
পশ্চিমা জগতের কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব স্টিফেন কোভের বিখ্যাত বাতিঘর নীতির গল্পটা হয়তো অনেকেই জানেন, যাঁরা জানেন না তাদের জন্য গল্পটা আবারো বলছি-
গভীর রাত। প্রশান্ত মহাসাগরের অতল জলের উন্মত্ত ঢেউ অগ্রাহ্য করে গন্তব্যের পথে ভেসে চলছে মার্কিন নৌবহর। জাহাজে তাঁর খাস কামরায় কমান্ডার গভীর ঘুমে অচেতন। হঠাৎ করে কমান্ডারের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। সাধারণত এই সময় কমান্ডারকে বিরক্ত করা নিষেধ। স্বভাবতই বিরক্ত বদনে কমান্ডার জিজ্ঞেস করল- কে?
উত্তর এল- আমি সেকেন্ড অফিসার।
-কি হয়েছে? এত রাতে বিরক্ত করছ কেন?
– দুঃখিত কমান্ডার, একটা সমস্যা হয়েছে।
-কি সমস্যা?
-আমাদের নৌবহরের বিপরীত দিক থেকে একটা জাহাজ আসছে। বারবার নির্দেশ দেয়া সত্তে¡ও জাহাজটা সরছে না।
কমান্ডার আরো বিরক্ত হলেন। বললেন- কে এই মূর্খ জোকার?
সেকেন্ড অফিসার বললেন- কমান্ডার এই অবস্থায় আপনার নির্দেশনা দরকার।
কমান্ডার চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এসে বসলেন। ওয়ারলেসে ঘোষণা দিলেন-
-আমি মার্কিন নৌবহরের কমান্ডার ডেভিডসন বলছি। তোমরা আমাদের গতিপথ থেকে দশ ডিগ্রি উত্তরে সরে দাঁড়াও।
প্রতুত্তর এলো- তুমি বরং দশ ডিগ্রি দক্ষিণে গতিপথ পরিবর্তন কর।
কমান্ডার এবার রীতিমত ক্ষেপে গেলেন। বললেন- তুমি বুঝতে পারছো না কার সাথে কথা বলছো। আমার নির্দেশ অমান্য করলে তার পরিণাম হবে সাংঘাতিক।
অপর দিক থেকে উত্তর এলো, আমি তোমাকে চিনি। তুমি শক্তিশালী মার্কিন নৌবহরের কমান্ডার। কিন্তু তুমি আমাকে চিনতে পারোনি। আমি হলাম তোমার বিপদের সতর্কীকরণ বাতিঘর। আমার নির্দেশ অমান্য করলে বরং তোমারই পরিণাম হবে ভয়াবহ।
স্টিফেন কোভের ভাষায় এটি একটি সত্যি কাহিনি। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বাতিঘর নীতির অবতারণা করেন। আমরা মনে করি আমরা আমাদের জীবনধারা পরিচালন করছি। কিন্তু গভীর সত্যি হলো জীবনে কিছু নীতিমালা আছে যা আমাদের নিয়তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাতিঘরের নির্দেশের মতো আমরা যদি সেইসব নীতিমালা অগ্রাহ্য করি তবে আমাদেরকে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বাতিঘর নীতির গল্প অনেকটা ঈশপের গল্পের মতো শোনায়। কিন্তু যতই এর গভীরে যাই ততই এর সারসত্য অনুভব করি।
গত সপ্তাহের পত্রিকার প্রথম পাতায় লিড নিউজ ‘আবারও ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আসছে’। বিষয়টা যেন এরকম যে প্রতিবছরই যে যত পারে কালো টাকা অর্জন করো এবং বছর শেষে দশভাগ কাফ্ফারা দিয়ে সাদা করে নাও। টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না। এটা কি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া আর অনৈতিকতাকে বৈধতা দেয়া নয়?
কথায় বলে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। তবে যে কর্তৃপক্ষ এই ধরনের বিধান দিচ্ছে তারা নিশ্চয়ই বাতিঘর নীতির আওতার বাইরে নয়। কালো টাকার উৎসকে রোধ না করে বরং কাফ্ফারার নামে উৎসাহ দেয়া হলে তাহলে তা হবে প্যানডোরার বাক্সের মত। দুর্নীতির বাক্স যদি বন্ধ না করি তবে প্রতিনিয়তই সরকারকে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। এবং তার পরিণাম হবে আরো মারাত্মক।
প্রথমেই বলে রাখি যে আমি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ নই। তবে খোলা চোখে দেখা কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। এনবিআর বলছে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক। তাহলে ধরে নেয়া যায় সিদ্ধান্তটি এসেছে সরকারের জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসহ কোটি টাকার অধিক ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। আর দশ বছর আগে আর্থাৎ ২০০১ সালে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৫ হাজারের কিছু বেশি। অন্যদিকে যদিও গতবছর ১০ লাখের অধিক নাগরিক বার্ষিক আয়কর বিবরনী বা ট্যাক্স রির্টান জমা দিয়েছেন, তবে প্রকৃতপক্ষে সরকারকে কর প্রদান করেছেন তারও অনেক কম। একজন ব্যক্তির যদি মাসে ২৫ হাজার টাকার অধিক আয় করে, তবে তাকে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হবে। সেই হিসাবে বলা যায় ২৫ হাজার টাকার অধিক আয় করে এমন লোকের সংখ্যা দশ লক্ষ বা তার কিছু বেশি।
অথচ বাজারে বিলাস বহুল গাড়ি বিক্রি হতে সময় লাগে না। জমির দাম বাড়ছে দ্বিগুণ হারে। টিভি, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার বিক্রির বাজার রমরমা। মুদ্রাস্ফিতিও চলছে উর্দ্ধগতিতে। তার মানে সহজ সূত্রে বলা যায় আরো অনেক লোকের কাছে টাকা আছে। কর প্রদানকারী দশ লাখ ব্যক্তির সীমানার বাইরে একটি বড় অংশ যারা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল অথচ তারা কর প্রদান করছে না। তবে সেই সংখ্যা কত এবং সেই অর্থের রং এখন জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ।
যারা হালাল উপার্জন করে সরকারের নির্ধারিত কর দিচ্ছেন তাদেরকে কোনো বিশেষ স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদান করা হচ্ছে না। বরং যারা দুর্নীতি করে টাকা আত্মসাৎ করছে তাদের দশ পার্সেন্ট জরিমানা প্রদান করে টাকা হালাল করার জন্য সুযোগ দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছর যদি রাষ্টীয় ভাবে এই ধরনের সুযোগ দেয়া হয় তা হবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার নামান্তর। তার মানে দাঁড়ায় দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা। কিন্তু এর পরিণতি যে দেশ ও জনগণের জন্য কতটা ভয়াবহ আকার ধারন করেছে ভুক্তভোগী জনগণই তা বলতে পারবেন।
স¤প্রতি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সাইদ বলেছেন দুর্নীতি শব্দের মধ্যে আরেকটি শব্দ লুকিয়ে আছে। শব্দটি হলো “নীতি”। চোর বা ডাকাতের কাজ ঠিক দুর্নীতি নয়। কারণ তাদের কোনো নীতিই নেই। সুতরাং কালো টাকার উৎস না জেনে তাকে যদি ছাড় দেয়া হয় তা হবে চুরি ডাকাতি বা এই ধরনের মারাত্মক অপরাধকে এক অর্থে স্বীকৃতি দেয়া। এই টাকার রং বদল লাভের থেকে ক্ষতি ডেকে আনবে অনেক বেশি।
সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ কখনো গরীব হবার কথা নয়। রাষ্ট্র যন্ত্রের চালিকা শক্তি প্রতিষ্ঠানসমুহের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আজ অধিকাংশ জনগণ দরিদ্র। দুর্নীতিকে নিমূল করা হল শক্তিশালী ব্যবস্থাপনার এক নম্বর শর্ত। একজন নিয়মিত করদাতা হিসাবে সরকারের কাছে আবেদন, সরকার যেন বৃহত্তর জনগনের কল্যাণের কথা বিবেচনায় নিয়ে দুর্নীতি নির্মূলের সঠিক উদ্যোগ গ্রহন করে। তাতে করে সরকারও যেমন অধিক কর অর্জন করবে, জণগণও তার সঠিক অধিকার ও সুফল লাভ করবে।
