দেখে জানালার পাশে ছোট্ট একটা কাগজ পড়ে আছে। তাতে লেখা—

“আমার যাওয়াটাও ছিল একধরনের অপেক্ষা…

জানালার পাশে দাঁড়িও, হয়তো একদিন বাতাসে আমি ফেরত আসবো…”

সায়েফ হাসে না, কাঁদেও না। শুধু জানালার ওপাশে তাকায়।

আলো আসে।

পাখিরা ডাকতে থাকে।

জানালার পাশে চায়ের কাপ রেখে সে বসে থাকে কিছুক্ষণ।

তুমি না,

তবু—

তুমি।

- Advertisement -

Read More

Recent