
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড.মুহাম্মদ ইউনুসের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। ড.মুহাম্মদ ইউনুসের উপদেষ্টারা কারা হবেন তাদের নামও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আজ অথবা আগামীকালের মধ্যে প্রকাশ করবেন বলে অনুমান করা যায়।
তবে এই নামগুলি তারা ড.মুহাম্মদ ইউনুসের সাথে আলোচনা করেই প্রকাশ করবেন সেটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারন, ড.মুহাম্মদ ইউনুস চাইবেন নিজ টিমের মধ্যে নিজের পছন্দের লোক বা সমমনাদের রাখতে যাতে তার পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়। তবে এমনটি নাও হতে পারে। ছাত্ররা তাদের পছন্দ মতো নামও প্রস্তাব করতে পারে। সেক্ষেত্রে ছাত্রদেরকে এমন কিছু ব্যক্তিকে মনোনীত করতে হবে যাদের পক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়।
তবে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ড.মুহাম্মদ ইউনুস এখানে একটি প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে আর্বিভূত হবেন সেটি বহু আগেই speculate করা সম্ভব হয়েছিল।
ড.মুহাম্মদ ইউনুস আমেরিকান লবির লোক। বাংলাদেশে একটি হামিদ কারজাই ধরনের সরকার আমেরিকা বহুদিন থেকেই চাচ্ছিলো। সেক্ষেত্রে নিকট ভবিষ্যতে আমরা বাংলাদেশে আমেরিকার প্রভাব দেখতে পাবো। একই কারনে বাংলাদেশে চীন এবং রাশিয়ার প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস পাবে। ইন্ডিয়া আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হওয়ায় বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার প্রভাব থাকবে তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন ample access ছিল সেটা হয়ত থাকবে না। বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার ইন্টারেস্টগুলি তখন আমেরিকার মাধ্যমে এন্ডোর্রস হয়ে আসতে হবে। সেটা ইন্ডিয়ার জন্য অসস্থির কারন হবে। কিন্তু এই মূহুর্তে ইন্ডিয়ার পক্ষে নিরব দর্শকের ভূমিকা নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।আপাতত তারা গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
আর এই অন্তবর্তীকালীন সরকার তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে চলে যাবেন এমন মনে করার কোন কারন নেই। অন্তত দুই থেকে তিন বছর তারা ক্ষমতায় থাকবেন।
বর্তমান সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান কিছু দিন আগে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কোটা সংস্কার ছাত্র আন্দোলনটা বর্তমান সেনাপ্রধানের নিয়োগের কয়েক মাসের মধ্যে দাঁনা বেধেছিল। তাতে মনে হতে পারে ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগের সাথে এই আন্দোলন দাঁনা বাধার কোন পূর্বাপর সম্পর্ক থাকতে পারে।আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশজ এজেন্টরা যেন এই সুযোগটি কাজে লাগানোর অপেক্ষায় ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার গতবারই সেনাপ্রধান হবার কথা ছিল কিন্তু তাকে সেই সময় সেনাপ্রধান করা হয় নাই। কেন সেই সময় তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়নি সেই কারনগুলি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এইবার তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানের সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার আত্নীয়ও হন। শেখ হাসিনার পরিবারের কয়েকজনের অনুরোধে ওয়াকার সাহেবকে নিয়োগ দেওয়া হয়। শোনা যায় এই অনুরোধের মধ্যে শেখ রেহানা, তন্ময়, তাপস এদের নাম আছে।তারা শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছিল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়োগ দিলে কোন অসুবিধা হবে না। শেখ হাসিনা তাদের অনুরোধ ফেলতে পারেননি।আর শেখ হাসিনাও মনে করেছিলেন নির্বাচন হয়ে গেছে, আপাত নিরুপদ্রব অবস্থায় ওয়াকারকে নিয়োগ দিলে খুব একটা ঝুঁকি নাই। ওয়াকার সাহেব থার্টিন লং-কোর্সের।নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী প্রধানও থার্টিন লং-কোর্সের। এই তিনজনই বন্ধু।
সে যাই হোক, আওয়ামী লীগের পতনে আওয়ামী লীগ বিরোধীরা প্রচন্ডভাবেই খুশি হয়েছেন,দেশব্যাপী আনন্দ উৎসব করেছেন। মিষ্টি বিতরনের দৃশ্য টিভি চ্যানেলগুলিতে দেখা গেছে। এই দিন মিষ্টির দোকানগুলি মিষ্টি শূন্য হয়ে পড়েছিল। এগুলো খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা এক ফ্যাসিস্ট,জালিম সরকারের পতন হয়েছে। দেশে বিরোধী দলকে যেভাবে দমন করা হয়েছিল তা নজিরবিহীন। গুম,খুন নিত্য দিনের ব্যাপার ছিল। আর দুর্নীতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। দেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিনত করা হয়েছিল।নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছিল। পাঁচ বছর পর পর প্রহসনের নির্বাচন করা ছাড়া নির্বাচনী ব্যবস্থার আর কোন কাজ ছিল না।বিরোধী মতের যে কাউকে রাজারকার বলে গালি দেওয়া আওয়ামী লীগের অভ্যাসে পরিনত হয়েছিল। সম্মানীতদের অপমান করা আওয়ামী লীগের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৫ বছরে রাষ্ট্রকে এক মূক এবং বধির রাষ্ট্রে পরিনত করা হয়েছিল।
১৫ বছরে মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে হতে এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল যে এই পাহাড়সম পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যে কোন উছিলায় বিস্ফারিত হবার অপেক্ষায় ছিল।
কোটা সংস্কার আন্দোলন তাদের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরণের সুযোগ করে দিয়েছে। এই আন্দোলনের মাথায় কোন পক্ষ ভর করে ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে কি চাচ্ছে না সেটি জনগনের কাছে মূখ্য ছিলো না। মূখ্য ছিলো কিভাবে তারা তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে প্রকাশ করে মনকে শান্ত করবে।
যে কথাগুলি বললাম সেগুলো হচ্ছে বাস্তবতা।এই বাস্তবতা কেউ কেউ অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু আমি বংবন্ধুর একটি উক্তি কোট করে বলতে চাই” তোমরা রিয়েলিটি মাইনে নাও।”
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং জামাতের জন্য সময় ভালো। ইতিমধ্যে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তার জোষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানও রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় দেশে ফিরে আসবেন বলেই আমার ধারণা।
এটি মূলত মাইনাস টু নয়, মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা কার্যকর হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেরুদণ্ড ভেংগে দেওয়া হবে। সেই কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান।
এখন কোন আইন শৃঙ্খলা নেই। ইচ্ছে করে অরক্ষিত রাখা হয়েছে। মূল স্থাপনাগুলি ভেংগে ফেলা হচ্ছে কিন্তু সেনাবাহিনী নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষুব্ধ মবকে বিরত করার কোন ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। উত্তেজিত জনতা অনেককে পিটিয়ে হত্যা করে ঝুলিয়ে দিয়েছে। বংবন্ধুর মূর্তি, ভাস্কর্য ডেমোলিশন ক্রেইন দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।কোন বাহিনী এগিয়ে আসছে না। এগুলো মূলত আন্তর্জাতিকভাবে কভারেজ পাওয়ার জন্য মবকে কোন রকম প্রতিরোধ ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববাসীকে দেখানো হচ্ছে, বিগত সরকারের উপর জনগন কি পরিমান ক্ষুব্ধ। এই সব করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নামক দলটির মনোবল একেবারে ভেংগে দুমড়ে দেওয়া হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই cleansing operation চলবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দিরগুলি ভেংগে ফেলা হচ্ছে,তাদের বাড়িঘরে আক্রমণ হচ্ছে,তাদের হত্যা করা হচ্ছে। কিছু জায়গায় কেমোফ্লেক্স আকারে দেখানো হচ্ছে মন্দির রক্ষার জন্য হুজুররা পাহারা দিচ্ছে। এই অপারেশনের কাজ সম্পন্ন হবার পর সব বাহিনী আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় এগিয়ে আসবে। তখন তারা আইন শৃঙ্খলা restore করবে।
ছাত্রদের মাধ্যমে দেশ সংস্কারের কিছু চটকদার দফা পেশ করা হয়েছে যাতে জনগনের মধ্যে এইসব দফার প্রতি একধরনের মোহ সৃষ্টি হয়।ইতিমধ্যে এই মোহ জনগনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ শুধু ক্ষমতার হাত বদল চায় না,তারা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার চায়। এই দাবীর পক্ষে প্রবল জনমত রয়েছে। তারা চায় না পুরনো ধারার রাজনীতি আবার ফিরে আসুক। আমিও এই সংস্কার দাবীর প্রতি মোহাবিষ্ট। কিন্তু আমার মনে হয় এই মোহ কেটে যাবে অচিরেই।
অন্তবর্তীকালীন সরকার খুব সম্ভব অধ্যাদেশ দিয়ে দেশ চালাবেন। তারা কিছু সংস্কারও করবেন হয়ত।
অধ্যাদেশ জারি করে এমন সংস্কার ১/১১ এর ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও করতে চেয়েছিল। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রেডিও টিভির স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদির সংস্কার প্রায় সম্পন্ন করে এনেছিল, অধ্যাদেশও রেডি ছিল কিন্তু পরবর্তী নির্বাচিত সরকার সেই অধ্যাদেশগুলি সংসদে বিল আকারে এনে পাশ করার উদ্যোগ নেয়নি। এইবারও সেই রকম হতে পারে।
আসন্ন অন্তবর্তীকালীন সরকার সুবোধ বালক নয় যে তারা তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে বিদায় নিবে।এটা মোটামুটি ভাবা যায় তারা দুই থেকে তিন বছর ক্ষমতায় থাকবে। এর পর এই সরকারের এক্সিট নেওয়ার প্রশ্ন আসবে এবং তাদের সমস্ত অধ্যাদেশগুলি পরবর্তী নির্বাচিত সংসদে পাশ করে আইন আকারে পরিনত করার প্রশ্ন আসবে।
সেক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এই অধ্যাদেশগুলি তাদের সুবিধামত কিছু রেখে অধিকাংশই বাতিল করে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমনটি যে হবেই তা আমি বলছি না। বলতে চাচ্ছি এই অধ্যাদেশগুলি পাস হয়ে আইনে পরিনত করার কোন গ্যারান্টি নাই।
অন্তবর্তীকালীন সরকার তাদের এক্সিট এবং জারি করা অধ্যাদেশগুলি পাসের জন্য সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নয় বরং তাদের বিরোধী পক্ষ বিএনপি-জামাতের প্রতি ঝুকে থাকবে আর বিগত ক্ষমতাসীনদের প্রতি বৈরী থাকবে। অন্তবর্তীকালীন সরকার তার পুরো সময় আওয়ামী লীগ পরিষ্কার করার এক মহা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাবে।
তাই অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করা যায় না।
আসন্ন অন্তবর্তীকালীন সরকার মূলত মাইনাস ওয়ান ফর্মুলাতেই আগ্রসর হবে বলে আমার ধারণা।।
স্কারবোরো, কানাডা
