কানাডা ছাড়তে পারে নর্ডভিপিএন

Two men in suits posing for a photo at a formal event, one in a light gray suit and polka-dot tie, the other in a dark suit with a pink tie.
গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায় তারা বিলটির বিভিন্ন ধারা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে

কানাডার ফেডারেল সরকারের প্রস্তাবিত ‘লফুল অ্যাকসেস’ বা আইনসিদ্ধ প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত বিল সি-২২ নিয়ে প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নর্ডভিপিএন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, নতুন আইন কার্যকর হলে যদি তাদের ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও এনক্রিপশন ব্যবস্থার সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য করা হয়, তবে তারা কানাডা থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।

গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা বিলটির বিভিন্ন ধারা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে। বিশেষ করে এমন কোনো বিধান থাকলে, যা তাদের তথাকথিত “নো-লগস” নীতিকে দুর্বল করতে পারে কিংবা ব্যবহারকারীদের এনক্রিপ্টেড তথ্যের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করতে পারে, তাহলে সেটি তাদের ব্যবসায়িক ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

- Advertisement -

নর্ডভিপিএনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের পুরো অবকাঠামো গড়ে উঠেছে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ ও অনলাইন গোপনীয়তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির ওপর। কোম্পানিটি বলেছে, “বিল সি-২২ যদি পাস হয় এবং সেটি বাস্তবায়নে আমাদেরকে এনক্রিপশন দুর্বল করতে বা ব্যবহারকারীর তথ্য সংরক্ষণ নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা হয়, তাহলে আমরা সম্ভাব্য সব বিকল্প বিবেচনা করব। প্রয়োজনে কানাডায় আমাদের উপস্থিতি সীমিত করা কিংবা সম্পূর্ণভাবে কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।”

প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে বিলটি সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার আওতায় রয়েছে এবং তারা পুরো প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে অনুসরণ করছেন। তার ভাষায়, “নর্ডভিপিএনের মূল দর্শনই হচ্ছে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো আইন এমন হওয়া উচিত নয়, যা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারকারীর এনক্রিপশন দুর্বল করতে বাধ্য করে।”

ভিপিএন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে “নো-লগস” নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর অর্থ হলো, ব্যবহারকারীরা কোন ওয়েবসাইট ব্যবহার করছেন, কী ধরনের তথ্য আদান-প্রদান করছেন কিংবা কোথা থেকে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হচ্ছেন এসব তথ্য প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষণ করে না। ফলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত কার্যক্রম তৃতীয় পক্ষের কাছে সহজে পৌঁছায় না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বাড়তি নজরদারির সুযোগ তৈরি করতে চায়, তখন প্রায়ই এনক্রিপশন ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে সংঘাত তৈরি হয়। কারণ একদিকে সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনকে অগ্রাধিকার দেয়, অন্যদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ব্যবহারকারীর গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে তুলে ধরে।

নর্ডভিপিএনের আগেই একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জনপ্রিয় এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম সিগন্যাল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে কানাডার প্রভাবশালী এক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন জানায়, প্রস্তাবিত বিলের কারণে যদি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে সিগন্যালও কানাডা থেকে কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে পারে। সিগন্যাল দীর্ঘদিন ধরেই “এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন” প্রযুক্তির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, তাদের প্ল্যাটফর্মে আদান-প্রদান হওয়া বার্তা এমনভাবে সুরক্ষিত থাকে যে, ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কেউ এমনকি সিগন্যাল নিজেও সেসব বার্তা পড়তে পারে না।

বিষয়টি এখন কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য জ্যাকব ম্যান্টল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে উল্লেখ করেন, অনেক সংসদ সদস্যও ব্যক্তিগত ও পেশাগত যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড সেবা ব্যবহার করেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আইনটির প্রভাব শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাও এর প্রভাব অনুভব করতে পারেন।

কানাডার এই বিলকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত ডিজিটাল যুগের একটি দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বেরই নতুন রূপ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বনাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। সরকারের যুক্তি হচ্ছে, অনলাইন অপরাধ, সাইবার হামলা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা উচিত। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গোপনীয়তা অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, একবার এনক্রিপশন ব্যবস্থায় “ব্যাকডোর” বা বিশেষ প্রবেশাধিকার তৈরি করা হলে তা ভবিষ্যতে অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াবে।

এই পরিস্থিতিতে বিল সি-২২ নিয়ে সংসদীয় আলোচনার ফলাফলের দিকে এখন নজর রাখছে প্রযুক্তি খাত, গোপনীয়তা অধিকার সংগঠন এবং কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। কারণ এই আইন শুধু কানাডার জন্য নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি নীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।

- Advertisement -

Read More

Recent