বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হারিয়েছে কানাডা

Aerial view of rural farmland with wind turbines on the horizon; a rectangular green field is outlined by blue lines, with a wetland and brown fields to the left and crops to the right.
কৃষিজমি হারানোর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে

টরন্টো শহর থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ৬৬ হেক্টরের একটি ফলের বাগান। বাইরে থেকে এটি হয়তো একটি সাধারণ খামার বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু কানাডার কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য উৎপাদন নিয়ে যে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে, সেই বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে এই জমি। এই খামারের মালিক চার্লস স্টিভেন্স। কয়েক বছর আগে একজন রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার তার কাছে এই জমির বিনিময়ে এক কোটি ৬০ লাখ কানাডিয়ান ডলার প্রস্তাব করেছিলেন। অধিকাংশ মানুষের কাছে এমন প্রস্তাব লোভনীয় হওয়ারই কথা। কিন্তু স্টিভেন্স সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল পরিষ্কার একবার কৃষিজমি কংক্রিটের শহরে পরিণত হলে সেটিকে আর কখনও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

ডেভেলপারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর শুধু জমি বিক্রি না করেই থেমে থাকেননি স্টিভেন্স। বরং তিনি ও তার পরিবার এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে আগামী ৯৯ বছর এই জমি শুধুমাত্র কৃষিকাজ এবং ফল উৎপাদনের জন্যই ব্যবহার করা যায়। এ জন্য তারা অন্টারিও ফার্মল্যান্ড ট্রাস্টের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সংরক্ষণ স্বত্ব তৈরি করেছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে জমির মালিক পরিবর্তন হলেও এটি আবাসন প্রকল্প, শিল্প এলাকা কিংবা বাণিজ্যিক উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। স্টিভেন্সের ভাষায়, “আমি চাই না আমার সন্তান বা নাতি-নাতনিরা একদিন পানামা কিংবা অন্য কোনো দেশ থেকে ব্লুবেরি কিনে খেতে বাধ্য হোক। আমরা কি সারাজীবন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেই ফল খাব? আমি তা বিশ্বাস করি না।” তার এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং কানাডার খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন।

- Advertisement -

উইলমট অর্চাডসকে কানাডার অন্যতম উন্নত ফল উৎপাদনকারী কৃষিজমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানকার মাটি, আবহাওয়া এবং পরিবেশ এমন যে দেশের অনেক অঞ্চলের তুলনায় এখানে উন্নতমানের ফল উৎপাদন সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন উচ্চমানের কৃষিজমির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ খাদ্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত জমির সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

চার্লস স্টিভেন্সের লড়াই আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় সংকটের প্রতিচ্ছবি। ২০২১ সালের কানাডার কৃষিশুমারি অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ ৩.২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর কৃষিজমি উৎপাদন ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে। অন্যদিকে কানাডিয়ান ফেডারেশন অব এগ্রিকালচার আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৮.৫ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়েছে কানাডা। এর পরিমাণ ৫০ লাখ হেক্টরেরও বেশি। এই হারানো জমির আয়তন প্রায় পুরো নোভা স্কশিয়া প্রদেশের সমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমি একবার আবাসিক বা শিল্প এলাকায় পরিণত হলে তা ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের জন্য পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কৃষিজমি হারানোর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো দ্রুত নগরায়ণ। টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার, ক্যালগেরি ও অন্যান্য বড় শহরের আশপাশে আবাসন নির্মাণের চাহিদা বাড়ছে। ফলে ডেভেলপাররা কৃষকদের কাছে বিপুল অর্থের বিনিময়ে জমি কেনার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এ ছাড়া শিল্প এলাকা সম্প্রসারণ, মহাসড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, জমির উচ্চ মূল্য, এবং কৃষিকাজের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এসব কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করছেন।

কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো উত্তরসূরি সংকট। অনেক কৃষকের সন্তান কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত আয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে তরুণ প্রজন্ম অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছে। ফলে বহু পারিবারিক খামার উত্তরসূরি না থাকায় শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার সম্প্রতি একটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেছে। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হল আগামী এক দশকে দেশীয় খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা, কৃষি খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন, এবং খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা কমানো। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, একদিকে সরকার খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে চায়, অন্যদিকে যদি কৃষিজমিই দ্রুত হারিয়ে যায়, তাহলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?

চার্লস স্টিভেন্সের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে ব্যক্তিগত ত্যাগের উদাহরণ হতে পারে। কোটি ডলারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি শুধু একটি জমি রক্ষা করেননি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। কৃষিজমি সংরক্ষণ এখন শুধু কৃষকদের দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং খাদ্য ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। যদি বর্তমান হারে কৃষিজমি হারাতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কানাডাকে আরও বেশি খাদ্যের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সংকটের সময় খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। চার্লস স্টিভেন্সের মতো কৃষকদের লড়াই তাই কেবল একটি খামার বাঁচানোর লড়াই নয় এটি কানাডার কৃষি, খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উর্বর জমি সংরক্ষণের এক প্রতীকী সংগ্রাম।

রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Read More

Recent