
শপিং চ্যানেলের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় প্রথা অনেকটা জনপ্রিয় হলেও এখনো বেশিরভাগ মানুষ শপিং মলেই জিনিসপত্র কিনতে পছন্দ করে বা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। সেই তুলনায় আন্তর্জাল বা অনলাইন এখনো তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি । তবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাংলাদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ৬৬ ভাগ ব্যক্তি ইন্টারনেটে পণ্য বা সেবার খোঁজ খবর নেন এবং ১৫ ভাগ লোক বিশেষত তরুণ সমাজ অনলাইনে কেনাকাটা করেন।
মূলত অনলাইন শপিংয়ের এই বাজার গড়ে উঠেছে গত এক দশকে । তবে মধ্যবিত্তের অধিকাংশ ক্রেডিট কার্ড কিংবা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করেন না। বেশিরভাগ লেনদেন হয় ক্যাশ অন ডেলিভারির মাধ্যমে। আমি নিজেও রকমারি ডট কম থেকে বই কিনি ক্যাশ অন ডেলিভারির মাধ্যমে। প্রথমে অনলাইনে ভার্চুয়াল স্টোরে গিয়ে বই বা পণ্য নির্বাচন করি। তারপর টেলিফোনে অর্ডার দেই এবং তারা পরের দিন বাসায় বা অফিসে পণ্য ডেলিভারি দেয় এবং বিলের টাকা নেয়। অনেকটা হোম সার্ভিসের মত।
ঢাকা শহরের যানজটের কারণে অনলাইন শপিং জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ভবিষ্যতের এই বাজার স¤প্রসারিত হবে বলে আশা করা যায়। রকমারির পাশাপাশি গ্রোসারি শপিং এর ক্ষেত্রে চালডাল ডটকমও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে ক্রেডিট বা ডেবিটকার্ডকে কেনাকাটার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা না গেলে এই বাজারের প্রসার বিঘিœত হবে ।
২০০০ সাল পর্যন্ত কাঁচাবাজার এবং মুদির দোকানই মানুষের গ্রোসারির চাহিদা পূরণ করেছে। আর অন্যান্য পণ্যের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনার মতো বড় শহরে নিউমার্কেট ছিল প্রধান বাজার। ২০০১ সাল থেকে আগোরা, নন্দন, মীনা বাজার, স্বপ্ন এবং অন্যান্য আধুনিক রিটেলশপ গড়ে ওঠে। পাশাপাশি বসুন্ধরা এবং যমুনা ফিউচারপার্কের মতো শপিংমল গুলো তাদের যাত্রা শুরু করে। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তের একটা অংশ কাঁচাবাজার থেকে সরে আসে আধুনিক গ্রোসারি শপে। কারণ আধুনিক এই গ্রোসারি শপ রকামারি পণ্যের পসার সাজিয়ে রেখেছে। ফলে ক্রেতার পক্ষে স্বাচ্ছন্দে হাতের নাগালে নিজের পছন্দমতো পণ্য কেনা সম্ভব হয়েছে। মূলত ভোক্তার পছন্দ এবং সহজ সরবরাহ এই দুইটি সুবিধা যে বিক্রয় মাধ্যম দিতে পারবে তাদের দিকেই ভোক্তারা ঝুঁকবে।
এই দিকটি বিবেচনায় রেখে বলা যায় যে অনলাইন শপিংসহ অন্যান্য বিকল্প বিক্রয় মাধ্যম ভবিষ্যতে আরো অনেক বেশি জনপ্রিয় হবে। যদিও এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্রেতাই শপিংমলে গিয়ে বিবিধপণ্য যাচাই করে পছন্দসই পণ্যটি কিনতে আগ্রহী। আজকাল অনেক বড়বড় দোকানে প্রোডাক্ট ট্রায়াল, ডেমনস্ট্রেশন ও স্যাম্পলিং করা হয়। যেমন মহিলারা পারফিউম কেনার সময় বিক্রয়কর্মীদের দেয়া সুগন্ধিমাখা স্ট্রিপে সৌরভ নিয়ে পছন্দসই পণ্য বেছে নেন। কারণ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ব্রান্ডের পণ্য বাজারে আসছে। একটু যাচাই না করে হুট করে তো কেউ কিনে নেবে না। কোনো মহিলা ক্রেতা এলিজাবেথ আর্ডেনের ‘রেড ডোর’ বা ‘গ্রিনটি’ ব্যবহার করেন বলে সবসময় যে তা কিনবেন তা তো নয়। কোনো একটা নতুন সুগন্ধি বাজারে এল। ধরা যাক, সেই পণ্যের নাম‘সেন্ট অব ডার্কনেস’। এই সুগন্ধীর সুরভি অদ্ভুত মাদকতাময়। সেই মহিলা শপিংমলে ব্রান্ড সুইচ করলেন। অনলাইন শপিং চ্যানেলে এই ট্রায়ালের অভিজ্ঞতা দেয়া সম্ভব নয়।
পোশাক কেনার ক্ষেত্রেও ক্রেতা শুধু পোশাকের রঙ বা ডিজাইন দেখে পোশাক নির্বাচন করেন তা নয়। অনেক ক্রেতাই কাপড়ে আঙ্গুল বুলিয়ে টেক্সচার কেমন মানের তা অনুভব করার চেষ্টা করেন। তাছাড়া স্যুপ, জুস এইসব প্যাকেট পণ্যের ক্ষেত্রে স্যাম্পলিং একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নব্বইয়ের দশকের আগে কফি বাংলাদেশের বাজারে তেমন জনপ্রিয় ছিলনা। নেসলে কোম্পানির গাড়ি ছোট ছোট কাগজের কাপে বিভিন্ন জনসভা বা অনুষ্ঠানে কফি স্যাম্পলিং করে। আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ বড় বড় শহরে নেসকাফে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সুপারশপে স্যাম্পলিং এই ধরনের পণ্য বিক্রিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অনলাইনে যা সম্ভব নয়।
তাছাড়া অনলাইনে লেনদেনের মাধ্যম হিসাবে ক্রেডিট কার্ড এখনও গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেনি। অজানা, অচেনা কোম্পানিকে ক্রেডিট কার্ডের নম্বর ও তথ্য প্রদানে ক্রেতার রয়েছে আস্থাহীনতা। তৃতীয় আরেকটি কারণ হল পণ্য পছন্দ না হলে বা কাজে না লাগলে তা ফেরত পাঠানোর ঝক্কি ঝামেলা।
নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমে বিশেষত আমেরিকায় অনেক ই-কমার্স কোম্পানি আন্তর্জালের মাধ্যমে রিটেইল ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ করেছে স্বল্প কিছু কোম্পানি। এদের মধ্যে আমাজন ডট কম অন্যতম। আমাজনের প্রধান কর্ণধার জেফ বেজস। আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশলী গ্রাজুয়েট জেফ বেজস এক সাক্ষাৎকারে তার সাফল্যের কারণ হিসেবে প্রধান যে দুটি বিষয়কে চিহ্নিত করেন, তাহলো পণ্য সহজে বাছাই করণের সুবিধা এবং পণ্যের বিশাল সংগ্রহ। আমি মনে করি আমাজনের সাফল্যেও আরেকটি কারণ হল এরা এমন সব প্রোডাক্ট লাইনে ব্যবসা করেন যা সাধারণত খুব বেশি যাচাই করার প্রয়োজন হয় না। যেমন, বই, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, হোম এপ্লায়েন্স, উপহার সামগ্রী ইত্যাদি।
আমাজনের বইয়ের সংগ্রহ সত্যিই অবিশ্বাস্য। অনেক দুষ্প্রাপ্য বই এরা বের করে এনে দেবে। এছাড়াও আপনি কোনো বিষয়ের উপর একটা বই পছন্দ করলে পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অন্যান্য কয়েকটি বইও সুপারিশ করবে। যা অনেক পাঠক বিশেষ করে যারা গবেষক তাদের জন্য বেশ সহায়ক। তাছাড়া একসাথে অধিক মূল্যের বই বা পণ্য কিনলে তারা প্রেরণ ব্যয় ক্রেতার কাছ থেকে নেয় না। আমাজন ২০০৭ সাল থেকে কিনডেলের মাধ্যমে ই-বই বিক্রি শুরু করে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। আমাজনের মূল সাফল্যের কৌশল হল উদ্ভাবণীক্ষমতা। কিনডেল তার অন্যতম উদাহরণ। সম্প্রতি জেফ বেজস ঘোষণা করেছেন যে, শিগগিরই স্বয়ংক্রিয় বাণিজ্যিক দ্রোনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে অর্ডারকৃত পণ্য পৌঁছে দেয়া হবে। প্রযুক্তি আমাদের জীবন যাত্রাকে শুধু সহজ থেকে সহজতর করেছে তা নয়, বদলে দিয়েছে জীবনধারা। অন্য এক নিবন্ধে সেই গল্প করা যাবে।
আন্তর্জাল লেনদেনে যে বিষয়গুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে বা মানুষের আস্থা অর্জন করেছে সেগুলো হল কার রেন্টাল, বিমানের টিকিট, হোটেল বুকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, বিল পরিশোধ ইত্যাদি।
প্রচলিত ধারায় ব্যবসা হয় দুই ধরনের; ‘বিটুবি’ কিংবা ‘বিটুসি’। ‘বিটুবি’তে বিক্রেতা একটি প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেতাও আরেকটি প্রতিষ্ঠান। আর ‘বটুসি’তে বিক্রেতা হল প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেতা হল সাধারণ গ্রাহক বা কনসিউমার। ই-কমার্স এসে বাজারের এই প্রচলিত ধারণা পাল্টে দিল। এখন বিক্রয় ডট কমের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার্ড কোম্পানির সাহায্য না নিয়েই ‘সিটুসি’ ব্যবসা করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ বাসায় বসেই একজন ব্যক্তি অন্য একজনের কাছে বই, গিটার বা মোটরবাইক বিক্রি করতে পারছেন। ক্রেতা বিক্রেতার এই লেনদেনকে অনানুষ্ঠানিক বাজারও বলা যেতে পারে। ই-বে, আলিবাবা কিংবা বিক্রয় ডট কমের ভার্চুয়াল মিডিয়ায় কনজিউমার টু কনজিউমের একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি হয়েছে যার পরিমাণ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।
অনলাইন শপিং মার্কেট যে অচিরেই বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশে প্রসার লাভ করবে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
