কানাডার শিল্প অঙ্গনে সহায়তা বন্ধ করল টিকটক

কানাডায় জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে

কানাডায় জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফেডারেল সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী টিকটক কানাডা দেশীয় কার্যক্রম বন্ধের প্রস্তুতি নেয়ার ঘোষণা করেছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিতে প্রদত্ত সকল আর্থিক সহায়তা এবং অংশীদারিত্ব স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে কানাডার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সংস্থা যেমন জুনো অ্যাওয়ার্ডস, টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল (টিআইএফএফ) এবং কুইবেকের এডিআইএসকিউ অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়তে যাচ্ছে।

টিকটক কানাডার নীতি ও সরকার সম্পর্ক বিষয়ক পরিচালক স্টিভ ডি আয়ার বলেছেন, “ফেডারেল সরকারের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে গত নভেম্বরে আমাদের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আমরা এখন সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছি। এই অবস্থায় শিল্প ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য এগুলো স্থগিত করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো বিকল্প নেই।”

- Advertisement -

গত পাঁচ বছরে টরন্টো ও ভ্যানকুভারে অফিস স্থাপনের পর টিকটক কানাডা স্থানীয় শিল্পীদের সহায়তায় বহু উদ্যোগে যুক্ত ছিল। দেশব্যাপী সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, ডিজিটাল ক্রিয়েটিভিটি এবং আদিবাসী সংস্কৃতির উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ করেছে।

টিকটকের স্পন্সরশিপ বন্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে শিক্ষা ও সঙ্গীতভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান মুসিকাউন্টস। হাই স্কুল পর্যায়ে সংগীত শিক্ষার প্রসারে সংস্থাটি টিকটক থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছে। মুসিকাউন্টসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অর্থ সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের সংগীত প্রশিক্ষণ মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।

২০২০ সাল থেকে টিকটক জুনো অ্যাওয়ার্ডসের সহযোগী এবং জুনো ফ্যান চয়েস অ্যাওয়ার্ডের শিরোনাম স্পন্সর হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিল। ২০২২ সাল থেকে তারা টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালের শর্ট ফিল্ম বিভাগ ও কানাডিয়ান নির্মাতাদের ইন্ডাস্ট্রি প্যানেল পরিচালনায় সহায়তা প্রদান করে আসছিল। তরুণ নির্মাতা ও ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ছিল।

টিকটক কানাডার অংশীদারিত্ব বন্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে আদিবাসী নির্মাতাদের জন্য পরিচালিত “ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট টিকটক অ্যাকসেলারেটর” কর্মসূচিতে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ জন আদিবাসী চলচ্চিত্র নির্মাতা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও গল্পকার তাদের ক্যারিয়ারে উন্নতি করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

কর্মসূচির ব্যবস্থাপক সারাহ সিম্পসন-ইয়েলোকুইল বলেন, “এই সিদ্ধান্ত গভীরভাবে হতাশাজনক। টিকটক অ্যাকসেলারেটর আদিবাসী নির্মাতাদের জন্য বিরল সুযোগ ছিল যেখানে তারা মেন্টরশিপ, প্রশিক্ষণ ও শিল্পের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারত। কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেলে সেই স্বপ্নগুলো ভেঙে যাবে।”

টিকটক কুইবেকের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ও প্রদেশের শীর্ষ সংগীত পুরস্কার “এডিআইএসকিউ”-এর সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন করেছে। এডিআইএসকিউয়ের নির্বাহী পরিচালক ইভ পারি বলেছেন, “টিকটকের অর্থায়ন আমাদের গালার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। নভেম্বরের আগে নতুন স্পন্সর খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যা আমাদের বাজেটে বড় ঘাটতি তৈরি করবে।”

কানাডা সরকার টিকটকের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা ও ডেটা গোপনীয়তা সম্পর্কিত উদ্বেগ উল্লেখ করেছে। তাদের আশঙ্কা, চীনা মালিকানাধীন কোম্পানি বাইটড্যান্স কানাডিয়ান ব্যবহারকারীদের তথ্য বিদেশি সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। যদিও টিকটক এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টিকটকের প্রস্থান শুধুমাত্র ডিজিটাল বিনোদন খাতেই নয়, বরং কানাডার শিল্প, সংগীত ও চলচ্চিত্র অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক নীতি বিশ্লেষক ড. র‍্যাচেল লং বলেছেন, “টিকটকের সহায়তায় বহু তরুণ শিল্পী, বিশেষ করে আদিবাসী ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের শিল্পীরা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের পরিচিত করতে পেরেছিলেন। এই সংযোগ ছিন্ন হলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হবে না, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়বে।”

টিকটক কানাডার সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর অনিশ্চয়তার সৃজন করেছে। আগামী কয়েক মাসে সরকারের নীতিনির্ধারক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই ঘাটতি পূরণ করবে, সেটিই এখন কানাডার সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন।

- Advertisement -

Read More

Recent