
মা।
আমাদের প্রিয় মাকে ছাড়া আজ নয় বছর।
জীবনের কিছু সময়ের স্মৃতি বা অনুভূতি সেভাবে মনে থাকেনা।
ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৭ তে সকাল এসেছিল গভীর এক দুঃখ বারতা নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ভাতিজি দোয়েলের ফোন পেয়ে ঘুম ভেঙেছিল। এত সকালে ফোন পেয়ে ফোনটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি। পাছে অন্য কারো ঘুম না ভাঙে।
ঘুম ভাঙলো সবারই।
দোয়েল তো শুধু দুটো শব্দ বলেছিল।
ফুপু, দাদী……………..
আর তো কিছু বলে নাই।
চুপ করে ছিল।
আমার সেই আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকার আমার কানেই বাজে!
কত ভয়, কত আশংকা নিয়ে কতরাত ঘুমাতে গেছি। কত বছর!
দূরে থাকলে এমন হয়। কুশলাদি জানার জন্য কেউ রাত গভীরে বা ভোরবেলা ফোন করেনা।
শুধু দুঃখগুলো এভাবেই আসে।
সময়, অসময়ে!
কারণ মানুষের চলে যাবার কোন নির্দিষ্ট সময় থাকে না!
মায়ের সাথে আমার সপ্তাহে অন্তত ৪/৫ দিন কথা হতো। যেদিন হতোনা ,মনে হতো কি যেনো বাকি থেকে গেলো।
খুব কম কথা বলতেন মা,তবু মা করে ডাকার একটা মানুষ! একটা বিশাল আশ্রয়! একটা অদ্ভুত মায়ার জায়গা। কারো প্রতি কোন অভিমান বলার জায়গা।
মাঝেমাঝে মা তার ভাইবোনদের গল্প বলতেন। শুরু করালেই ঝরঝর করে বলতেন।মায়ের কাছে ভাইবোন ছিল হীরা মুক্তার মত দামী।মা ছিলেন ছোট ভাইবোনের সবার প্রিয় মেজোবু ।
ভালোই ছিলেন মা।নিজের মত।
চলতে ফিরতেই চলে গেছেন। এভাবেই চাইতেন। যেনো বিছানায় পড়ে না থাকেন!
মা চলে যাবার পর, সব শূন্য হয়ে গেছে!মা চলে যাবার পর বুকের ভিতর ধূধূ অনুভব । সব কিছুর মধ্যে থেকেও কেমন যেনো হারানোর মধ্যে ডুবে থাকতাম। কত সন্ধ্যা গেছে ফোনটা নিয়ে বসে থেকেছি।
মনে হয়েছে একটা নম্বর কেনো আর নেই,যেখানে ডায়াল করলে বলবেন ,কে মা সাজি? এটা বললেই আমি ছোট্ট ফ্রক পড়া মায়ের আদরের সাজি হয়ে ,বেনী দুলিয়ে সামনে বসতাম মায়ের। টেলিফোনের ওই সময়টুকু আমার ভিতরে অদ্ভুত এক দোলাচল হতো!
মা হারানোর এই শূন্যতা বুঝতে পারতো যেই মানুষটা,সে রাশীকের বাবা ।কতদিন বলেছে,আমারো তো মা নাই সাজি।
ও হাত ধরে আমাকে টেনে তুলেছে,বলেছে বাবা মা চিরদিন থাকেনা। বলেছে বের হও সাজি,এই দুঃখ থেকে বের হও।
অথচ,এই না থাকার দলে প্রায় সাড়ে ৫ বছর হলো রাশীকের বাবা নিজেও চলে গেছে। রাশীক,রাইয়ান ওদের প্রিয় বন্ধু বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে।বাসমাহ মাঝেমাঝে মন খারাপ করে, বাবাটাকে বেশিদিন দেখা হলো না!
আমরা সবাই প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে কষ্টে ম্রিয়মান হয়ে আছি। আমার সংগী হারানোর বেদনা, ওদের বেদনার কাছে পথ খুঁজে পায়না।
বাবা মায়ের মত আপন আর কেউ হয় না! ওদের কষ্ট আমি বুঝি!
মা-বাবা হারানোর শোক কোনদিন ফুরায় না,শুধু বাড়ে!
একা বসে থাকলেই মনে হয় আমি একটা গাছ হয়ে যাই। আমার শেকড় বাকর গজাতে শুরু করে। আমি ডুবতে থাকি। গভীর সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকি।
মাকে ডাকি,
বাবাকে ডাকি।
পাশের মানুষকে ডাকি।
কেউ শোনে না!
বেঁচে থাকা মাঝেমাঝে ভীষণ ভার লাগে।আকাশের ওপারে আকাশে আশাকরি ভালো আছে তারা।
যেখানে গেছে তারা সবাই,সেখানে কি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার মত ‘হাওয়া বয় শন শন তারারা কাঁপে”?
সেখানে কি আমাদের জন্য মন কেমন করে ওপারে চলে যাওয়া প্রিয়জনদের?
আমার তো চোখে ভেসে যায়!
যখন তখন!
আজকাল অভিমানও হয় ছোটবেলার মতন।অভিমানের সেই কথা আর কাউকে বলা হয় না!
ওপারে ভালো থেকো মা।
যতদিন বাঁচি,প্রতিদিনের সব প্রার্থনায় তোমরা সবাই আছো মা।
রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানী সাগিরা।
অটোয়া
