অন্টারিওতে স্পিড ক্যামেরা নিষিদ্ধের ঘোষণা: সংখ্যার আলোকে বিশ্লেষণ

অন্টারিও প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর সারা প্রদেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে স্পিড ক্যামেরা

অন্টারিও প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর সারা প্রদেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে স্পিড ক্যামেরা। প্রশ্ন একটাই এই ক্যামেরাগুলো কি সত্যিই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি এগুলো কেবল সরকারের জন্য ‘টাকা তোলার মেশিন’ হয়ে উঠেছে?

২০২৪ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র টরন্টো শহরের ২৫০টিরও বেশি স্পিড ক্যামেরা থেকে জরিমানা আদায় হয়েছে ৪২ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে, শহরে অতিরিক্ত গতিজনিত দুর্ঘটনা কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। বিশেষ করে স্কুল জোন ও ব্যস্ত আবাসিক এলাকায় দুর্ঘটনা হ্রাসের এই পরিসংখ্যানকে শহর প্রশাসন ক্যামেরা কার্যকারিতার পক্ষে শক্ত প্রমাণ হিসেবে হাজির করছে।

- Advertisement -

বর্তমানে গোটা অন্টারিও জুড়ে এক হাজারেরও বেশি স্পিড ক্যামেরা সক্রিয় রয়েছে। প্রদেশজুড়ে এ থেকে বছরে গড়ে ১৫০ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসে। এই অর্থ সরাসরি পৌর বাজেটে যায় রাস্তা সংস্কার, স্কুল জোন উন্নয়ন, ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়ন এবং নতুন সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে।

টরন্টো একাই স্পিড ক্যামেরা থেকে জরিমানার মাধ্যমে বছরে গড়ে ৫০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বাজেট সমৃদ্ধ করছে, যা শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।

বিরোধী দল ও সমালোচকরা কিন্তু ভিন্ন সুর তুলছেন। তাদের দাবি, জরিমানার প্রায় ৬০ শতাংশ টিকিটই দেওয়া হয় খুব সামান্য গতি সীমা অতিক্রমের জন্য যেমন সীমা যদি ৪০ কিমি/ঘণ্টা হয়, গাড়ির গতি ৪৫ বা ৪৬ হলেই জরিমানা গুনতে হয়। তাদের মতে, এতে প্রকৃত সড়ক নিরাপত্তার চেয়ে রাজস্ব আদায়ের দিকটিই বড় হয়ে উঠছে।

কিছু মোটরিস্ট সংগঠন বলছে, ক্যামেরার অবস্থান অনেক সময় এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যেখানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু চালকদের ধরা সহজ। এ ধরনের নীতি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, অন্টারিওতে প্রতি বছর গড়ে ২০০ জন মানুষ অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। স্পিড ক্যামেরা চালু হওয়ার পর এই মৃত্যুর হার প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে।

তাদের মতে, যদি এখন ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে অতিরিক্ত ১,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। শুধু দুর্ঘটনা নয়, ক্যামেরা থাকার কারণে অনেক চালক স্বাভাবিকভাবেই গতি কমিয়ে চালান, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তন তৈরি করছে।

ক্যামেরা তুলে দিলে বাজেট ঘাটতির ঝুঁকিও প্রকট। শুধুমাত্র টরন্টো শহরেই বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার ঘাটতি তৈরি হবে। আর পুরো প্রদেশে এই ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে সরকারকে নতুন কর বা অতিরিক্ত ফি আরোপ করতে হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের ঘাড়েই পড়বে।

এছাড়া, আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যেসব শহর নিজেদের অর্থে ক্যামেরা কিনেছে ও স্থাপন করেছে, প্রাদেশিক সরকার যদি এগুলো সরিয়ে নেয়, তাহলে ক্ষতিপূরণ দিতে শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এতে প্রাদেশিক ও পৌর প্রশাসনের মধ্যে আইনি টানাপোড়েনও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবমিলিয়ে পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে স্পিড ক্যামেরা কেবল রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার নয়; এগুলো দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানোর প্রমাণিত উপায়। কিন্তু জনপ্রিয় রাজনীতির খেলায় এই প্রমাণ কতটা টিকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সিদ্ধান্ত অন্টারিওর ভবিষ্যৎ সড়ক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। একদিকে জনমত ও ভোট রাজনীতি, অন্যদিকে প্রাণরক্ষার বাস্তবতা এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই নির্ধারিত হবে প্রদেশের সড়ক নিরাপত্তার পথচিত্র।

This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI

- Advertisement -

Read More

Recent