
কানাডার সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা বা ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স-কে দেওয়ানি ক্ষতিপূরণ দাবি করার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র আইনি ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুক্রবার ঘোষিত এই রায়কে নারীর অধিকার ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মামলাটি করেছিলেন এক নারী, যিনি তার ১৬ বছরের বৈবাহিক জীবনে স্বামীর হাতে দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের শিকার হন। আদালতে তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামী শুধু তাকে মারধরই করেননি, বরং ধারাবাহিকভাবে ভয়ভীতি, অপমান, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এবং মানসিক নিপীড়নের মাধ্যমে তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা ভেঙে দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বিচারপতি নিকোলাস কাসিরার বলেন, “ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি, যা মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সমতার ওপর ভয়াবহ আঘাত হানে।” আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, প্রচলিত আইনি কাঠামোয় হামলা, শারীরিক আঘাত বা ইচ্ছাকৃত মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টির মতো অভিযোগের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দাবি করা গেলেও, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সহিংসতার ফলে একজন মানুষের ওপর যে জটিল ও বহুমাত্রিক ক্ষতি তৈরি হয়, তা এসব আইনি উপায়ে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
রায়ে বলা হয়, ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, যার মাধ্যমে এক সঙ্গী অন্য সঙ্গীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক অবস্থানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। আদালতের মতে, এই ধরনের নির্যাতনের ফলে ভুক্তভোগী কার্যত নিজের স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে ফেলেন।
এই রায় ভবিষ্যতে পারিবারিক সহিংসতার মামলাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে ব্যবহৃত হবে। কারণ এর মাধ্যমে আদালত প্রথমবারের মতো স্বীকার করল যে, সম্পর্কের ভেতরে চলমান মানসিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক আচরণও স্বাধীনভাবে ক্ষতিপূরণের দাবি তৈরির জন্য যথেষ্ট।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সহিংসতার শিকার অনেক নারী আদালতে ন্যায়বিচার পেলেও তাদের অভিজ্ঞতার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাননি। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট।
আইনবিদদের মতে, কানাডার এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য দেশেও পারিবারিক সহিংসতা সংক্রান্ত দেওয়ানি আইনের সংস্কারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেখানে মানসিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণকে এখনো স্পষ্টভাবে আইনি অপরাধ বা ক্ষতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
এই রায়কে অনেকেই নারীর নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় বিচার বিভাগের একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখছেন। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, সম্পর্কের আড়ালে চলা সহিংসতা আর শুধুই “ব্যক্তিগত বিষয়” হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং এটি আইনের চোখে গুরুতর নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন।
