
মহামারির দীর্ঘ প্রভাব কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার পথে ফিরছে কানাডার অফিস বাজার। কর্মীদের আবার অফিসমুখী করার উদ্যোগ জোরদার হওয়ায় দেশটিতে অফিস খালি থাকার হার কমতে শুরু করেছে। মহামারির পর এই প্রথম জাতীয়ভাবে অফিস খালি থাকার হারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেল। বুধবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিবিআরই লিমিটেড–এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে কানাডায় অফিস খালি থাকার হার দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় কম। ২০২৪ সালের শেষে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও হারটি কমেছে, তবু এটি এখনও মহামারির আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৯ সালে কানাডায় অফিস খালি থাকার হার ছিল মাত্র ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
সিবিআরই বলছে, এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রধান কারণ কর্মীদের অফিসে ফেরানোর বিষয়ে নিয়োগদাতাদের কঠোর অবস্থান। কোভিড-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি থেকে কাজের সংস্কৃতি চালু থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে সেই নীতি থেকে সরে আসছে।
বিশেষ করে কানাডার বেশ কয়েকটি বৃহৎ ব্যাংক ইতোমধ্যে কর্মীদের অফিসে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বর্তমানে তারা সেই নির্দেশ আরও জোরালোভাবে কার্যকর করছে। একই পথে হাঁটছে সরকারি খাতও। অন্টারিও সরকার তাদের কর্মীদের সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, যা অফিস ব্যবহারের চাহিদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে অফিস খালি থাকার হার কমার পেছনে শুধু চাহিদা বৃদ্ধি নয়, বাজারে নতুন অফিস স্পেসের সরবরাহ কমে যাওয়াও বড় কারণ। সিবিআরইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর কানাডায় নতুন অফিস ভবনের নির্মাণ শুরু এবং সম্পন্ন উভয় ক্ষেত্রেই রেকর্ড পরিমাণ কমেছে।
এছাড়া বর্তমানে যে অফিস ভবনগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে, সেগুলোর সংখ্যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর ফলে বাজারে নতুন অফিস স্পেস যোগ হওয়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
নির্মাণাধীন উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের তালিকাও খুবই সংক্ষিপ্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো টরন্টোর সিআইবিসি স্কয়ারের দ্বিতীয় পর্যায়, যার নির্মাণ চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা। সিবিআরই জানিয়েছে, কানাডার অন্য কোনো শহরের ডাউনটাউনে বর্তমানে তেমন কোনো বড় অফিস ভবনের নির্মাণ চলছে না। উপশহর এলাকাগুলোতেও অফিস ভবন নির্মাণ সীমিত এবং বিনিয়োগকারীরা সেখানে বেশ রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছেন।
অফিস স্পেসের মোট সরবরাহ কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো বিদ্যমান অফিস ভবন অন্য কাজে রূপান্তর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে কানাডায় ৭৮ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস অন্য কাজে রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৬ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস ভেঙে ফেলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই সময়ে কানাডায় অফিস স্পেসের মোট সরবরাহ ২ দশমিক ২ শতাংশ কমে গেছে, যা খালি থাকার হার কমাতে সহায়ক হয়েছে।
শহরভেদে অফিস খালি থাকার হারে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষে সবচেয়ে বেশি অফিস খালি থাকার হার ছিল ক্যালগেরিতে, যেখানে হার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। একই হার দেখা গেছে অন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরেও। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম অফিস খালি থাকার হার রেকর্ড করেছে ভ্যানকুভার ও হ্যালিফ্যাক্স। ভ্যানকুভারে হার ছিল ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, আর হ্যালিফ্যাক্সে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।
দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক নগরী টরন্টোতে অফিস খালি থাকার হার জাতীয় গড়ের সঙ্গে মিলেছে। ২০২৫ সালের শেষে সেখানে হার ছিল ১৮ শতাংশ। একই সময়ে মন্ট্রিয়ালে অফিস খালি থাকার হার দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
সিবিআরইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি নিয়োগদাতারা অফিসে উপস্থিতির নীতি আরও কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন করে এবং নতুন অফিস নির্মাণের গতি কমই থাকে, তাহলে আগামী দিনগুলোতেও অফিস খালি থাকার হার ধীরে ধীরে আরও কমতে পারে। তবে মহামারির আগের স্তরে ফিরতে এখনও সময় লাগবে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
