আমাদের শিক্ষক

আমাদের শিক্ষক

ছোটবেলায় ক্লাস থ্রি তে যশোর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে আমি আমাদের বাড়ির পাশের একটা স্কুলে চার পাঁচ মাস পড়েছিলাম। ওখানে একজন স্যার ছিলেন খুব কড়া টাইপের। নাম ছিল ফসিয়ার স্যার। স্যার খুব ধার্মিক ছিলেন। আমাদেরকে ধর্ম পড়াতেন। ঐ কয়দিনেই প্রায় চৌদ্দ পনেরোটা সূরা মুখস্থ করিয়েছিলেন । একটা ঘটনা মনে আছে। ঈদের দিন ঠোঁটে লিপস্টিক মেখেছিলাম। আমাদের কিছু দুষ্ট ফ্রেন্ড ঈদের দিনে কোন কোন মেয়েকে লিপিস্টিক মাখতে দেখেছে, তার তালিকা স্যারের সামনে পেশ করলো। স্যার আমাদেরকে সাজা স্বরুপ ঠাকুর দাদার কল দিলেন। অর্থাৎ পায়ের নিচে দিয়ে হাত ঘুরিয়ে কান ধরা। জীবনের প্রথম শাস্তি। কিন্তু একসাথে দশ পনেরো জন মিলে শাস্তিটা পেয়েছিলাম বলে শাস্তিটাকে ততটা খারাপ লাগেনি। ঐ স্কুল ত্যাগ করার কিছুদিন আগে স্যার একদিন ক্লাসে জিজ্ঞাসা করলেন, ” তোমাদের মধ্যে কে কে ডাক্তার হতে চাও ? ” কেউ হাত তুললো না। শুধু বোকার মত আমি হাত তুলে ফেললাম। স্যার খুব বিশ্বাসের সাথে বললেন, ” হুমম। ও ডাক্তার হতে পারবে। ওর বাবা খুব ভালো মানুষ। ” গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই কথাটা সব সময় আমার কানে বাজে। এই কথাটা সব সময় আমাকে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। একজন টিচার কতটা মোটিভেশনাল স্পিকার হতে পারে, আমার জীবনে স্যার তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

যশোর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ক্লাস ফোরে থাকার সময় আমরা দুজন ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। এক সাইডের খাতা সে তুলবে আর এক সাইডের খাতা আমি। দুজন ই তমিজ উদ্দিন স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের খাতাগুলো এগিয়ে দিয়ে তর্ক করছি, স্যার আমার খাতা গুলো আগে দেখবেন বলে। স্যার কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমাদের কান্ড কারখানা দেখলেন। তারপর সামনের বেতটা দিয়ে আস্তে করে ওকে একটা আর আমাকে একটা বাড়ি মারলেন। ব্যথা তেমন লাগলো না। অন্যজন হাসছিল। কিন্তু আমার মনের ব্যথাটা এতটাই তীব্র হলো যে, কান্না থামাতে ই পারছিলাম না। সমানে কাঁদছি। স্যার খুব অসহায় এর মত বারবার বলছেন, ” মা, তোর বাবা মারলে কি তুই এতটা কাঁদতিস ? আমি তো তোর বাবার মত। ” আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম, ” আমার বাবা আমাকে কখনো মারে না। ” আজ প্রায় চল্লিশ বছর পরেও কানে বাজে স্যার বলেছিলেন, ” আমি তো তোর বাবার মত।”

- Advertisement -

” ক্লাস সিক্স / সেভেনে থাকতে আমাদের একজন নতুন অংকের টিচার আসলেন। স্যার অল্প কিছুদিন ছিলেন। নামটা এই মুহূর্তে মনে আসছে না। প্রথম দিনেই স্যার গল্প করেছিলেন, তাঁর মেয়ের নাম শিলা। আমার ও ডাকনাম শিলা, তাই স্যারকে বলেছিলাম, “তাহলে তো আমি আপনার মেয়ে স্যার।” স্যার দুর্দান্ত অংক করাতেন। ক্লাসে কোন অংক করতে দিলে খুব দ্রুত অংক করে খাতা জমা দিয়ে বান্ধবীদের সাথে গল্প করতাম। স্যার খাতা দেখতে দেখতে হুংকার দিতেন, “কে কথা বলে? ” আমি চটপট উত্তর দিতাম, “আপনার মেয়ে স্যার। ” স্যার প্রশ্রয়ের হাসি হাসতেন।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে আমরা যখন পড়তাম, তখন কলেজে খুব কড়াকড়ি ছিল। সবাই স্যার ম্যাডামদেরকে খুব ভয় পেতো। অথচ কলেজ জীবন শেষ হওয়ার কিছু দিন আগে একদিন আমরা বান্ধবীরা সব স্যার ম্যাডামদের রুমে যেয়ে খুব আবদারের সাথে বললাম, ” স্যার / ম্যাডাম আমরা আজ চকবার খাবো। আমাদেরকে চকবার খাওয়ার টাকা দিবেন প্লিজ।” স্যার ম্যাডামরা হাসতে হাসতেই টাকা দিলেন। এমনকি যখন বের হয়ে যাচ্ছি তখন দেখি ইংরেজির প্রানতোষ সাহা স্যার মটোর সাইকেল চালিয়ে কলেজে ঢুকছেন। আমরা স্যারের মোটরসাইকেল থামিয়ে চকবার খাওয়ার টাকা নিয়েছি। সেদিন প্রতিটা স্যার ম্যাডামের চোখেই হাসি দেখতে পেয়েছি। কতটা অধিকার জন্মালে, এরকম কড়া টিচারদের কাছেও আইসক্রিম খাওয়ার আবদার করা যায়।

একদিন বিমানে হঠাৎ দেখি বিয়ের সাজে এক নববধূ হঠাৎ এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি আমার প্রাক্তন স্টুডেন্ট ডা. মমি। ওর স্বামীর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো। জীবনে সালাম অনেক পেয়েছি। কিন্তু বিমানের ভিতরে এতগুলো মানুষের সামনে সালামের অনূভুতি টা একটু অন্য রকম ছিল।

বি সি এস এবং গাইনিতে এম এস কমপ্লিট করার পরে আমার প্রাক্তন ছাত্রী কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের গাইনির আর এস ডা. সানজিদা ফেসবুকে পোস্ট করেছিল – আমি এখন কোথায় আছি,আমার ঠিকানা কেউ জানে কিনা। কারণ আমার কোন পরামর্শ নাকি ওর ক্যারিয়ার জীবনে অনেক উপকার করেছে। ঐ পোস্টে অনেকেই আমাকে মেনশন করেছিল।

আমার প্রতি জন্মদিনে আমার সব প্রাক্তন এবং বর্তমান স্টুডেন্টরা যেভাবে আমাকে উইশ করে, এই আগষ্ট এর চৌদ্দ তারিখেও করেছে, আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। কিছু কিছু কমেন্ট আবেগে চোখে পানি এনে দেয়। টিচার স্টুডেন্টদের এই পবিত্র সম্পর্ক শুধুমাত্র বাবা মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের সাথেই তুলনা করা যায়।

স্টুডেন্ট আমার কাছে খুব আবেগের একটা নাম। যদিও কোন মেডিকেল কলেজে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি ( আলহামদুলিল্লাহ), কিন্তু কিছু স্কুল, কলেজের ভিডিও মনের উপর খুব চাপ ফেলছে সবার। বিশেষ করে স্ট্রোক করার ভিডিওটা। কোন টিচার অন্যায় করলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসন ব্যবস্থা নিক। স্টুডেন্ট টিচারের এই পবিত্র সম্পর্ক আজীবন পবিত্র থাকুক।

- Advertisement -

Read More

Recent