কানাডা বাণিজ্য আলোচনার টেবিলে বসবে অংশীদার হিসেবে

Tall digital price board at an Esso Circle K gas station showing self-serve price 1.949 and diesel 2.149 under an overcast sky.
এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে কার্নি স্পষ্ট ভাষায় বলেন কানাডার বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মজুদকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর কষাকষির ঘুটি হিসেবে ব্যবহারের যে ধারণা তৈরি হয়েছে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না

উত্তর আমেরিকার ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক যখন আবারও নতুন অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে, ঠিক সেই সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন বাণিজ্য আলোচনায় কানাডা কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ বা সম্পদকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না। বরং অটোয়ার লক্ষ্য হবে সহযোগিতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বকে সামনে রেখে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।

এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে কার্নি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কানাডার বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মজুদকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষির “ঘুটি” হিসেবে ব্যবহারের যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তিনি এই বয়ানকে সরাসরি নাকচ করে দেন। কার্নির ভাষায়, “আমরা কোনো কিছু বিচ্ছিন্ন করা বা আলাদা করে দেখানোর কথা বলছি না।” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কানাডা তার সম্পদকে হুমকির হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং মহাদেশীয় অর্থনীতির যৌথ শক্তি হিসেবে দেখতে চায়।

- Advertisement -

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট ও বিরল খনিজের বাজারে কানাডা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী রাষ্ট্র। এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক ধারণা করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য আলোচনায় অটোয়া হয়তো তার সম্পদকে কৌশলগত চাপ তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু কার্নি সেই সম্ভাবনাকে একপ্রকার অস্বীকার করেছেন।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, কানাডা নিজেকে “সরবরাহকারী শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও সেটিকে সংঘাতের পথে নিতে চায় না। বরং তারা এমন একটি কাঠামো চায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা পরস্পরের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করবে।

কার্নির এই অবস্থান এমন এক সময় সামনে এলো যখন কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো বাণিজ্য চুক্তি সিইউএসএমএ পুনরায় আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এই চুক্তি আগামী বছরগুলোতে তিন দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার পরিবেশ ও রাজনৈতিক ভাষা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে যে বাণিজ্য উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং সীমান্তবাণিজ্যে কঠোর অবস্থান এসব কারণে দুই দেশের সম্পর্ক একসময় স্পষ্ট চাপের মুখে পড়ে। এখন ট্রাম্পের পুনরায় হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর সেই চাপ আবারও ফিরে আসছে বলে মনে করছেন অনেকে। এই বাস্তবতায় কার্নি সম্ভবত এমন একটি কূটনৈতিক ভাষা বেছে নিচ্ছেন, যা একদিকে কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়াবে।

রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল কার্নির তার পূর্বসূরী জাস্টিন ট্রুডো সম্পর্কে অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি প্রচলিত সমালোচনা ছিল যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিলেন ট্রুডো। বিশেষ করে তার কূটনৈতিক অবস্থান ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা তাকে আক্রমণ করত।

কিন্তু কার্নি সেই সমালোচনার পথ অনুসরণ করেননি। বরং তিনি ট্রুডোর প্রতি উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখিয়েছেন। সিইউএসএমএ চুক্তিকে সফলভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রুডোর ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। এটি শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তাও বহন করে। কার্নি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কানাডার বাণিজ্যনীতি ব্যক্তি-নির্ভর নয়; বরং এটি ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ।

এক বছর আগে ফেডারেল রাজনীতিতে প্রবেশ করা মার্ক কার্নি এখনো নিজেকে তুলনামূলকভাবে “নীতিনির্ভর ও পরিমিত” নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। সাক্ষাৎকারজুড়ে তার শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। আবার কানাডার কৌশলগত শক্তিকেও খাটো করেননি। বরং তার বক্তব্যে উঠে এসেছে “সহযোগিতামূলক শক্তি”র ধারণা। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কানাডার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা বজায় রেখেও নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। কার্নির বক্তব্যে সেই ভারসাম্যেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।

আসন্ন সিইউএসএমএ আলোচনা শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং এটি উত্তর আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন রূপরেখাও তৈরি করবে। কানাডা তার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের কারণে এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই শক্তিকে কূটনৈতিক চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে “পারস্পরিক নির্ভরতা”র ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন মার্ক কার্নি। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন সেই বার্তাকে কতটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতির মুখে কানাডা কতটা কার্যকরভাবে তার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে পারে।

- Advertisement -

Read More

Recent