জটিল স্থাপনার গল্প

ছবিজুয়েন রজেস

যদি প্রশ্ন করা হয় কানাডার আইকনিক ল্যান্ডমার্ক কি, তাহলে চোখ বন্ধকরে যে কেউ উত্তর দিবে সিএন টাওয়ার। তবে বেশির ভাগ মানুষেরহয়তো জানা নেই সিএন টাওয়ার কেনো নির্মিত হয়েছিলো। সে বেশমজার কাহিনী। বিশ্বে উচ্চতম টাওয়ার বা ভবনের কৃতিত্ত্ব নেয়ার ইচ্ছাকানাডার কখনোই ছিলোনা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে কানাডা শনৈশনৈ উন্নতি লাভ করতে থাকে। সারাদেশে বিপুল নির্মাণ যজ্ঞ শুরু হয়।পাতাল রেল (মেট্রো), হাইওয়ে, বহুতল ভবন মন্ট্রিয়ল, টরন্টো ওভ্যানকুভার নগরীকে বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। মাল পরিবহনেবিশাল কানাডাকে যুক্ত করতে রেল পরিবহন দারুন জনপ্রিয়তা পায়।এই সময় সিএন রেল বা কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেল ডিপার্টমেন্টসারাদেশে ট্রেন চলাচল নিরাপদ করতে সিগন্যাল সিস্টেম উন্নত করারপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ষাট দশকের মাঝামাঝিসিএন রেল ইউনিয়ন স্টেশন এলাকায় বিশাল সিগন্যাল টাওয়ারনির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়। কানাডা ল্যান্ডস কোম্পানিতখন এই জমির মালিক। এদের মালিকাধীনেই সিএন টাওয়ার নির্মাণেরপ্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৬৮ সালে স্থপতি নির্বাচন করা হয়।ডব্লিউ.জেড.এম.এইচ আর্কিটেক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠান এর স্থাপত্যনকশা নির্মাণের দায়িত্ত্ব পায়।

৫৫৩ মিটার বা ১৮১৫ ফুট উচ্চতা নিয়ে সিএন টাওয়ার টরন্টোরস্কাইলাইনের সর্বোচ্চ সীমা রেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফ্রান্সেরআইফেল টাওয়ার, ইংল্যান্ডের বিগ বেন ক্লক টাওয়ার কিংবা অস্ট্রেলিয়ারসিডনি অপেরা হাউজের মতোই কানাডার প্রতিনিধিত্ত্ব করে সিএনটাওয়ার। ২০০৭ সাল পর্যন্ত এটিই ছিলো বিশ্বের উচ্চতম ফ্রি স্ট্যান্ডিংস্ট্রাকচার। ফ্লোর বা তলার হিসাব অনুযায়ী এটি ১৪৭ তলা উচ্চতা বিশিষ্টটাওয়ার। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফাসহ মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে বিশাল উচ্চতারফ্রি স্ট্যান্ডিং স্ট্রাকচার হবার পর সিএন টাওয়ারের অবস্থান এখন নবম। তবে উচ্চতার বিচারেতো স্থাপনার মর্যাদা নির্ধারিত হয়না। হয় রাষ্ট্রেরসাংস্কৃতিক মানদন্ড, ইতিহাস ও ঐতিহ্য দিয়ে। আইফেল টাওয়ার অথবাস্ট্যাচু অব লিবার্টি তাঁর প্রমান। যদিও সবগুলো টাওয়ার ছাপিয়ে সিএনটাওয়ার বিখ্যাত হয়েছে এর নির্মাণ পদ্ধতির কারণে। অত্যন্ত জটিলপ্রক্রিয়া এবং দুই বছরের অধিক সময় ধরে সিএন টাওয়ারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর চেয়েও অধিক সময় লেগেছে এর জটিলইঞ্জিনিয়ারিং নকশা প্রস্তুত করতে। ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭৩সাল পর্যন্ত কেবল বিভিন্ন নকশা তৈরী করা হয়েছে।

- Advertisement -

স্থাপত্যে নকশায় জটিলতা না থাকলেও একক ফ্রি স্ট্যান্ডিং উচ্চতারপ্রকৌশল নকশা (স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং) প্রণয়নে সুকঠিন লগারিদম ব্যবহৃতহয়েছে। সেসময় জটিল ক্যালকুলেশনের জন্য সফটওয়্যার ব্যবহারেরসুযোগ ছিলোনা। মাটির ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করা ছিলো কঠিন। তবুফাউন্ডেশন ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক এলি রোবিনস্কি মাটির অনেক গভীরপর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করে ‘শেল’ ভেদ করে বিশাল উচ্চতার টাওয়ারের একলক্ষ ত্রিশ হাজার টন ওজনের ভার বহন যোগ্য ভিত্তি নির্ধারণ করলেন। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ড. ফ্রাঞ্জ ক্রোল এবং আর.আর. নিকোলেট মিলেকংক্রিটের সর্বমোট ওজন, ভূমিকম্পের মাত্রা, বায়ুচাপ ইত্যাদি সহ সকলরকম লোড হিসাব কষে এর কাঠামো নির্ধারণ করলেন। স্থপতি জন এন্ড্রুএবং রজার ডু টয়েটের স্থাপত্য নকশার কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সিএনটাওয়ারের নির্মাণ নকশা তৈরী করে ফেললেন। কিন্তু স্থপতি এবংপ্রকৌশলীদের চেয়েও দুরূহ কাজটি করতে হলো ঠিকাদারি নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানকে। কেননা এতো উঁচু টাওয়ারে নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছানো বিরাটচ্যালেঞ্জ। সুইডিশ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্ক্যান্সকা তাদের কানাডিয়ানসাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘কানাডা সিমেন্ট কোম্পানি’র মাধ্যমে এরনির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। নির্মাণে হেলিকপ্টার ক্রেন ব্যবহার করা হয়কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল উপরে নেবার জন্য।

নির্মাণ শুরু হয় ফেব্রুয়ারী ৬, ১৯৭৩। শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ৪০মাস। তবে ব্যবহারের জন্য এটি খুলে দেয়া হয় অক্টোবর ১, ১৯৭৬।নির্মাণ ব্যয় মাত্র ৬৩ মিলিয়ন ডলার। আজকের বাজারে মাত্র মনেহলেও তখনকার সময়ের ব্যববহুল প্রকল্প এটি। উচ্চতম  রিভলভিংরেস্টুরেন্ট হিসাবে এটি অনেকদিন বিশ্বের উচ্চতম ছিলো। ১৪৪ তলাডেকের উপর অবস্থিত রেস্টুরেন্টটি প্রতি ৭২ মিনিটে একবার নিজের পূর্ণঅক্ষ অর্থাৎ ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসে। এর উপরের স্কাইপড একসময়বিশ্বের উচ্চতম দাঁড়াবার স্থান ছিলো। সাহসী অভিযানকারী স্কাইপডথেকে প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দেবার দুঃসাহস দেখায়। হাজার হাজার মানুষদাঁড়িয়ে তাঁদের খেলা দেখে। টাওয়ারটি বর্তমানে প্রধান সকল ব্রডকাস্টমিডিয়া (নন স্যাটেলাইট), এএম, এফএম, ডিএবি রেডিও এবং অন্যান্যওয়্যারলেস সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। আর পনেরো লক্ষ ট্যুরিস্টসাগর মহাসাগর পেরিয়ে প্রতি বছর এখানে বেড়াতে আসছে। বোনাসহিসাবে ভুড়িভোজন করার সুযোগ, ৩৬০ দ্য রেস্টুরেন্ট এট দ্য সিএনটাওয়ার।

- Advertisement -

Read More

Recent