
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন কানাডার অবস্থান নিয়েও দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রকাশ্য সমর্থনকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের দল লিবারেলেরই এক এমপি প্রশ্ন তুলেছেন এই অবস্থান কি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল, নাকি সরকার সচেতনভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে?
ভিক্টোরিয়ার লিবারেল এমপি উইল গ্রিভস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে সরাসরি এই প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মতামত হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা দ্রুতই লিবারেল দলের ভেতরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সাবেক কেবিনেট মন্ত্রীসহ দলের একাধিক প্রভাবশালী সদস্য তার পোস্টে সমর্থন জানান, যা দলীয় ভেতরের অস্বস্তিকেই স্পষ্ট করে।
ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় গ্রিভস বলেন, কানাডার নীতিগত অবস্থান সবসময় আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে। তার মতে, “একপাক্ষিক ও অবৈধ সামরিক শক্তি প্রয়োগ, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ বা হত্যার মতো কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আগ্রাসী যুদ্ধ পরিচালনার অধিকার কোনো দেশের নেই।
এই মন্তব্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রী কার্নির অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর হামলা শুরু করে, তখন কার্নি ভারত সফরে ছিলেন। চারদিনের সেই সফরের এক পর্যায়ে মুম্বাইয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন করে, যদিও তারা সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না।
কার্নির এই বক্তব্যে এক ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা দেখা গেলেও, সমালোচকদের মতে এতে দ্বৈত অবস্থানের ইঙ্গিত রয়েছে। একদিকে যুদ্ধের সমর্থন, অন্যদিকে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা এই অবস্থান কতটা নৈতিক বা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে কানাডা এই যুদ্ধে জড়াচ্ছে না এবং দেশটি সবসময় কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়। আনান্দ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে তিনি ইতোমধ্যে আলোচনা করেছেন। তবে বাস্তবতা হলো, সংশ্লিষ্ট কিছু দেশ মনে করছে বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তার মতে, পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অনিশ্চিত। তাই যত দ্রুত সম্ভব সংঘাতের পরবর্তী ধাপে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখা জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশও এখন এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে কাজ করছে।
তবে গ্রিভসের মতো সমালোচকরা মনে করছেন, কেবল কূটনীতির কথা বলা যথেষ্ট নয় সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে হবে, তারা কি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনাকে স্বীকার করছে, নাকি রাজনৈতিক কারণে তা উপেক্ষা করছে। ইরান ইস্যুতে কানাডার অবস্থান এখন শুধু বৈদেশিক নীতির প্রশ্ন নয়; এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আগামী দিনে এই বিষয়ে সরকার কী ব্যাখ্যা দেয় এবং দলীয় ভেতরের মতভেদ কতটা গভীর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
