
ওরা আমাকে গুলি করতে পায়নি, চায়ওনি!
তবু আমি পালিয়ে ছিলাম।
কথাগুলো বলে সুবোধ কুমার দাস হাঁপাতে লাগল। যেন কত বড় কাজ করে ফেলেছে। ধীরে ধীরে কয়েক বিন্দু সময় গেলে বুঝতে পারল সে ভুল করে ফেলেছে। তার বলার কথা ছিল ওরা আমাকে ধরে ফেলেছিল। আমি ওদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে পালাচ্ছিলাম। ওরা গুলি করেছিল। লাগেনি, বেঁচে গেছি। এ কী করল সুবোধ!
নিজের ওপরই রেগে উঠল। তার আইনজীবী বাসানিও রয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান আইনজীবী। বারবার তাকে বলেছেন, তোমার এ দেশে থাকার জন্য যে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছ, যে কেস চলছে; তোমাকে কানাডিয়ান সরকার তা দেবে কি-না সেটা নির্ভর করছে তিন ব্যক্তির ওপরÑ বিচারক লরেন্স ক্লার্কসন, আমি আইনজীবী বাসানিও এবং তুমি সুবোধ কুমার দাস। তিনজনের মধ্যে কেসটা জিততে সবকিছু নির্ভর করে। তোমার নিজের ওপর করে সবচেয়ে বেশি।
স্যার, তা কেন?
তোমার বলা প্রত্যেকটি কথা কতটা সত্যি তা নির্ভর করে তোমারই বলার ওপর। তোমার গল্পের ব্যাপারে কতটা জজ লরেন্স ক্লার্কসনকে বিশ^াসযোগ্যতার দিকে ঠেলে দিতে পার তা তোমার গুণগত ব্যাপার!
স্যার! স্যার! আমি জীবনে কোর্টে কখনও দাঁড়াইনি। খুব ভয় লাগে।
আইনজীবী বাসানিও শুধু কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন নিয়ে কাজ করেন। তবে তার কাজের মধ্যে এ দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের কেসই বেশি থাকে। অনেক কেসেই তিনি জিতিয়ে দিয়েছেন তার ক্লায়েন্টকে। তাই নাম ছড়িয়েছে বেশ। মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে ওঠেন। তখনই বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভ্যাকেশনে কানাডার বাইরে বেড়াতে যান। ক’টা দিন সবকিছু থেকে দূরে থেকে মাথা ঠান্ডা হয়।
আসলে তার রাগ হয় বাংলাদেশি ক্লায়েন্টদের ওপর। পইপই করে সব বুঝিয়ে দিলেও বলেÑ সীতা কার বাপ? এক একজন মাস্টার্স করা ছেলে-মেয়ে। অথচ মনে হয়, স্কুলের সাত-আট ক্লাসের বিদ্যাবুদ্ধি। দেশের এডুকেশন অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, মায়া হয় তার! ভাগ্য ভালো তার নেটিভ দেশ ভারতের অবস্থা কিছুটা ভালো। তবে বেশির ভাগ আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর আফ্রিকান কান্ট্রি থেকে আসা। তিনি শুধু সাউথ এশিয়ান প্রার্থীদের কেস করেন।
এই যে সুবোধ ছেলেটির সঙ্গে তার তিনবার বৈঠক হয়েছে। সাধারণত এক কিংবা দুইবারের বেশি তিনি বসেন না!
এত করে বোঝানোর পরও সে কী বলল! আরে বাবা, ওরা তোমাকে মারতে চায়নি, গুলিও করতে চায়নি; তাহলে তুমি পালালে কেন? একটা হাবার মাথায়ও তো এটুকু বুদ্ধি খেলে, একমাত্র প্রাণের ওপর হামলা হলে তবেই কানাডা বিবেচনা করে ঠাঁই দেবে কি-না!
যদিও তিনিও জানেন শতকরা আটানব্বই ভাগ কেস ভুয়া। বাঙালি হিন্দু খ্রিস্টানদের আশ্রয় পেতে সুবিধা বেশি, ধর্মীয় সহানুভ‚তি কিছুটা তো আছেই। তারপর কানাডার ছোট-বড় সব চার্চ থেকে ফাদারদের সহানুভ‚তিসহ সই করা কাগজও অনেকটা এগিয়ে রাখে। তারপরই হিন্দু সম্প্রদায়ের সুবিধা। বাসানিও তো বাংলাদেশের হিন্দু ক্লায়েন্ট পেলেই ভাবে, কেস জেতা হয়ে গেছে। বউয়ের ওপর রেপ অ্যাটেম, বার কয়েক মুসলিম মৌলবাদীর ধর্ষণচেষ্টা, প্রাণের হুমকি জলের মতো করে দেয় কেসকে। বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হয়ে আসে খুবই কম। বাঙালি মুসলমানদের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশে তারাই মেজরিটি। তাদের তো আর ধর্মীয় হানাহানিতে ফেলা যায় না। তাদের বেলায় তো বলা যায় নাÑ আমি মুসলমান হওয়া সত্তে¡ও মুসলমানরা আমার প্রাণ নিতে চায়! অবশ্য কিছু কাদিয়ানি কিংবা ওহাবি মুসলিম কেস দাঁড় করাতে পারে। তবে ওদের এভাবে এ দেশে আসার সংখ্যা খুবই কম। মুসলিম রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার একটাই পয়েন্টÑ আমি বিরোধী দল করি। সরকার, পুলিশ সবাই আমাকে মারতে হন্যে হয়ে ঘুরছিল। তাই প্রাণ নিয়ে কানাডায় পালিয়ে এসেছি। সরকার আওয়ামী লীগ হলে আশ্রয়প্রার্থী বিএনপি হন। সরকারে বিএনপি থাকতে আশ্রয়প্রার্থী আওয়ামী লীগ। আইনজীবী বাসানিওর ঢাকা, ফেনী, যশোরসহ অনেক শহরের রাস্তাঘাটের ম্যাপ মুখস্থ হয়ে গেছে।
স্কারবোরো, কানাডা
