
দামাস্কাস শরমার কাউন্টারের পেছনে তাকালেই বোঝা যায়, এটি শুধু একটি খাবারের দোকান নয় এটি একটি পরিবারের গল্প, একটি নতুন জীবনের সাক্ষ্য। কারকোস পরিবার শরণার্থী হিসেবে কানাডায় আগমনের দশ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে তাদের গ্রাহকদের সঙ্গে, যারা এই দীর্ঘ যাত্রায় ধীরে ধীরে পরিবারেরই অংশ হয়ে উঠেছেন।
পরিবারের কর্তা হোসেন কারকোস আবেগভরে বলেন, “আমি যখন এখানে আসি, তখন আমাদের ছিল তিন সন্তান। তখন পরিবার বলতে সেটুকুই বুঝতাম। আজ আমার পরিবার অনেক বড় সাডবারিই এখন আমার পরিবার।” তাঁর কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা আর তৃপ্তির মিশেল।২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর নতুন বছরের আগের দিন হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও তিন পুত্র কানাডায় নতুন জীবন শুরু করার উদ্দেশ্যে সাডবারিই বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে পালিয়ে আসা হাজারো মানুষের ভিড়ে তাঁরা ছিলেন সেই সময় সাডবারিতে আসা প্রথম শরণার্থী পরিবার। কানাডায় আসার পর পরিবারে আরও দুটি সন্তানের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে একজন, ওমর, এখন দোকানের ক্যাশ রেজিস্ট্রারে বাবাকে সাহায্য করে পরিবারের ভবিষ্যৎকে হাতে-কলমে গড়ে তোলার এক নীরব প্রতিশ্রুতি।
সেই সময়, বিশ্বজুড়ে সিরীয় শরণার্থীদের সংকট যখন তীব্র, তখন কানাডা অসংখ্য শরণার্থীকে পুনর্বাসনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। কারকোস পরিবারের অভিজ্ঞতা সেই উদ্যোগের মানবিক দিকটিই তুলে ধরে। পরিবারের সদস্য ওসামা বলেন, “সাডবারিতে আসার পর একবারের জন্যও আমাদের বাইরের মানুষ মনে হয়নি। এখানকার কমিউনিটি সবসময় আমাদের এমন অনুভূতি দিয়েছে যে আমরা আমাদের বাড়িতেই আছি। এজন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।”
কানাডায় পা রেখেই পরিবারের তিন ছেলে স্কুলে ভর্তি হয় এবং ইংরেজি শেখা শুরু করে। অন্যদিকে, হোসেন জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রথমে গোল্ডেন গ্রেইন বেকারিতে বেকার হিসেবে কাজ নেন যে প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সংগ্রাম থেমে থাকেনি। ২০১৮ সালে তিনি নিজের পারিবারিক ব্যবসা শুরু করেন। শুরুতে বিচ স্ট্রিটের ডাউনটাউনে যাত্রা শুরু হলেও পরে ব্যবসাটি স্থানান্তরিত হয় লাসাল বুলভার্ডে, যেখানে আজ দামাস্কাস শরমা স্থানীয়দের পরিচিত এক নাম।
পরিবারের বড় ছেলে নাবিল কারকোসের স্মৃতিতে আজও ভেসে ওঠে শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা। কানাডায় আসার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র দশ। তিনি বলেন, “আমরা বেইরুতের একটি বাস স্টেশনে থামি। আমি তখন ভয় পেয়ে পালিয়ে এক চাচার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কারণ আমি আসতে চাইনি। কানাডা কী, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।” লেবানন ও সিরিয়ায় কাটানো অস্থির দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি যোগ করেন, “সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি পরিবারের সঙ্গে এসেছি। আমরা সত্যিই একটি সুন্দর দেশে এসেছি।”
দশ বছর পেরিয়ে কারকোস পরিবারের এই যাত্রা এখন শুধু টিকে থাকার গল্প নয়; এটি অন্তর্ভুক্তি, পরিশ্রম আর নতুন পরিচয়ের গল্প। সাডবারির কমিউনিটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা প্রমাণ করেছে শরণার্থী হিসেবে শুরু হলেও, মানবিকতা আর সহমর্মিতার জোরে যে কোনো জায়গাই একদিন ‘বাড়ি’ হয়ে উঠতে পারে।
