
কানাডায় আবাসন সংকট মোকাবিলায় ফেডারেল সরকার ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকারের যৌথ উদ্যোগে ঘোষিত একটি নতুন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অবিক্রিত কন্ডোমিনিয়াম (কন্ডো) ইউনিট কিনে সেগুলোকে সাশ্রয়ী আবাসনে রূপান্তরের পরিকল্পনার স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংসদীয় এথিকস কমিটির মাধ্যমে জরুরি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন কনজার্ভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর।
রোববার সংসদের এথিকস কমিটির চেয়ারম্যান এবং কনজার্ভেটিভ এমপি জন ব্র্যাসার্ডের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পয়লিয়েভর অভিযোগ করেন, সরকার এমন একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে যার ফলে শেষ পর্যন্ত করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে হাজার হাজার অবিক্রিত কন্ডো কিনতে হবে। তাঁর ভাষায়, এটি মূলত একটি “কন্ডো বেইলআউট” যেখানে আবাসন বাজারে বিক্রি না হওয়া সম্পত্তি সরকারি অর্থে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে।
ফেডারেল সরকার ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকার চলতি বছরের ১৯ জুন যৌথভাবে “কানাডা–ব্রিটিশ কলাম্বিয়া পার্টনারশিপ অন কন্ডো কনভার্সন” নামে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই হাজারেরও বেশি অবিক্রিত কন্ডো ইউনিট সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করে সেগুলোকে সাশ্রয়ী ভাড়ার আবাসনে রূপান্তর করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৪৫ কোটি কানাডিয়ান ডলার। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ অর্থায়ন করবে কানাডার ফেডারেল সরকার এবং অবশিষ্ট ব্যয় বহন করবে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকার। সরকারের দাবি, নতুন আবাসন নির্মাণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে ইতোমধ্যে নির্মিত কিন্তু বিক্রি না হওয়া ইউনিটগুলোকে দ্রুত মানুষের বসবাসের উপযোগী সাশ্রয়ী আবাসনে রূপান্তর করাই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।
চিঠিতে পিয়েরে পয়লিয়েভর দাবি করেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার এমন সব কন্ডো কিনতে যাচ্ছে যেগুলো বর্তমান বাজারদরে সাধারণ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ানদের নাগালের বাইরে অথবা ক্রেতারা সেগুলো কিনতে আগ্রহী নন। তিনি আরও বলেন, বাজারে বিক্রি না হওয়া বেসরকারি সম্পত্তি সরকারি অর্থে কিনে নেওয়া করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নয়। তাঁর মতে, সরকার কার্যত রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের ক্ষতি কমানোর জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় করতে চাইছে। এই কারণেই তিনি সংসদীয় এথিকস কমিটির মাধ্যমে পুরো কর্মসূচির পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, কর্মসূচিটির লক্ষ্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং আবাসন সংকটের দ্রুত সমাধান করা। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ভবন নির্মাণে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু ইতোমধ্যে নির্মিত ও অবিক্রিত কন্ডোগুলোকে সাশ্রয়ী আবাসনে রূপান্তর করলে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে হাজারো পরিবারকে বাসস্থানের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রবৃদ্ধি এলাকায় দ্রুত আবাসন সরবরাহ বাড়ানোর জন্য দুই সরকার উদ্ভাবনী অর্থায়নের বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করছে। এই উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টারই একটি অংশ।
“কানাডা–ব্রিটিশ কলাম্বিয়া পার্টনারশিপ অন কন্ডো কনভার্সন” প্রকল্পটি ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকারের ১০ বছর মেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। এই বৃহৎ পরিকল্পনায় ফেডারেল সরকার পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারের আশা, এই অর্থায়নের মাধ্যমে শুধু আবাসন নয়, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে।
কানাডায় দীর্ঘদিন ধরেই আবাসনের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং সীমিত সরবরাহ বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও অন্টারিওর মতো প্রদেশে বাড়ির দাম এবং ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সরকার বিভিন্ন বিকল্প উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, আবাসন সংকট সমাধানের নামে যদি সরকারি অর্থ ব্যবহার করে বাজারে বিক্রি না হওয়া সম্পত্তি কেনা হয়, তাহলে তা মুক্তবাজার নীতির পরিপন্থী হতে পারে এবং করদাতাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে সরকার মনে করছে, অব্যবহৃত আবাসনকে দ্রুত মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা নতুন নির্মাণের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ও সময়োপযোগী সমাধান হতে পারে।
কর্মসূচিটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে সরকার এটিকে আবাসন সংকট মোকাবিলার দ্রুত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে কনজার্ভেটিভ পার্টি এটিকে করদাতাদের অর্থে রিয়েল এস্টেট খাতকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যায়িত করছে। সংসদীয় এথিকস কমিটি তদন্তে সম্মতি দেয় কি না এবং তদন্ত হলে তাতে কী তথ্য উঠে আসে, সেটিই এখন কানাডার আবাসন নীতি ও রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
