অনন্য সৃষ্টি বুর্জ খালিফা


ছবিটিমো ভলজ

উষ্ণ বালুর বুকে দাবদাহে ত্বক পুড়লেও সূর্যের হাসি আড়াল হয়না। সূর্যের হাসি দেখতে দুবাইয়ের ভবনগুলো যেনো প্রতিযোগিতা শুরু করলো। সবার উপরে যে উঠৈ এলো তার নাম রাখাল বালকেরাও জানে। হ্যাঁ, বলছিলাম বুর্জ খলিফার কথা। আর একটু উঁচুতে উঠলেই এক কিলোমিটারের মাইলস্টোন ছুঁতো।
দূরত্বের ব্যাকরনে কিলোমিটার আর মাইল দুটি ভিন্ন একক। বুর্জ খলিফা অবশ্য মাইল এককে আধা মাইল পেরিয়েছে। অর্থাৎ এর উচ্চতা আধা মাইলের একটু বেশি। কিলোমিটার হিসাবে পূর্ণ সংখ্যা হয়নি। ৮৩০ মিটারে থেমে গেছে। কিন্তু থামলেও তালগাছের মতো সব গাছ ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দুবাই শহরের তাবৎ বিল্ডিংএর মাথার উপর দিয়ে পারস্য উপসাগরে তাকিয়ে আছে বুর্জ খালিফা।
তালগাছের সাথে বুর্জ খালিফার উপমা টানাটা হাস্যকর। কেনোনা উচ্চতা বিচারে দুজনের পার্থক্য বিয়াল্লিশ গুণ ছোটোবড়ো। তাছাড়া সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিবেচনায় তালগাছ একক ফ্রি স্ট্যান্ডিং স্ট্রাকচার। আর বুর্জ খালিফা বান্ডেল টিউব স্ট্রাকচার। ভিন্ন উচ্চতার কয়েকটি টিউব একত্রে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি করেছে বর্তমান বিশ্বের উচ্চতম ভবন। একত্রিত করা বান্ডেল টিউব পদ্ধতিতে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন আবিষ্কার করেছিলেন একজন বাঙালি প্রকৌশলী। এই মহান বাঙালী প্রকৌশলী স্কাইস্ক্রাপার ভবন তৈরীর জনক হিসাবে বিশ্বস্বীকৃতি পেলেও খোদ বাঙালি মহলে তিনি কতোটুকু পরিচিত? কতোজন জানি যে বুর্জ খালিফা নির্মাণে তাঁর মরণোত্তর ভূমিকা রয়েছে?
বুর্জ খালিফা নির্মাণ শুরু হয় ২০০৪ সালে। কিংবদন্তী প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮২ সালে। সুতরাং জনসাধারণের পক্ষে কিছুতেই মেলানো সম্ভব নয় বুর্জ খালিফা নির্মাণে এফ আর খানের অবদান কোথায়? উত্তরটা খুব সহজ। তবে বোধগম্যতা বেশ জটিল। পুরো ভবনটিই এফ আর খানের অবদানের উপর নির্মিত। তাঁরই উদ্ভাবিত বান্ডেল টিউব সিস্টেমে ভবনটি নির্মিত। বিশ্বের সুউচ্চ ভবনের বেশিরভাই এ পদ্ধতিতে নির্মিত।
টিউবুলার সিস্টেমের জনক তিনি। মূলধারার স্থপতি নন। মূলত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বিশেষায়িত বিষয় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং। স্থপতিগণ ভবন ডিজাইনের আগে এর কাল্পনিক স্ট্রাকচারাল কাঠামো চিন্তা করেন। কল্পিত কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে ডিজাইনপূর্ব পরামোর্স করেন। সেকারণে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের স্থাপত্য বিষয়ে বেশ ভালো জ্ঞান থাকা জরুরি। এফআর খানের ক্ষেত্রে সেই জ্ঞান অনেক প্রতিষ্ঠিত স্থপতির চেয়েও বেশি ছিল। তাঁকে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থপতি হিসাবেও স্বীকৃতি প্রদান করে।
ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলার শ্রেষ্ঠ দুটি প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি পড়াশুনা করেন। পশ্চিম বাংলার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং সাইন্স এন্ড টেকনোলজি) এবং পূর্ব বাংলার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। শিবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াটা প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন। এরিমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা দেশ হিসাবে স্বাধীনতা পায়। ঢাকা থেকে কোলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়া ছাত্রটিকে ফিরে আসতে হয় নিজ শহরে। নিজ দেশে। শেষ পর্যন্ত প্রকৌশল ডিগ্রি নেন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।
ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান ১৯৫২ সালে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, আরবানা-শ্যাম্পেন ক্যাম্পাসে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। তিন বছরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএর দুটি বিশেষায়িত বিভাগে তিনি মাস্টার্স করেন। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং থিওরেটিক্যাল এন্ড এপ্লাইড মেকানিক্স। পরে পিএইচডি গবেষণা করেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ।
মাস্টার্সের পরই চাকরি পেয়ে যান শিকাগো’র একটি আর্কিটেকচারাল ফার্ম স্কিডমোর, ওয়িংস এন্ড মেরিলে। সংক্ষেপে এসওএম। শুনতে অবাক মনে হলেও বুর্জ খালিফার সাথে যোগসূত্র এখানেই হয়েছিলো। যদিও বুর্জ খালিফার নামগন্ধও তখন ছিলোনা। কিন্তু এই স্কিডমোর, ওয়িংস এন্ড মেরিল আর্কিটেকচারাল ফার্মই পরবর্ত্তীতে বুর্জ খালিফা ডিজাইন করে। ১৯৬৬ সালে প্রকৌশলী এফ আর খান এ প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হন।
বুর্জ খালিফার প্রধান স্থপতি এড্রিয়ান স্মিথ এফ আর খানের ফার্ম স্কিডমোর, ওয়িংস এন্ড মেরিলে চাকুরী নেন ১৯৬৭ সালে। অর্থাৎ এফ আর খানের মালিকানা গ্রহণের পর। একসঙ্গে কেটেছে অনেকটা সময়। এফ আর খানের মৃত্যুর বছর দুই আগে ১৯৮০ সালে এড্রিয়ান স্মিথ এসওএম ফার্মের ডিজাইন পার্টনার হন। অবশ্য ২০০৩ সালে তিনি পার্টনারশিপ ছেড়ে দেন। ততোদিনে বুর্জ খালিফার ডিজাইন পর্ব প্রায় শেষ।
বুর্জ খালিফার আর্কিটেকচারাল এন্ড স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ২০০৩ কিংবা ২০০৪ সালে নির্মাণ শুরুর আগে শেষ হলেও ভবন পরিকল্পনা গৃহীত হয় অনেক আগে থেকে। আশির দশকে দুবাইয়ের উন্নতির চাকা যখন সামনের দিকে ঘুরতে শুরু করে, তখন থেকেই দুবাই সুউচ্চ ভবনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নব্বুই দশকে দুবাই তেল ভিত্তিক অর্থনীতিকে সার্ভিস এবং টুরিজম ভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়। এই উদ্যোগের একটি বিশেষ অংশ ছিলো বিশ্বের উচ্চতম দালান নির্মাণ। বুর্জ খালিফা নির্মাণ করে দুবাই সে গৌরব অর্জন করেছে।

ব্রামটন, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent