আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় রোজা

ছবিমোহাম্মদ ফাইজ জুলকিফি

ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা রমজান মাসের রোজা ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের রোজার সাথে পরিচিত। এসব রোজায় শেহরির সময় খেয়ে সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের আজান পর্যন্ত দিনের পুরোটা সময় সকল প্রকার খাদ্য ও পানীয় বর্জন করা হয়। এসব করা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। আহারে কী থাকবে কী থাকবে না, সেটা নিয়ে তেমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। সময়ের দৈর্ঘ্যরে বেলায় গ্রীষ্মকালের লম্বা দিনগুলোতে বিশে^র বেশিরভাগ দেশের অধিকাংশ রোজাদারকে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টার বেশি অনাহারে থাকতে হয় না। দিন যত ছোট হয়, রোজার দৈর্ঘ্যও তত কমে।

অনেক ধর্মেই রোজা রাখার বিধান আছে। রোমান ক্যাথলিক কিংবা পূর্ব ইউরোপের অর্থডক্স খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারীরা ৪০ দিনের রোজা ছাড়াও বছরের কিছু বিশেষ দিনে রোজা রাখে। বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝিতে এই ব্যবস্থা খানিকটা শিথিল করা সত্তে¡ও পুরোনো মানুষজন এখনও সেই বিধান অনুসরণ করে চলেছে। ইহুদি ধর্মে বছরের বিভিন্ন সময়ে রোজা রাখা ছাড়াও খাবারের নানা বিষয় নিয়ে নানাধরনের বিধিনিষেধ চালু আছে। ভারতের জৈন ধর্মের অনুসারী থেকে শুরু করে তিব্বতের বৌদ্ধ মঙ কিংবা হিন্দু ধর্মের সাধু পুরুষদের কাছে রোজা এক বিশেষ উপাসনা। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও অনশন বা রোজা এক জনপ্রিয় বিষয় এবং মহাত্মা গান্ধীর মতো মানুষ একে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এছাড়া, সাংস্কৃতিক কারণেও মানুষ রোজা রাখে এবং দক্ষিণ আমেরিকার পেরু থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাঝে বিভিন্ন ধরনের রোজার প্রচলন দেখা যায়। আর চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোজার ইতিহাস তো অনেক প্রাচীন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলে খ্যাত গ্রিক দার্শনিক হিপোক্র্যাট (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০-৩৭৫) আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে নানা রোগের পথ্য হিসেবে খাবারের পাশাপাশি রোজাকেও ব্যবহার করেছেন। আর বর্তমানের চিকিৎসাব্যবস্থায় বলা যায় যে বিপ্লবই ঘটিয়েছে এই রোজা। এভাবে, ধর্মীয় হোক কি রাজনৈতিক কি সাংস্কৃতিক কি চিকিৎসা, বিশে^র সকল মহাদেশে রোজার প্রচলন ছিল এবং আছে। উদ্দেশ্য যাই থাক, শরীরের বেলায় এর উপকারে কোনো তারতম্য নাই।

- Advertisement -

রোজা যে কত প্রকার ও কি কি, তা বলে শেষ করা যাবে না। জানুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দিনে ডাক্তার জাহাঙ্গীরের ভিডিওতে তার মুখে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা ওয়াটার ফাস্টিং শব্দগুলো প্রায়ই শুনতে পাই। পরে কানাডিয়ান ডাক্তার জ্যাসন ফাং-কেও দেখলাম ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে বিশাল বক্তৃত দিতে। গেøা-১৫ বইয়ের লেখক নাওমি তো রীতিমতো ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর ভক্ত, তার আগ্রহ একদিন বাদে একদিন রোজা রাখা। মোট ১৫ দিনের সূচিতে তাই ৬ দিন মাত্র রোজা, আর তাতেই ত্বকে চিকনাই ফিরে আসে। ভাবা যায়! ডাক্তার গ্রান্ডি টানা ৫ দিনের রোজার পক্ষে, আর অধ্যাপক সিনক্লিয়ার প্রতিদিন সকালের নাস্তা বাদ দিতে বলেন, অথবা নিতে হলেও কয়েক চামচ দই এবং ভিটামিন ডি৩। এসব পড়তে পড়তে আগ্রহ জন্মে, আর তা থেকেই খোঁজ, এবং সেটা করতে গিয়ে আমার চোখের সামনে বিশাল রহস্যের জট খুলে যায় এবং নানাধরনের রোজার হদিস পেয়ে যাই। সেই মোতাবেক কোন রোজায় কী হয়, তার একটা ধারণা পেতে চেষ্টা করলাম।

১.   ঘড়ির কাঁটা ধরে রোজা। এই রোজায় সন্ধ্যা ৭ টায় খেয়ে একাধারে ১২, ১৪, ১৬, ১৮, ২০ অথবা ২২ ঘণ্টাব্যাপী না খেয়ে থাকতে হয়। অনাহারের সময় পানি, সবুজ চা, চিনি ছাড়া চা বা কফি ইত্যাদি খেতে অসুবিধা নেই। ওজন কমানোর বেলায় ১২ কিংবা ১৪ ঘণ্টার রোজা তেমন কার্যকর না হলেও ১৬ থেকে ২২ ঘণ্টা বেশ কার্যকর। আসলে ১২ ঘণ্টার পরে পেট থেকে সবধরনের খাবার আসা বন্ধ হয়ে গেলে শরীরের চর্বি না গলে কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু কিটোন নির্গমনের বেলায় ১৮ ঘণ্টার কমে কাজ হয় না, অটোফ্যাজি তো নয়-ই।

২.   একদিন বাদে একদিন রোজা। এই রোজায় সপ্তাহে একদিন পর পর মোট তিন দিন রোজা এবং চারদিন রোজা ছাড়া থাকতে হয়। রোজা না রাখার দিনগুলোতে যত খুশি খাওয়া যায় এবং রোজার দিনগুলোতে কেবল সন্ধ্যায় একবার খেতে হয় এবং সেটাও একেবারে নগন্য পরিমাণে, ক্যালরির হিসাবে বরাদ্দ মাত্র৫০০। এটি খেতে হয় রোজা রাখার আগের দিন সন্ধ্যায়। পরদিন সারাদিন না খেয়ে অথবা শশা-লেটুসের সালাদ খেয়ে একেবারে সন্ধ্যার সময় ভরপেটে খাওয়া। পানি, দুধ-চিনি ছাড়া চা বা কফিতে আপত্তি নেই। ওজন কমানোর বেলায় এই রোজা ২২ ঘণ্টার রোজার মতোই কার্যকর। সপ্তাহে মাত্র ৩ বার মেটাবলিক সুইচ ঘটে, অর্থাৎ কার্ব থেকে ফ্যাট বা ফ্যাট থেকে কার্বনির্ভর মেটাবলিজমে পরিবর্তন ঘটে মাত্র ৩ বার, সেজন্য ৭ দিনে ৭২ ঘণ্টার মতো সময় কিটোন নির্গত হয়। এই ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৫৪ ঘণ্টা অটোফ্যাজি চালু থাকে। আর কোনো রোজায় এত বেশি সময় ধরে অটোফ্যাজি হয় না । ভাবা যায়!

৩.  সপ্তাহে ২ দিনের রোজা। এই রোজায় সপ্তাহে ২ দিন রোজা আর বাকি ৫ দিন রোজা ছাড়া। পরপর ২ সন্ধ্যা কেবল ৫০০ ক্যালরি গ্রহণ এবং তৃতীয় দিনের সন্ধ্যায় ভরপেটে খাওয়া। অনেক কষ্টদায়ক রোজা হলেও ২ দিনে কিটোন নির্গত হয় ৪৮ ঘণ্টা এবং এর মধ্যে ৪০ ঘণ্টা হচ্ছে অটোফ্যাজি।

রোজার প্রকার জানলাম, কিন্তু কীভাবে শুরু করবো? ইচ্ছে হলো আর একদিন ভোরবেলা সেহরি খেয়ে শুরু করে দিলাম, বিষয়টা এমন হতো হলে তো কথাই ছিল না, সেক্ষেত্রে রোজার ৩০ দিন শেষে প্রতিবছরই অটোফ্যাজির উপকার নিয়ে ঈদের ময়দানে হাজির হতাম। কিন্তু তাতো হয় না। রমজান মাসের রোজায় শরীরের ওজম তো কমেই না, বরং বেড়ে যায় এবং দিনের শেষ দিকে দুর্বল শরীর নিয়ে ইফতারির জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকি। রক্তে গøুকোজ কমে যাওয়ায় মগজে জ¦ালানি ঘাটতি প্রবল হয়ে ওঠে, সেজন্য কারো কথা শুনতে ইচ্ছে করে না। টিভিতে হুজুরদের বয়ান দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মনে হয়। কাজেই স্বাভাবিকভাবে রমজান মাসের মতো রোজা শুরু করে দিলে শরীর যে গøুকোজনামক এনার্জির একটা সংকটে ঢুকে পড়ে সেটা বুঝতে পারি। আর সবসময় তো এটাই শুনে এসেছি যে, রোজার মধ্য দিয়ে আমরা অনাহারী মানুষদের কষ্টের বিষয়টি অনুধাবন করি। আসলেই কি তাই? যার ঘরে খাবার নেই, পরদিন কী খাবে এই চিন্তা নিয়ে যে ঘুমাতে যায়, তার কষ্ট ইফতারি-সেহরিতে উপচে পড়া খাবারের মধ্যে বসে অনুধাবন করা কি আদৌ সম্ভব? অনিশ্চিতের বিপরীতে নিশ্চিত খাবার― এই দুই বিপরীত অবস্থাকে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য তার কল্পনায় রূপালি জোছনাকে ঝলসানো রুটির উপমা দিয়ে বুঝাতে চাইলেও সেটা ওই বুঝের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবের অনুভূতি তাকে গ্রাহ্য করে না, করার কথাও না।

যাহোক, রোজায় রক্তে গøুকোজ নিয়ে যে সংকট, তা উত্তরণে ইউটিউবে অনেকে অনেকভাবে বলে, আমরা মন দিয়ে শুনি। মূল কথা ফ্যাট মেটাবলিজম শুরু করতে হবে। আর একবার চর্বি গলিয়ে চলা শুরু করলে রোজায় এনার্জি সংকট দেখা দেয় না, এমনকি আহার কমিয়ে দিলেও শরীর দূর্ভিক্ষাবস্থায় চলে যায় না। অপরদিকে, সঞ্চিত চর্বি থেকে খাবার পাওয়ার কারণে মগজ মশাই তখন আর মাথা গরম করে না।ওজন কমানো তথা অটোফ্যাজি শুরু করতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়; কিন্তু অনেকেই না বুঝে একে পরিহার করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনে।আসলে কোষের চুলা নামে পরিচিত মাইটকন্ড্রিয়ার কারবার সম্পর্কে কিছু জানলে হয়তো কার্ব বনাম ফ্যাট মেটাবলিজমের রহস্যটা আর গোপন থাকে না।

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent