সংকটে কুইবেকের ভিডিও গেম শিল্প

Convention floor with a 'Video Games' booth; glass display cases and shelves filled with games as attendees browse.
জনপ্রিয় গেম ফলআউট ৭৬ এবং বহুল প্রতীক্ষিত দি ইল্ডার স্ক্রলস ৬ এর উন্নয়নে যুক্ত একাধিক কর্মীকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের চাকরির ইতি ঘটতে চলেছে

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের ঢেউ এবার আরও স্পষ্টভাবে আঘাত হেনেছে ভিডিও গেম শিল্পে। মাইক্রোসফটের গেমিং বিভাগ এক্সবক্সের ব্যাপক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কানাডার মন্ট্রিয়লের বেথেসডা গেম স্টুডিওতেও শুরু হয়েছে কর্মী ছাঁটাই। জনপ্রিয় গেম ফলআউট ৭৬ এবং বহুল প্রতীক্ষিত দি ইল্ডার স্ক্রলস ৬-এর উন্নয়নে যুক্ত একাধিক কর্মীকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের চাকরির ইতি ঘটতে চলেছে।

স্টুডিও-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মেরিল্যান্ডভিত্তিক এক পরিচালক কর্মীদের একটি অংশকে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানান। মন্ট্রিয়লে বেথেসডার প্রায় ১২০ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়েছেন।

- Advertisement -

যারা এই বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন, তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। কারণ, তাদের অনেকেরই চাকরি এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং প্রকাশ্যে মন্তব্য করলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। অন্যদিকে, এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও এক্সবক্স কিংবা বেথেসডা কোনো প্রতিষ্ঠানই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

মন্ট্রিয়লের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি মূলত মাইক্রোসফটের গেমিং ব্যবসাকে নতুনভাবে সাজানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কোম্পানিটি সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, আগামী এক বছরের মধ্যে এক্সবক্স বিভাগ থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। গেমিং বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। নতুন গেম তৈরির ব্যয় বেড়েছে, উন্নয়ন সময়সীমা দীর্ঘ হয়েছে এবং প্রত্যাশিত আয় অনেক ক্ষেত্রেই অর্জিত হচ্ছে না। ফলে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যয় কমানো এবং ব্যবসাকে আরও লাভজনক করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভিডিও গেম শিল্পে অভূতপূর্ব চাহিদা তৈরি হয়েছিল। লকডাউনের সময় কোটি কোটি মানুষ ঘরে বসে গেম খেলায় বেশি সময় ব্যয় করায় কোম্পানিগুলো দ্রুত কর্মী নিয়োগ ও নতুন প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু মহামারি শেষ হওয়ার পর সেই চাহিদা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, সুদের হার এবং পরিচালন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন আগের সম্প্রসারণ নীতির পরিবর্তে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। এরই ফল হিসেবে বিশ্বজুড়ে একের পর এক স্টুডিওতে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

কুইবেক ভিডিও গেম ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান জাঁ-জ্যাক হারমান্স বলেন, ভিডিও গেম শিল্প এখনও পুনর্গঠনের একটি কঠিন পর্যায় অতিক্রম করছে। তার ভাষায়, বর্তমানে অনেক গেম প্রকল্প বাতিল হচ্ছে কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে। এমনকি একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নতুন প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই দক্ষ কর্মীদের চাকরি হারাতে হচ্ছে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতি খুব একটা দেখা যায়নি। তিনি মনে করেন, শিল্পের এই অস্থিরতা আগামী কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে, কারণ কোম্পানিগুলো এখন ঝুঁকি কমিয়ে সীমিত সংখ্যক প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চাইছে।

ভিডিও গেম শিল্প কানাডার কুইবেক প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। অ্যাসোসিয়েশন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নরডিসিটির তথ্য অনুযায়ী, কুইবেকে বর্তমানে ৩০০টিরও বেশি গেম স্টুডিও রয়েছে। পুরো কানাডায় প্রায় ৩৪ হাজার গেম ডেভেলপারের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশই কুইবেকে কর্মরত। শুধু এই শিল্প থেকেই প্রতি বছর প্রদেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার যোগ হয়। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান এপিক গেমস এবং ইউবিসফটেরও বড় বড় ডেভেলপমেন্ট স্টুডিও রয়েছে মন্ট্রিয়লে। ফলে এই খাতে যেকোনো সংকট সরাসরি হাজার হাজার কর্মী এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

শিল্পের সংকট কেবল মাইক্রোসফট বা বেথেসডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের শুরুতেই এপিক গেমস প্রায় এক হাজার কর্মী, অর্থাৎ মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ২০ শতাংশকে ছাঁটাই করে। সেই সিদ্ধান্তে মন্ট্রিয়লের বেশ কিছু কর্মীও ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্যদিকে, ইউবিসফট হ্যালিফ্যাক্স ও উইনিপেগের দুটি স্টুডিও বন্ধ করার পাশাপাশি প্রায় ১৪০ জন কর্মীকেও অব্যাহতি দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভিডিও গেম শিল্পে ব্যয় সংকোচন এখন একটি বৈশ্বিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি গেম উন্নয়ন ব্যয় এবং বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা আগামী কয়েক বছর ভিডিও গেম শিল্পকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বড় বাজেটের প্রকল্পগুলো আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী সংখ্যা কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করছে।

তবে আশার দিকও রয়েছে। কুইবেক এখনও উত্তর আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী গেম ডেভেলপমেন্ট কেন্দ্র। দক্ষ জনবল, সরকারি প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কারণে দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আপাতত হাজারো কর্মীর জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নতুন কর্মসংস্থানের কঠিন লড়াই।

- Advertisement -

Read More

Recent