
১
বিদেশ জীবনটা কেমন? বিদেশে আমরা কেমন আছি? যারা দেশে থাকেন তাদের বিদেশ সম্পর্কে অনেক কৌতুহল আছে। বলে রাখি বিদেশে বেড়াতে যাওয়া আর স্থায়ীভাবে থাকা সম্পূর্ণ আলাদা। কানাডা আসার আগেও আমি বেশ কয়েকবার বিদেশে গিয়েছি। প্রথমবার যখন আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে যাই তখন মনে হয়েছিল এরচেয়ে সুখ আর নাই। কি চমৎকার ঝকঝকে রাস্তাঘাট, বড় বড় হাইওয়ে, হাজার হাজার গাড়ি, বড় বড় বিল্ডিং, ফাষ্টফুডের দোকানে বড় বড় বার্গার, একজনে খেয়ে শেষ করা যায় না। রেষ্টুরেন্টে খাবার অর্ডার দিলে প্লেট উপচে খাবার আসে। কফির সাইজ দেখে মাথা নষ্ট হয়ে যায়। ম্যাকডোনালসে একবার পে করে বারবার রিফিল করা যায় কোক, স্প্রাইট, ফান্টা। দোকানপাটে থরে থরে জিনিস সাজানো। রাস্তায় সবাই নিয়ম মানে, কোনো ট্রাফিক পুলিশ নাই, দুই চার টাকা ঘুষ খাওয়া নাই, দোকানপাটে সবাই লাইন দিয়ে কেনা কাটা করে, আজব সব কান্ড! সবকিছু নিয়মে বন্দী। সুন্দর সুন্দর নারী পুরুষ খিল খিল করে হাসতে হাসতে রাস্তা দিয়ে যায়। বাসে, সাবওয়েতে বই পড়ে, কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে মাথা দুলিয়ে গান শোনে, নাভীর নিচে জীন্স পড়ে, প্রেমিক প্রেমিকারা পরষ্পরকে আলিঙ্গন করে, চুমু খায়। বুকের মধ্যে হু হু করে উঠে আমার। আহা কত সুখী এরা! সব আছে এদের। কি নাই এই হতাশায় অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে। এসব দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম আমিও বিদেশে যাব।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। ২০০৩ সালে ইমিগ্রেশন নিয়ে স্থায়ীভাবে কানাডা চলে আসলাম। এর আগে ২০০০ সালে একবার আমেরিকা এসেছিলাম বেড়াতে। তখন আমেরিকা অংশ থেকে নায়াগ্রা ফলস এসেছিলাম। ওপারেই কানাডা। তখনই মনটা হু হু করে উঠেছিল। নিজেকে বলে রেখেছিলাম একদিন আমি ঠিক ঠিক ওপার থেকেও নায়াগ্রা ফলস দেখব। যদিও কানাডা সম্পর্কে আগে থেকে কিছুই জানতাম না। কোনো গবেষনাও করিনি। আমেরিকার উপরে অনেক বই পড়েছি। ভ্রমন কাহিনী পড়েছি। কিন্তু কানাডা সম্পর্কে ছিলাম অজ্ঞ। শুধু জানতাম কানাডা ঠান্ডার দেশ, আট মাস ঠান্ডা থাকে, হাঁটু সমান বরফ পড়ে। তবে খুবই শান্তির দেশ, মানবাধিকার আছে, চিকিৎসা পদ্ধতি ভাল, পড়াশুনাও বিশ্বমানের এবং টাকার ছড়াছড়ি। একবার পা রাখতে পারলে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাব। পায়ের উপর পা ফেলে খাব। ঢাকার ইমিগ্রেশন এজন্সিগুলো তেমন ধারানাই দিয়ে থাকে অবশ্য।
২
কানাডা এসে বুঝলাম আমি যা ভেবেছি মোটেও তা না। জীবন এতো সহজ না। প্রতিমুহূর্তে রয়েছে লড়াই। অনন্ত লড়াই। সবাই ছুটছে। কাজ, কাজ আর কাজ। কাজ ছাড়া কোনো গতি নাই। স্বাচ্ছন্দ নাই, সমাজে মূল্য নাই। কাজ ছাড়া কোনো ভবিষ্যত নাই। বিশেষকরে যারা ফ্যামিলি নিয়ে আসে তাদের জন্য বিদেশ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জটা নিলাম আমি। আমার সারা জীবনই একটা চ্যালেঞ্জ। বরিশাল থেকে ঢাকা আসা, ঢাকা থেকে টরন্টো। সবটাই এক লড়াই। টিকে থাকার লড়াই।
বিদেশে যারা থাকে তারা সবই করে। চাকরি করে, ঘরের কাজ করে, লন্ড্রি করে, বাজার করে, কাপড় ইস্ত্রি করে, বিউটি পার্লারে যায়, রান্না করে. দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায়, অনুষ্ঠানাদি করে, কবিতা লেখে, উপন্যাস লেখে, নাচ করে, গান করে, শহিদ মিনারে ফুল দেয়, ঘটা করে বিয়ের অনুঠান করে, রোজা রাখে, তারাবি পড়ে, পূজো মন্ডপে পূজো করে, ঈদের জামাত হয়, ইফতার পার্টি করে, বেড়াতে যায়, টিভি করে, পত্রিকা প্রকাশ করে।
দেশ থেকে মেহমানরা আসলে তাদের নিয়ে ঘোরে, দাওয়াত খাওয়ায়, গিফট দেয়। দেশে যখন যায় তখন উইথাউট পে ছুটি নেয়, বাক্সভরে আত্মীয় স্বজনের জন্য গিফট নিয়ে যায়। আত্মীয় স্বজনের দাবী একটাই বিদেশ থেকে কি নিয়ে আসল। তারা ব্যাক্তির দিকে তাকায় না, বাক্সের দিকে তাকায়। কিন্তু যতই আপনি করেন না কেনো কাউকেই খুশী করতে পারবেন না। আপনার প্রতি কারো কোনো মমতা নাই। মানুষকে খুশী করা অনেক কঠিন কাজ। মনে করে বিদেশে যারা থাকে তাদেরই দ্বায়িত্ব দেওয়ার। এটাই যেনো নিয়ম। অবশেষে খালি বাক্স আর বিষন্ন মন নিয়ে ফেরত আসবেন। বছর ঘুরলেই আবার দেশে যাওয়ার জন্য মন আনচান করবে আপনার। আমার ক্ষেত্রে তাই হয়। যারা একদমই দেশে যায় না তারাই প্রকৃতপক্ষে সুখী।
৩
প্রসঙ্গ ফরেন স্টুডেন্টঃ
যারা বিদেশে পড়তে আসে তাদের কথা একটু বলি। কানাডায় যারা পড়তে আসে তাদের অবস্থা বেশ কঠিন। যাদের কেউ নেই তারা শুৱুতে একটা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে। একটা নতুন দেশে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা বিরাট বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ভাষা, নতুন কালচার, নতুন একসেন্ট, নতুন সিস্টেম। আঠারো উনিশ বছরের একটা ছেলে বা মেয়ে যে কিনা বাবা মায়ের আদরে ছিল, কিছুই করেনি ঘরে, বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো ধারানাই নাই তারা একটা অথৈ সুমদ্রে পড়ে। যাদের কেউ নাই তাদের ডর্মে বা বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়। আগে থেকেই বাসা ভাড়া করে আসতে হয়। তাঁকে পড়াশুনা ও ক্লাস করার পাশাপাশি বাজার করতে হয়, রান্না করতে হয়, কাপড় লন্ড্রি করতে হয়। ঘর ক্লিন করা, বাথরুম ক্লিন করা, হাড়ি পাতিল ধোওয়া থেকে ঘাস কাটা সবই করতে হয়। বাবা মায়ের কাছে যখন ছিল ছুটিৱ দিনে দুপুর বারোটায় ঘুমে থেকে উঠেছে, সারা রাত জেগে মুভি দেখেছে। বিদেশে সেটা সম্ভব হয় না।
যারা কানাডায় জন্ম নেয় বা বড় হয় তারা বাস্তবতা শিখে ফেলে ছোট থাকতেই। স্কুল থেকে শেখানো হয়। আমার ছেলে মেয়ে হাই স্কুল থাকতেই কাজ শুরু করে। কাজ করাটা এদেশে এডুকেশনের পার্ট। নিজেদের খরচ নিজেরাই চালাত ওরা। তখন থেকেই ওরা নিজেদের মতো চলতে শিখে ফেলেছে। অর্ক অরিত্রি দুজনই ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর সেন্ট জর্জ ক্যাম্পাসে পড়ত। পুরো শিক্ষা জীবনই তারা জব করেছে, একদিনও বিরতি দেয়নি, আমার উপর চাপ তৈরি করেনি। আমিও ওদের স্বাধীনতা দিয়েছি। ওদের জন্য সব করেছি আবার বাস্তবতাও শিখিয়েছি। অর্ক বা অরিত্রি যখন স্কুলে পড়ত, বরফের মধ্যে কোনোদিন বলেনি বাবা, গাড়িতে স্কুলে নামিয়ে দাও। হেঁটে স্কুলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেই যে যার মতো ফুলটাইম চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। এখন তারা নিজেদের সংসার করছে, গাড়ি বাড়ি করেছে, ক্যারিয়ার করছে।
কিন্তু যারা বাইরে থেকে পড়তে আসে তাদের লড়াইটা ভিন্ন। তাদের অবস্থা আমি অনুধাবন করি। তাদের অনেকের সাথেই আমার কথা হয়। বিশেষকৱে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এখানে এসে অমানবিক কষ্ট করে। দিনের পর দিন রেষ্টুরেন্ট খায়, কালে ভদ্রে ঘরে রান্না করার সুযোগ পায়। একটা আইটেম করে। কাপড় লন্ড্রি করার সময় পর্যন্ত পায় না, সাজ সজ্জা করার সময় নাই, ওয়াশরুমে এক ঘন্টা পার করার সময় নাই। মেস করে যারা থাকে তাদের ওয়াশরুমের টাইম রেশন করা থাকে, লিপস্টিক মাখার সময় নাই, রুপচর্চা কৱাৱ সময় নাই। অড জব করে চলতে হয়, ৱাত দুইটায় কাজ শেষে ঘৱে ফিৱতে হয় বাসে, যাদেৱ গাড়ি আছে তাদেৱ ইন্সুরেন্স দিতে হয়, ফোনের বিল দিতে হয়। ওদের কষ্ট দেখে আমার চোখে পানি এসে যায়। তারপর একদিন তারা প্রতিষ্ঠিত হয়। কষ্টের অবশান ঘটে।
৪
আমি আর জেসমিন আজও লড়াই করছি। জেসমিন এমনই একটা মেয়ে যার কোনো কিছু নিয়ে কোনো অভিযোগ নাই, বিৱাট চাহিদা নাই। সে যথেষ্ট সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও আমার সাথে জড়িয়ে এক অনন্ত লড়াইয়ে অবতীর্ন হয়েছে। দেশে যেমন তেমনি বিদেশে এসেও সে লড়াই থামেনি। আমরা শূন্য থেকে সংসার শুরু করেছিলাম। আমাদের জন্য কেউ কিছু করে দেয়নি। তারপর থেকে এতোদূর পথ পারি দিয়েছি। জেসমিন পাশে ছিল বলেই আমি টিকে গেছি, লেখালেখিটা নির্বিঘ্নে করতে পারছি। ঘুরে বেড়াতে পারছি, দেশ বিদেশে যেতে পারছি। সে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কোনোদিন টাকা পয়সা নিয়ে কথা বলেনি। এমনকি আমাদের জয়েন্ট একাউন্ট হলেও সে ব্যাংকের হিসাব রাখে না। ব্যালেন্স শীট দেখে না। যদি দেখত তাহলে আমি এতো অপচয় করতে পারতাম না, সাহায্য করতে পারতাম না। গাড়ি, বাড়ি, সম্পদ নিয়ে সে কখনও মাথা ঘামায়নি। তার মধ্যে কখনও কোনো অহংকার দেখিনি।
আমরা দুজনেই মানুষের জন্য করার চেষ্টা করি। অপেক্ষাকৃত কম ভাগ্যবানদেৱ জন্য করি।আত্মীয়দেৱ জন্য কৱি। বিনিময়ে কারো কাছে কিছু চাই না। আমরা যাই করি মানবিক কারনে করি, দ্বায়িত্ববোধ আর এক ধরণের মাইন্ড সেট থেকে করি। আমাদের কারো কাছে কোনো অবলিগেশন নাই। কারো কাছে মাথা নত করে চলি না আমরা। টাকা দিয়ে আমাদের কেনা যায় না। মানবিক হওয়াই বড় ধর্ম বলে মনে কৱি। আমার সন্তানদের আমি তাই শিখিয়েছি। মানবিক হতে শিখিয়েছি।
টরন্টো, অন্টারিও, কানাডা
- Advertisement -
