
কানাডার অন্টারিও প্রদেশে এক ভয়াবহ কুকুর হামলার ঘটনায় আহত হওয়া এক ডগ ওয়াকারের দায়ের করা ১০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা খারিজ করে দিয়েছেন আদালতের দুই বিচারক। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় কুকুরটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব ডগ ওয়াকারের হাতেই ছিল। ফলে আইনগতভাবে তিনি নিজেই তখন প্রাণীটির “অস্থায়ী মালিক” বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন।
২০২২ সালের ২৪ মার্চ অন্টারিওর ওশাওয়া শহরে ওই ডগ ওয়াকার তার মক্কেলের বাড়িতে যান। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তার দায়িত্ব ছিল পরিবারের দুই পোষা কুকুরকে বাইরে হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া। এর মধ্যে একটি ছিল পাঁচ বছর বয়সী বৃহদাকৃতির বক্সার জাতের কুকুর “ফরেস্ট”। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ফরেস্টের পায়ে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসক বা ভেটেরিনারিয়ান পরামর্শ দিয়েছিলেন, ভেজা জায়গায় বের করার সময় কুকুরটির পায়ে রাবারের বুট পরাতে হবে, যাতে সংক্রমণ আরও না বাড়ে। তবে সমস্যা শুরু হয় তখনই। ডগ ওয়াকার প্রথমবারের মতো ফরেস্টের পায়ে বুট পরানোর চেষ্টা করেন। আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়, এক হাতে বুট নিয়ে তিনি যখন কুকুরটির পায়ের দিকে এগিয়ে যান, তখন আচমকাই ফরেস্ট ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
বিবরণ অনুযায়ী, ফরেস্ট প্রথমে ডগ ওয়াকারের বাম বাহুতে কামড় বসায় এবং শক্তভাবে ঝাঁকাতে থাকে। কোনোভাবে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং কুকুরটি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কামড়াতে থাকে। এই হামলায় ডগ ওয়াকারের পেট, বাম উরুর উপরের অংশ এবং দুই বাহুতে গুরুতর জখম হয়। পরে তাকে চিকিৎসা নিতে হয় এবং দীর্ঘ সময় শারীরিক ও মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
আদালতকে জানানো হয়, ফরেস্ট আগে কখনও ডগ ওয়াকারকে আক্রমণ করেনি। যদিও মালিকদের উপস্থিতিতে সে অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করত এবং কিছুটা উত্তেজিত আচরণ দেখাত। কিন্তু সরাসরি সহিংস আচরণের ইতিহাস ছিল না। আরও জানা যায়, ঘটনার আগেই ফরেস্টের মালিক অন্তত পাঁচবার সফলভাবে কুকুরটির পায়ে বুট পরিয়েছিলেন। ফলে মালিকপক্ষের দাবি ছিল, এটি ছিল একটি অপ্রত্যাশিত ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি ডগ ওয়াকার ওই দম্পতির বিরুদ্ধে ১০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের করেন। তার অভিযোগ ছিল, কুকুরটির মালিকরা যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেননি এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে পর্যাপ্তভাবে অবহিত করেননি।
দুই বিচারকই রায়ে বলেন, ঘটনার সময় ফরেস্টের উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ডগ ওয়াকারের হাতেই ছিল। তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং কুকুরটিকে পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সেই কারণে আইনের দৃষ্টিতে তিনি তখন কুকুরটির “কাস্টডিয়ান” বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হন। আদালত আরও উল্লেখ করে, যেহেতু কুকুরটির আগ্রাসী আচরণের সুস্পষ্ট পূর্ব ইতিহাস ছিল না, তাই মালিকদের অবহেলার দায় প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে পোষা প্রাণী সম্পর্কিত দায়বদ্ধতার মামলাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে পেশাদার ডগ ওয়াকার, ট্রেইনার কিংবা পোষা প্রাণী সামলানোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদালত “কার নিয়ন্ত্রণে প্রাণীটি ছিল” এই প্রশ্নটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাণী আচরণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসুস্থ বা অস্বস্তিতে থাকা কুকুর অনেক সময় আচমকা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নতুন কিছু পরানোর চেষ্টা করলে বা ব্যথাযুক্ত স্থানে স্পর্শ করলে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই ঘটনা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, পোষা প্রাণী যতই পরিচিত বা শান্ত স্বভাবের হোক না কেন, শারীরিক অস্বস্তি বা ভয় পেলে তারা অপ্রত্যাশিত আচরণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, চিকিৎসাজনিত কারণে কুকুরকে বিশেষ সরঞ্জাম পরানোর সময় প্রশিক্ষিত সহায়তা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
