
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ মুহূর্ত তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করলে তার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে, তারই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া। প্রায় অপরিচিত এক নারীর অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে তা একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করায় শেরিফ এলবিশলাবি নামে এক ব্যক্তিকে ২০ হাজার কানাডীয় ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রদেশটির সিভিল রেজ্যুলুশন ট্রাইব্যুনাল। শুক্রবার প্রকাশিত ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনাটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একজন নারীর মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনি অধিকারকে ক্ষুণ্ন করারও শামিল। যদিও ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকাশ করা হয়নি, তবে রায়ে ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, একটি নাইট ক্লাবের বাইরে ওই নারীর সঙ্গে শেরিফ এলবিশলাবির পরিচয় হয়। পরে নারীটি তার গাড়িতে লিফট নিতে সম্মত হন। সেই সময় এলবিশলাবির এক বন্ধু মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিও ধারণের সময় নারীর স্কার্ট সরে গিয়ে এমনভাবে ওপরে উঠে যায় যে তার অন্তর্বাস স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, একটি ভিডিও এমন কোণ থেকেও ধারণ করা হয়, যা সরাসরি তার স্কার্টের ভেতরের অংশকে লক্ষ্য করে করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের সদস্য মারিয়া মন্টগোমারি তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ভিডিওগুলোতে নারীটিকে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল। ফলে এগুলো ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ তথ্য প্রকাশের আওতায় পড়ে।
শেরিফ এলবিশলাবি দাবি করেছিলেন, ভিডিওটি কোনোভাবেই “অন্তরঙ্গ” নয় এবং ওই নারী ভিডিও ধারণ ও প্রকাশে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এই দুই দাবিই প্রত্যাখ্যান করে। রায়ে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার আইনে যে ধরনের ছবি বা ভিডিওকে “অন্তরঙ্গ” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এই ভিডিও তার সব শর্ত পূরণ করে। আইনে অন্তরঙ্গ ছবি বলতে এমন ছবি বা ভিডিওকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনো ব্যক্তি নগ্ন বা প্রায় নগ্ন অবস্থায় থাকেন, যৌনাঙ্গ বা স্তন দৃশ্যমান থাকে অথবা এমন কোনো দৃশ্য থাকে যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আওতায় পড়ে। ট্রাইব্যুনাল আরও উল্লেখ করেছে, যদি সত্যিই নারীর সম্মতি থাকত, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষ ভিডিওগুলো সরিয়ে নিত না।
মামলার শুনানিতে উঠে আসে, ভিডিওগুলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশের পর মেটা কর্তৃপক্ষ দুই দফায় সেগুলো তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এলবিশলাবির অ্যাকাউন্টও সাময়িকভাবে অকার্যকর করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের মতে, এই পদক্ষেপও প্রমাণ করে যে ভিডিওগুলো সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নীতিমালার পরিপন্থী ছিল।
রায়ে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ভিডিও প্রকাশের ফলে ভুক্তভোগীকে মানসিক কষ্ট, সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাহানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ২০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে সম্প্রতি আইন আরও কঠোর করা হয়েছে। আগে সিভিল রেজ্যুলুশন ট্রাইব্যুনাল এ ধরনের মামলায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। তবে চলতি বছরের শুরুতে সেই সীমা বাড়িয়ে ৭৫ হাজার ডলার করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা আরও কার্যকর আইনি প্রতিকার পাবেন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই রায় শুধু একটি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ নয়, বরং ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি কিংবা ভিডিও প্রকাশ করা যে গুরুতর আইনি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, এই রায়ের মাধ্যমে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, আর আদালতের এই সিদ্ধান্ত সেই নীতিকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
