
এই লেখাটির শুরু হতে পারে কেনেডিয়ান সিভিল লিবার্টি এসোসিয়েশনের একটি বক্তব্য দিয়ে। তারা মনে করেন, when government actors are allowed to decide which opinions can be expressed and which cannot, an open, vibrant and diverse society quickly breaks down.
আমাদের দেশে রাষ্ট্রের হ’য়ে সরকার স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে আপনাকে, আপনি কি লিখবেন আর কি লিখবেন না, কি বলবেন আর কি বলবেন না, কতদূর যাবেন আর কতদূর যাবেন না এবং যদি আপনি অই বেধে দেয়া সীমানা অতিক্রমের দুঃসাহস দেখান কদাচিৎ [এ দেশ পরাধিন নয় যদিও, তারপরও কথায় কথায় কথা বলতে চাইবেন অর্থাৎ বাক স্বাধীনতার কথা বলবেন তা হবে না] তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে বাঁচানোর দায়-দায়ীত্ব আপনার নিজের; সরকার এই দায়ীত্বের বাড়ির ধারকাছ দিয়েও যাবে না। অথৈ সমুদ্রে ঝাপ যখন দিয়েছেন, সাতরে কুলে ওঠার দায়-দায়ীত্বও আপনার। এধরনের কথা যখন উচ্চারিত হয় সরকার প্রধান কিংবা সরকারে থাকা গুরুত্বপূর্ন লোকদের মুখে তখন দেশে আদৌ কোন সরকার আছে কিনা, এমন সন্দেহ স্বাভাবিক। সরকারের অস্তিত্ব নিয়েই একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান সরকার যে বিপুল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে তা চোখে পড়ার মতো। এরই মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তা এক কথায় অভুতপূর্ব। স্বাধীনতা উত্তরকালে আমাদের দেশের কোন সরকারই এ ধরনের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে বিভিন্ন অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোর অবকাঠামোতে।। মানুষ তার সুফল পেতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। এজন্য সরকার সাধুবাদ পেতেই পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই উন্নয়ন দেশের মানুষের জন্যই। আর দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের দৃশ্যচিত্রটি অর্থহীন হয়ে যাবে, মানুষের চোখের সামনে থেকে চলন্ত ট্রেনের জানালায় অপসৃয়মান দৃশ্যাবলীর মতো অপসৃত হয়ে যাবে দ্রæত।
গুপ্তহত্যা, ধর্ষন, খুন গুম, সংখ্যালঘুদের উপর অবাধ নির্যাতন, তাঁদের ভিটাবাড়ি থেকে উৎখাত, উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, ভিন্নমতাবলম্বিদের উপর রাজনৈতিক নিপীড়ন, উপজাতীয় এবং বিশেষ করে পাহাড়ী লোকদের উপর হামলা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠেছে যার পুরোটাই আমাদের শাসনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমাদের দেশে চুন থেকে পান খসলেই আমরা ঝাপিয়ে পড়ি সংখ্যালঘুদের উপর। এ ধরনের হিং¯্র-ট্রেন্ড আমাদের দেশে নতুন নয়। কেন আমরা কথায় কথায় নিরীহ সংখ্যালঘুদের উপর ঝাপিয়ে পড়ি? কারণ, তাঁরা সফ্ট টার্গেট। আমরা তাঁদের মন্দির ভাঙ্গি, আমাদের কিছুই হয় না। প্যাগোডায় আগুন দেই, কেউ আমাদের স্পর্শ করতে পারে না। উচ্ছেদ করি তাঁদেকে তাঁদের ভিটেবাড়ি থেকে যেখানে তাঁরা বাস করে আসছিলেন বংশানুক্রমে। তারপরও আমরা থাকি ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমরা ভয়হীন। কারণ, আমাদের এইসব অমানবিক পৈশাচিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত সরকারি দল ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদদাতা হচ্ছেন স্থানীয় সাংসদ কিংবা জেলা উপজেলা পর্যায়ের নেতা উপনেতারা। এই অভিযোগ শুধু আমার নয়, অভিযোগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও সিনিয়র নেতা, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও নির্যাতনের জন্য আওয়মী লীগের নেতা কর্মীরাই দায়ী’। আর সরকারী দলের লোক বলেই দুস্কৃিতকারীরা থেকে
যাচ্ছে আইনের আওতার বাইরে। দেশে যদিও আইন আছে, তবে বিচার নেই। আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থা এখন অনেকটা মৃত মাছের ঘোলাটে চোখের মতো, যেন স্থির ও নিশ্চল।
একজন মানুষের স্বাধীন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকু, নাগরিক আভিজাত্যটুকু হরণ করছে কতিপয় জংলি আইন। যদিও এমন দু’একটি আইনের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত দৃড় অবস্থান নিয়েছে ইদানিং। রিমান্ড, সাদা পোষাকে এসে ধরে নিয়ে গুম করে ফেলা, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, ক্রশফায়ার এইসব বিবেক বর্জিত অমানবিক নিষ্ঠুর আচরন কোন সভ্য রাষ্ট্রের চরিত্র হ’তে পারে না। এর কোনটাই আইনসম্মত আচরন নয়, বরং এ ধরনের আচরন যে কোনো সভ্য দেশে ‘রাষ্ট্রিয় সন্ত্রাস’ হিসেবে বিবেচিত। অথচ কি আশ্চর্য, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গিকার ছিল যে, তারা ক্ষমতায় এসে বিচারবহির্ভুত প্রতিটি হত্যাকান্ডের বিচার করবেন। জাতির দূর্ভাগ্য যে, ক্ষমতাসীন দলটি তাদের কথা রাখেননি। যদিও পরপর দ’ুবার তারা ক্ষমতায় এসেছেন। একটি বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডেরও বিচার হয়নি। উল্টো রিমান্ড, গুম, ক্রশফায়ার এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ এক ভয়ংকর সাম্প্রদায়ীক, সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রিয় সন্ত্রাস আর অন্যদিকে সরকারের কারো কারো বেসামাল কথাবার্তা আর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কালো অন্ধকারের মতো মাথাচারা দিয়ে উঠছে সর্বগ্রাসী মৌলবাদ। ভবিষ্যত নির্বাচনের আগাম কৌশল কিনা জানি না, তবে সরকার বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছেন বলেই আমার বিশ্বাস। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এবং নানা পেশার নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা নিজেদের অবস্থানের জানান দিচ্ছে। একটি হত্যাকান্ডেরও বিচারের রায় হতে আমরা দেখিনি এ পর্যন্ত। বরং প্রতিটি হত্যাকান্ডের বিচার বিচারবিভাগীয় দীর্ঘসূত্রিতার বিভ্রম-বিভ্রান্তির মহাঘোরের ভিতর আটকা পড়ে যাচ্ছে। আর এদিকে মৌলবাদের ঘৃন্য কালো থাবা ও নখের আঁচড়ে আজ রক্তাক্ত আমাদের মানচিত্র।
ভয় ও আতংকের ভিতর আমরা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে ফেলছি কথা বলার মতো সাহসী মানুষ। সবাই যেন একটি অলিখিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছে। ক্ষেত্র বিশেষে যেন স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। কথা বলার অবাধ স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিবর্তে ভয় ও আতংকের অস্ত্র দিয়ে দেশ চালানোর একনায়কসুলভ আচরনের ফ্যাসিবাদী রূপটি একটি দ্রæত উন্নয়নশীল দেশের জন্য কল্যানকর তো নয়ই বরং মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ক্ষমতাসীন দলটি যে এটা বোঝেন না তা নয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, কিছু কিছু গনতান্ত্রিক দেশেও ভয়, আতংকের অস্ত্র দিয়ে দেশ পরিচালনা করার ডেমাগগিয়ান এটিচ্যুড লক্ষ্য করা যায়।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কম্যুউনিষ্ট কিংবা কট্টর রাজতান্ত্রিক দেশের স্বৈরাচারী পদ্ধতি অনুসরন না করে বরং সরকারকে আচার আচরন, চলনে বলনে হতে হবে জনবান্ধব সরকার, মানুষের মুখ থেকে যারা খুলে নেবেন স্কচ টেপ। নিশ্চিত করবেন মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা। নাগরিক জীবনকে করে তুলবেন ভয় ভীতিহীন। মানুষেরা খুঁজে পাবে শান্তি ও স্বস্তি।একটি জনকল্যানকামী সরকারের কাছে মানুষের এটুকুই শুধু প্রত্যাশা।
ইস্টইয়র্ক, অন্টারিও, কানাডা
