
বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকট, আমদানি নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার তীব্র চাপের মধ্যে কানাডা সরকার দেশীয় শিল্প রক্ষায় নজিরবিহীন কার্যক্রম শুরু করেছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উৎপাদন খাতকে নতুন করে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন “স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স ফান্ড”, যার মাধ্যমে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এই তহবিলের মূল লক্ষ্য হল আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সহায়তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় টেকসই উন্নয়ন।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই তহবিলের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ২৫,০০০-এর বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি উৎপাদন খাতে গড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপ কানাডার উৎপাদনশীলতার ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশীয় শিল্পকে রক্ষার অংশ হিসেবে সরকার চালু করেছে “বাই কানাডিয়ান” নীতি। এর আওতায় সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দেশীয় উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর অর্থ নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো আগে সুযোগ পাবে।
সরকারি হিসাব বলছে, এভাবে বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সরকারি ব্যয় সরাসরি দেশীয় বাজারে প্রবাহিত হবে। এর ফলে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি গড়ে ০.৭ শতাংশ বাড়তে পারে।
২০২৪ সালে কানাডার মোট আমদানি ছিল ৭৫০ বিলিয়ন ডলার, আর রপ্তানি মাত্র ৬৯০ বিলিয়ন ডলার ফলে ৬০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে সরকার দেশীয় শিল্পকে এগিয়ে না রাখলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে কৃষি, গার্মেন্টস, তথ্যপ্রযুক্তি, খনিজ এবং নির্মাণ খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা আলাদা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
টরন্টো, মন্ট্রিয়ল ও ভ্যাঙ্কুভারের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। কানাডিয়ান ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে “সরকারি ক্রয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে আগামী তিন বছরে উৎপাদন খাতে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব।” অন্যদিকে কৃষি সংগঠনগুলোর মতে, বিদেশি খাদ্যপণ্যের প্রতিযোগিতা কমে গেলে স্থানীয় কৃষকরা নতুন বাজার পাবে, যা কৃষিখাতে গড়ে ১০ শতাংশ আয় বৃদ্ধি ঘটাবে।
তবে সবাই যে সরকারের পদক্ষেপে খুশি, তা নয়। সমালোচকরা মনে করছেন, দেশীয় শিল্প রক্ষায় সরকারের অতিরিক্ত আগ্রাসী মনোভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রী কার্নি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে “জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কানাডা কোনো ছাড় দেবে না।”
দেশীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নেও জোর দিচ্ছে। নতুন কর্মসূচির আওতায় ২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পে। এর মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে ১ লক্ষ শ্রমিককে উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠলে দেশীয় শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কানাডা সরকার এখন আর কেবল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে না; বরং সক্রিয়ভাবে দেশীয় শিল্পকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করছে। এই পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ত্বরান্বিত, বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসা, এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কানাডার অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে আন্তর্জাতিক চাপ ও বাণিজ্য চুক্তির জটিলতা এই নীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে সরকারের জন্য সামনে পথটি যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি কঠিনও।
কানাডা সরকারের এই উদ্যোগগুলো দেশটির অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এখন প্রশ্ন শুধু একটাই এই নীতি বাস্তবায়নে সরকার কতটা কার্যকরভাবে চাপ ও জটিলতা সামাল দিতে পারে।
