
সাবিনা ইয়াসমিনের বিখ্যাত একটা জিঙ্গেল ছিলো–আহা মিষ্টি কী যে মিষ্টি এই সুন্দর ছোট সংসার…। সিনেমা হলের জন্যে নির্মিত জন্ম নিয়ন্ত্রণের পিল ‘মায়া বড়ি’র ওপর শাদা কালো একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে জিঙ্গেলটি ব্যবহার করা হতো। রোজিনা (পরবর্তীতে নায়িকা) অভিনয় করেছিলেন তাতে। পুরুষ অভিনেতাটি অপরিচিত। রেডিওতেও দিনমান বেজে চলতো জিঙ্গেলটি।
প্রদর্শিত হতো বিটিভির পর্দাতেও।
এই জিঙ্গেলের সুরটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিলো। সাবিনা ইয়াসমিনের অপরূপ কণ্ঠমাধুর্যের কারণে আমার কাছে জিঙ্গেলটি প্রায় গানের মর্যাদাই পেয়ে গিয়েছিলো। মনের অজান্তেই গুণগুণ করে উঠতাম। তারপর আবিস্কার করতাম আশপাশের মুরুব্বি টাইপের লোকজনের বেদনাহত বিস্ময়দৃষ্টি! অভিভাবকদের কাছে গানটি গোপন বিষয়ের একটি প্রকাশ্য উপস্থাপনজনিত অস্বস্থির ব্যাপার ছিলো। মাঝে মধ্যে তাই ইচ্ছে করেই বাড়তি মজা পাবার আশায় গুণগুণ না করে উচ্চ কণ্ঠেই গেয়ে উঠতাম–আহা মিষ্টি কী যে মিষ্টি এই সুন্দর ছোট সংসার….মায়া আছে এ জীবনে আপন হয়ে/মায়া বড়ি খেতে পারি নির্ভয়ে/এই মায়া বড়ি খেলে রবে সাস্থ্য ভালো সবার…/কেটে যাবে এ জীবন হেসে খেলে/ সন্তান বেশি হবে না আর মায়া খেলে……।
গানের একটা অসাধারণ শক্তি হচ্ছে–প্রতিটি গানেরই কথা আর সুরের সম্মিলনে কিছু ইমেজ তৈরি হয়। সেই ইমেজ আবার একেকজনের কাছে একেকটি পরিবর্তিত রূপে আবির্ভূত হয়। গানে বর্ণিত আনন্দ বা বেদনা বা বিষাদের আবহটা ঠিক একই রকম থাকলেও পাত্রপাত্রী কিংবা পারিপার্শ্বিক আবহটা পরিবর্তিত হয়ে শ্রোতার নিজের পছন্দের ইমেজটি সেখানে মূর্ত হয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হচ্ছে–মেয়েদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের ‘মায়া বড়ি’র জিঙ্গেলটি শুনবার সময় কিংবা গাইবার সময় আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে কোনো ট্যাবলেট ক্যাপসুল বা নারীর ইমেজ অনুরণন তুলতো না। অনুরণন তুলতো–রসগোল্লা-চমচম-লালমোহন-কালোজাম-বুন্দিয়া ইত্যাদি নামের প্রিয় মিষ্টিগুলোর দুর্ধর্ষ অবয়ব!
ইন্টারনেটে ইধার-উধার ব্রাউজ করতে করতে আজ ধ্বংসাত্মক এই ছবিটা দেখে বুকের ভেতরটা কী রকম হাহাকার করে উঠলো! আশপাশে কে আছে না আছে তার তোয়াক্কা না করে বহুদিন পর আপন মনেই গেয়ে উঠলাম সত্তরের দশকের বিখ্যাত সেই জিঙ্গেলটা–আহা মিষ্টি কী যে মিষ্টি এই সুন্দর ছোট সংসার…।
অটোয়া, কানাডা
