
ছয় দশমিক এক পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এবার কেবল শক্ত কাঁধে ভার বহনের পালা। কদিন বাদেই দুরুম দুরুম করে ছুটবে বাস ট্রেন ট্রাক লরী। বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আর হাজারো নির্মাণ কর্মী সেতুর কাজ শেষ করতে দিবারাত্রী পরিশ্রম করে চলছেন। পদ্মা সেতুর নির্মাণ শেষ হলে অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ আরেকটি মাইলফলক অতিক্রম করবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলো একটি দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক উন্নয়নের মতো অদৃশ্য উন্নয়ন না থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি আঙ্গুল দিয়ে দেখাবার প্রয়োজন হয়না। উন্নত অবকাঠামোর জন্য ইউএই, কাতার, সৌদি আরব পশ্চিমাদের কাছে ঈর্ষার কারণ হচ্ছে।
বিশাল ভূসম্পত্তি, খনিজ সম্পদ এবং বিশ্বের সর্বাধিক মিঠাপানির মালিক কানাডা। সম্পদ রক্ষায় কানাডার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট পর্যাপ্ত নয়। ট্রান্সকানাডা হাইওয়ে থাকলেও অসংখ্য পণ্যবাহী ট্রাক যুক্তরাষ্ট্রের রুট ধরে মন্ট্রিয়ল থেকে ক্যালগ্যারি যায়। কিংবা প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া যায়।
প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড প্রদেশকে কানাডিয়ানরা সংক্ষেপে পিইআই বলে। মাত্র সিকি শতক আগেও পিইআই কানাডার মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। সেন্ট লরেন্স উপসাগরে অবস্থিত দ্বীপটি নর্থাম্বারল্যান্ড প্রণালী দিয়ে মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। উড়োজাহাজ আর ফেরী চলাচল ছিলো যোগাযোগের মাধ্যম। শীতকালে এ প্রণালী বরফে আচ্ছাদিত থাকে। বরফ কাটা বিশেষ ধরণের ফেরী ছাড়া অন্য ফেরী চলাচল সম্ভব নয়।
ইউরোপ থেকে তুলনামূলক নিকটবর্তী হওয়ায় এই দ্বীপে অভিবাসী মানুষের আগমন বেশ আগেই। ১৮৭৩ সালে এখানকার জনগণ সপ্তম প্রদেশ হিসাবে কানাডায় যুক্ত হয়। এর দুবছর আগে ১৮৭১ সালে এঁরা নিজস্ব রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। উন্নত সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। সড়ক পথের দৈর্ঘ্য হিসেব করলে প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড কানাডার সর্বোচ্চ ঘন সড়ক ব্যবস্থার প্রদেশ। অর্থাৎ মোট ভূমির আয়তনের তুলনায় রাস্তার পরিমান সবচে বেশী এই প্রদেশে।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সমৃদ্ধ এমন একটি প্রদেশ মূল দেশ থেকে আলাদা থেকেছে বহুকাল। অবশেষে ১৯৯৭ সালে নর্থাম্বারল্যান্ডার প্রণালীর উপর ব্রীজ নির্মিত হলে এটি সারাদেশের সাথে ভূতলে যুক্ত হয়।
ভৌগোলিক সংজ্ঞায় প্রণালী কোনো নদী নয়। নদীর উৎপত্তি হয় ঝরণা বা হ্রদ থেকে। কিংবা বৃষ্টিস্নাত বা বরফ গলা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট অসংখ্য খাদের জলস্রোতে। নদী শেষতক সমর্পিত হয় সাগরে। কিন্তু প্রণালী এক সাগর থেকে যায় অন্য সাগরে। কিংবা একই সাগরের এক অংশের সাথে অন্য অংশকে যুক্ত করে। পূর্ব পশ্চিম প্রবাহিত নর্থাম্বারল্যান্ড প্রণালী সেন্ট লরেন্স উপসাগরের এক অংশকে অন্য অংশে যুক্ত করেছে। প্রণালীর উত্তরে প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড, দক্ষিণে নোভাস্কোশিয়া এবং নিউ ব্রান্সউইক প্রদেশ। মোদ্দা কথায় নর্থাম্বারল্যান্ড প্রণালী একটি উপসাগরের অংশ। সেন্ট লরেন্স উপসাগরের অংশ।
আবার সেন্ট লরেন্স উপসাগর সরাসরি যুক্ত ল্যাব্রাডর সাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরে। দুই সাগর মহাসাগর জলের প্রতাপে ত্রস্ত নর্থাম্বারল্যান্ড প্রণালী। মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো রয়েছে বরফের উপস্থিতি। শীতকালে এই প্রণালীর পৃষ্ঠতলের কয়েক ফুট জল সম্পূর্ণ শক্ত বরফ হয়ে যায়। সুতরাং সহজেই অনুমেয় এমন জলরাশিতে সেতু নির্মাণ কতোখানি চ্যালেঞ্জিং! কানাডিয়ানরা সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছে।
আইল্যান্ডকে মেইনল্যান্ডের সাথে যুক্ত করতে তোড়জোড় শুরু হয়েছিলো ১৮৭০ সালে। পরিকল্পনা ছিলো কোনো টানেলের মাধ্যমে কানাডার মূল ভূমির সাথে একে সংযুক্ত করা। তাহলে ট্রেন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা যাবে। তবে অপর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় টানেলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের প্রস্তাব হয়। স্থান নির্বাচন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়। ব্রীজের প্রস্তাব কার্যকরীভাবে সামনে আসে ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালে যে’কয়টি ফেডারেল নির্বাচন হয়েছে সেগুলোর প্রচারণা কালে।
তবে রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক চিন্তায় কয়েকবার ধাক্কা খায় ব্রীজ প্রকল্প। ফেরী এবং স্টীমার (স্টীমশিপ) শিল্পে সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ব্রীজ নির্মাণে। কেননা বিলাসহুল তারকা মানের স্টীমার ক্রয়ে হাজার মিলিয়ন ডলার পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়েছিলো। বিনিয়োগকৃত বিপুল অর্থের বিশাল লোকসানের দায় নেবে কে?
শেষ পর্যন্ত আশির দশকের মাঝামাঝি ব্রীজের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। প্রস্তাবের পর দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষা শেষ হলে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে স্ট্রেইট (Strait) ক্রসিং ডেভেলপমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রকৌশল ডিজাইন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং নির্মাণের সার্বিক দায়িত্ত্ব প্রদান করা হয়। যে স্থানে ব্রীজ নির্মাণ চূড়ান্ত করা হয়, সে স্থানে কেবল মূল ব্রীজের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১২.৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ ১০০ মিটার কম ১৩ কিলোমিটার।
ব্রীজ ডিজাইনের পালা এবার। পানির গতি প্রকৃতি, নদী গর্ভস্থ ভূমির ধারণ ক্ষমতা, প্রতিদিনের ট্রাফিক ভলিউম, যানবাহনের হুইল লোড ইত্যাদি বিচারে কোন ধরণের ব্রীজ কম মূল্যে অধিক টেকসই করে বানানো যাবে, তার দায়িত্ত্ব দেয়া হলো বিখ্যাত ব্রীজ ইঞ্জিনিয়ার জাঁ মুলারকে। প্রকৌশলী জাঁ মুলার ফরাসি, তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৌশল পরামর্শক হিসাবে কাজ করেন। বাকী জীবন সেখানেই থিতু হন। যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য ব্রীজ ডিজাইন করেছেন তিনি। ব্রীজ ডিজাইন নিয়ে তাঁর ব্যাপক গবেষণা রয়েছে। তাঁর উদ্ভাবিত ম্যাচ-কাস্টিং পদ্ধতিতে এপোক্সি ব্যবহার করে প্রি-কাস্ট কংক্রিটের ড্ৰাই জয়েন্ট অনেক শক্তভাবে করা যায়।
বিশ্বের প্রায় সকল বৃহৎ সেতুই প্রি-কাস্ট কংক্রিট দিয়ে করা। প্রি-কাস্ট কংক্রিট হলো যে “কংক্রিট স্ট্রাকচার” অন্য কোথাও থেকে ঢালাই করে কাজের জায়গায় আনা হয়। অর্থাৎ মূল স্ট্রাকচারের জায়গায় দাঁড়িয়ে ঢালাই প্রয়োজন নাই। এ ক্ষেত্রে ঢালাইকৃত বীম, স্ল্যাব কিংবা গার্ডার সম্পূর্ণ শুষ্ক ও শক্ত অবস্থায় স্থাপনার মূল জায়গায় স্থায়ীভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। অতপর পাশাপাশি দুটো বীম, স্ল্যাব বা গার্ডার প্রয়োজন মাফিক জোড়া লাগানো হয় নাট বল্টু দিয়ে। এই বোল্ট যখন কংক্রিটে প্রবেশ করানো হয় তখন এপোক্সি ব্যবহার করা হয়। এতে জয়েন্ট অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। একত্রে পুরো অংশ ঢালাই করলে যেমন শক্তিশালী হতো, ঠিক তেমনি শক্তিশালী হয় জোড়া লাগানো কংক্রিট।
মেধাবী সেতু প্রকৌশলী জাঁ মুলার তাঁর বিশেষত্ত্ব অনুযায়ী মাল্টি স্প্যান ব্যালেন্সড ক্যান্টিলিভার পদ্ধতিতে ব্রীজ ডিজাইন করেন, যা নির্মিত হবে পোস্ট টেনশনড প্রি-কাস্ট কংক্রিট বক্স গার্ডার দিয়ে। অর্থাৎ প্রতিটি গার্ডার কংক্রিট বক্সের মতো হবে। একটির সাথে আরেকটি জোড়া লাগিয়ে লাগিয়ে ১৩ কিলোমিটার লম্বা ব্রীজ তৈরী হবে। আমাদের যমুনা নদীতেও ৪.৮ কিলোমিটার ব্রীজ করার সময় পোস্ট-টেনশনড প্রি-কাস্ট কংক্রীট বক্স গার্ডার ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের সাথে মূলভূমি কানাডার সংযোগ ব্রীজে পিয়ার বা খাম্বা আছে ৬২ টি। এর ভেতর প্রধান ৪৪ টি পিয়ার ২৫০ মিটার পরপর অবস্থিত। জলের উপরিভাগ থেকে ব্রীজের উচ্চতা ৪০ থেকে ৬০ মিটার। ১৩ কিলোমিটার ব্রীজটির প্রশস্ততা ১১ মিটার।
১৯৯৩ সালের অক্টোবরে জাঁ মুলারের ডিজাইন অনুযায়ী কন্ট্রাক্টর নির্মাণ কাজ শুরু করে। স্ট্রেইট ক্রসিং ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী নিজেদের কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে নির্মাণ কাজে আরও দুটি কোম্পানির সাথে জয়েন্ট ভেনচার করে। এরা হলো নেদারল্যান্ডের ব্যালাস্ট নেদাম জিটিএমআই এবং কানাডার নর্দার্ন কনস্ট্রাকশন।
ব্রীজের বিভিন্ন উপাদান নিকটস্থ ভূমির উপর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড বানিয়ে সেখানে প্রি-কাস্ট নির্মাণ করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো ক্রেন দিয়ে সরিয়ে ব্রীজের সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়। স্ট্রেইট (Strait) অর্থাৎ প্রণালীর অভ্যন্তরে বিশাল জাহাজ রেখে তার উপর ক্রেন বসানো হয়। প্রি-কাস্ট কংক্রিটের জন্য ডিউরেবল হাই গ্রেড কংক্রিট এবং রিইনফোর্সড রড ব্যবহার করা হয়। পিয়ার বা খাম্বার ভিত্তি, আইস শিল্ড, প্রধান স্প্যান, ড্রপ-ইন স্প্যান সবই তৈরি করা হয় প্রি-কাস্ট কংক্রিট দিয়ে।
৫ হাজার কর্মী যাঁদের ভেতর রয়েছেন সাধারণ শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ কারিগর, সার্ভেয়র, নির্মাণ ব্যবস্থাপক এবং প্রকৌশলী, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ততদিনে খরচ হয়ে যায় পুরো ১ বিলিয়ন ডলার।
আগে থেকে ব্রীজের নাম দেয়া ছিলোনা। প্রকল্প চলাকালীন এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। ফেডারেল সরকার ১৯৯৬ সালের মে’ মাসে প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের প্রিমিয়ার আলেক্স ক্যাম্বেলকে চেয়ারম্যান করে একটি নাম নির্ধারণ কমিটি করে। ১০টি প্রদেশ আর ৩টি টেরিটরি নিয়ে নিখিল কানাডা। সবগুলো প্রদেশ ভূমিদ্বারা একে অন্যের সাথে যুক্ত। বিযুক্ত কেবল আদি অভিবাসনের ঐতিহ্যবাহি ভূমি প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড।
কানাডা নামক বিশাল ফেডারেল সাম্রাজ্যের বিচ্ছিন্ন দ্বীপটি মূলভূমির কনফেডারেশনে যুক্ত হয় ১৩ কিলোমিটারের আসমুদ্র ব্রীজ দিয়ে। তাই ব্রীজের নাম দেয়া হয় কনফেডারেশন ব্রীজ। কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। তোলার কিছু আছে কি?
ব্রামটন, অন্টারিও, কানাডা
