
কলেজের বারান্দায় দাড়িয়ে এগুলো ভাবছিল নির্বাণ তখন কলেজ গেইট দিয়ে তন্নিকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। নির্বাণ এক সেকেন্ড ও সেখানে না দাঁড়িয়ে ছুটে যায় তন্নির দিকে। তন্নির কাছে এসে দাঁড়াতেই তন্নি গম্ভীর গলায় বলে, ‘ কাগজ পত্র এনেছিস? ‘
তন্নির কথায় ছোট বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। আজকে তার তন্নিকে ভয় লাগছে মনে হচ্ছে যেন তার বিরুদ্ধে নির্বাণকে চোখের তাপে পুড়িয়ে ফেলবে। তাই তন্নির কথার সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে কয়েকটা ঢুক গিলে অনেক সাহস করে জিজ্ঞেস করে, ‘ আচমকা বিয়ের ডিসিশন কেন নিলি?’
নির্বাণের প্রশ্নে তন্নি রাগী দৃষ্টিতে তাকায় বলে,’ কেন আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছা কি তোর নাই? ‘
তন্নির কথায় ভয়ে সাথে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘ না না আছে।’
তন্নি এবার শান্ত গলায় হুমকির ন্যায় বলে,’ তাহলে আর একটা প্রশ্নও করবি না।’
নির্বাণ ভদ্র ছেলের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে বুঝায় সে আর কিছু বলবে না। সে সারাজীবন শুনে এসেছে পুরুষ নাকি তার শখের নারীকে ভয় পায়। আজ বুঝতে সে নিজে উপলব্ধি করতে পারছে শখের নারীর ভয় কাকে বলে। তন্নি নির্বাণের হাত ধরে রাইসা আর মনিরকে নিয়ে চলে কাজী অফিসে৷
বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে কিছুক্ষণ হয়েছে। রাইসা আর মনিরকে নিয়ে নির্বাণ আর তন্নি একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে। ওর্ডার দিয়ে অনেক্ষণ হলো বসে আছে৷ এর মাঝে তারা নানা রকম গল্প করছে। গল্পের মাঝে নির্বাণ প্রশ্ন এখন তো বিয়ে হয়ে গেছে এবার তো বল হুট করে এই ডিসিশন কেন নিলি?’
নির্বাণের প্রশ্নে মুখ থেকে হাসিটা গায়েব হয়ে যায়। এক রাশ মন খারাপ নিয়ে বলে,’ কালকে আপুকে দেখতে এসেছিল পাত্রের ছোট ভাই উদ্ভূত নজরে দেখছিল আমাকে। আর এখানে আপুর বিয়েটাও ঠিক হয়ে যাবে। মনে হলো ছেলেটা আমাকে তোমার হওয়ার আগেই কেড়ে নিতে চাইবে ও নজরটা এতটা বাজে ছিল আমার কাছে তাই আগেই তোমার হয়ে গেলাম।’
জয় তন্নির দিকে বাজে নজরে তাকিয়েছে এটা কানে আসতেই মেজাজ গরম হয়ে যায়। আবার তন্নির এমন পাগলামো দেখে হাসিও পায় তার। মেয়েটা এতো পাগল তার জন্য। তন্নিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ ওরে আমার পাগলিটা এবার শান্তি হয়েছে? ‘
তন্নি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বুঝাই মানে সে এবার শান্ত তার আর কোন ভয় নেই। সে শুধু নির্বাণের। এই ভেবেই মুখে হাসি ফুটে উঠে।
আজকে বিজয়দের বাসায় যাবে বিয়ের ডেইট ঠিক করতে। কিন্তু সকাল থেকে তন্নি জেদ ধরেছে সে যাবে নাহ। নূর জাহান অনেক বুঝিয়েও রাজি করাতে পারলো নাহ। শেষে না পেরে তাহের সাহেবকে বলল,’ তন্নি রাজি হচ্ছে না। ‘
তাহের সাহেব চেয়ারে বসে পেপার পড়ছিল। স্ত্রীর কথায় পেপার মুখের সামনে থেকে সড়িয়ে ভাজ করে পাশের টেবিলে রেখে বলে,’ তুমি রেডি হও আমি দেখছি।’
নূর জাহান মাথা নাড়িয়ে রেডি হতে চলে যায়। এদিকে তাহের সাহেব তন্নির রুমে ঢুকে। তন্নির দিকে তাকিয়ে তেজি গলায় বলে, ‘ কি সমস্যা যেতে চাইছো না কেন?’
তন্নির এবার হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে যায়। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে নাহ আমতা আমতা করতে শুরু করে। তাহের সাহেব বেশিক্ষণ উত্তর এর অপেক্ষা করলো না। তন্নির দিকে তাকিয়ে শাসানো গলায় বলে গেলো,’ ৩০ মিনিটের ভিতরে রেডি হয়ে আসো। ‘
তাহের সাহেব চলে যায়। তাহের সাহেব যেতেই টেবিলে নিজের সামনে খুলে রাখা বইটা ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। একটা দিনও কি তার মতের দাম দেওয়া যায় না। সবসময় তাদের ইচ্ছেতেই চলতে হবে কেন? এতটুকু স্বাধীনতাও কি তার নেই। তন্নিকে রাগতে দেখে দৃষ্টি এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে,’ যা রেডি হয়ে আয় নয়তো আবার বকা দিবে তোকে।’
তন্নি এবার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ এতটা পাষাণ কি করে হলি আপু ? নিজের শখের মানুষটাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারলি?’
তন্নির কথায় নিজের উপর তাচ্ছিল্য হেসে বলে, ‘ মেয়েদের সবসময় জেদ ধরতে নেই কিছু কিছু সময় বাস্তবতা মেনে নিতে হয়। সবসময় আবেগকে দাম দিলে হয় নাহ।’
দৃষ্টির এমন প্রশ্নে অবাক হয় তন্নি। ঐ ছেলেটার জন্য কতই না পাগলামো করতো এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলো সব। নিজেকে পরিবর্তন করে নিলো। তন্নি আর কিছু না বলে উঠে রেডি হয়ে গেলো। সবাই চলে যেতেই দৃষ্টি তার ফোনে আবার ঐ সিমটা ঢুকায়৷ কল দেয় তার শখের মানুষকে। ঐপাশ থেকে বেশ খানিক্ষণ পর কল রিসিভ হলো। দৃষ্টি ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করলো,’ কেমন আছো?’
কিন্তু ঐ পাশ থেকে জবাব আসলো অনেক্ষণ পর, ‘ কোথায় তুমি কল দিচ্ছেলে না কেন?’
দৃষ্টি একটু জোরে হেসেই বলে,’ তেমার থেকে অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছিলাম। ‘
ঐপাশ থেকে আবারও উত্তর আসে, ‘ মানে?’
দৃষ্টি সেই হাসি বজায় রেখে বলে,’ অনেক দিন ধরে তো মুক্তি চাইছিলে এবার ব্যবস্থা হয়ে গেছে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ‘
ঐপাশের ব্যক্তিটা চরম অবাক হয়। সে এতদিন দৃষ্টির উপর বিরক্ত ছিল ব্রেকআপ করতে চাইছিল কিন্তু এই দুইদিন যোগাযোগ না থাকায় তার জীবনে দৃষ্টির অবস্থান টা বুঝতে পারে। দৃষ্টি আবারও বলতে শুরু করে,’ তুমি বার বার ব্রেক আপ করতে চাওয়ার পরও আমি বাবাকে তোমার কথা বলতে চেয়েছিলাম কারণ তোমার জন্য পাগল আমি কিন্তু কি বলোতো আমার কথার মূল্য তোমার কাছেও নেই আমার বাবার কাছেও নেই। ‘.
অপর পাশের ব্যক্তিটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অস্থির গলায় বলে, ‘ প্লিজ দয়া করে আমাকে ছেড়ে যেও না।’
দৃষ্টি এবার তাচ্ছিল্য হেসে বলে, ‘ তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না তুমি ছাড়িয়ে দিয়েছো আমাকে। আচ্ছা ভালো থেকে আমার না হওয়া মানুষ। তুমি আর বাবা মিলে আমাকে তোমার হতে দিলে নাহ।’
একরাশ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কল কেটে দেয় দৃষ্টি। নিজেকে অসহায় মনে হলেও শক্ত করে নেয় আর কাঁদবে না সে। এবার সে বিয়ে করবে বাবার পছন্দের ছেলেকে। সে জানে নাহ ভালোবাসার মানুষটিকে না পাওয়ার আক্ষেপ তার এ জীবনে গুছবে কিনা কিন্তু সে সুখি হবে যেকোনো মূল্যে।
তন্নিকে দেখা মাত্রই জয় তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে শুরু করেছে। তন্নি বিরক্ত হচ্ছে যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জয় এতটা চিপকু যে এবার অসহ্য হয়ে গেছে। জয় এক গ্লাস শরবত এনে তন্নির সামনে ধরে বত্রিশ পাটি বের করে বলে,’ বেয়াইন শরবত খাবেন? ‘
এবার তন্নি বিরক্ত হয়ে বলে,’ না ভাইয়া খাবো না আমার লাগলে আমি নিজে বলে নিবো।’
তন্নির মুখে ভাইয়া ডাক শুনে মুখটা কালো হয়ে যায় জয়ের। কিন্তু এরপরও হার মানেনি সে। নানাভাবে চালিয়ে গেছে কাজ কর্ম তন্নিকে ইমপ্রেস করার জন্য। এগুলো দেখে তন্নির ইচ্ছে করছিল ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় জয়ের গালে কিন্তু বিয়েতে ঝামেলা হবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
তাহের সাহেব আর নূর জাহান বিজয়ের মা বাবার সাথে কথা বলছিল তখন জয় তার পিছনের চেয়ারে বসে বলে,’ কি ব্যাপার বেয়াইন প্রেম করেন নাকি?’
তন্নি ফোন টিপছিল জয়ের এমন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে,’ তাতে আপনার কোন সমস্যা থাকার কথা বলে আমার মনে হয় না তাই আমার বিষয়ে মাথা কম ঘামাইলেই হবে।’
এই বলে সে উঠে একদম নূর জাহানের গা ঘেঁষে বসে। এই বাড়িতে আর এক সেকেন্ডও থাকতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু বাবার ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না।
