অন্য আমি

অন্য আমি

দশ বছরের বাচ্চা ময়নার কথা তার আপা বিশ্বাস করেনি। ময়না বারবার বলেছে, দুলাভাই তাকে স্পর্শ করে। সেটা তার ভালো লাগে না। লাবন্য তার জবাবে বলেছে,“তোমার দুলাভাই তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তাই আদর করে ছুঁয়ে দেয়।”

ময়না সেদিন নানাভাবে লাবন্যকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তার এসব ছোঁয়া ভালো লাগে না। ভয় হয়। বুকের ভেতরটা কেমন করে? কিন্তু লাবন্য এসবে তেমন মাথা ঘামালো না। যার ফলে ময়না সিদ্ধান্ত নেয় সে আর আপার বাড়ি আসবে না।

- Advertisement -

বাড়িতে এসে ময়না মাকে জড়িয়ে ধরে। পারুল বেগম মেয়ের কপালে চুমু খায়। তারপর বলে,“কয়েকটা দিন আপার বাড়ি বেড়ানোর কথা ছিলো না? তা এত তাড়াতাড়ি চলে আসলি?”

ময়না জবাবে দুলাভাইয়ের বিষয়টা বলতে চায়, তখনি তার দাদি মনোরমা বেগম আসে। তিনি বলেন,“বৌমা পানি চেয়েছি সেই কখন, দিবা কবে?”

“আম্মা দিচ্ছি।”

এটা বলে পারুল বেগম পানি নিয়ে আসতে যায়। পারুল পানি নিয়ে এসে তার শাশুড়ীকে দিতে, তখন ঘরে পারুলের স্বামী কাশেম আসে। যেটা দেখে মনোরমা বেগম পানির গ্লাস ফেলে দেয়। তারপর বলে,“তিন ঘন্টা ধরে পানি চাইলাম৷ এখন পানি দিলা তাও ময়লাযুক্ত।”

পরক্ষণে ন্যাকাকান্না কেঁদে বলে,“দুনিয়া থেকে আমাকে উঠিয়ে নেয় না আল্লাহ। এই দিন দেখানোর জন্য আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজ তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পানিও পাই না।”

এটা শুনে কাশেম মোল্লা কোন বাধ বিচার না করেই পারুল বেগমকে একটি লাথি বসিয়ে দেয়। তারপর বলে,“তোর এতবড় সাহস আমার আম্মা পানি চাইছে, সেটা তিন ঘন্টা পর দিয়েছিস। আবার পানিতে ময়লা মিশিয়ে দিয়েছিস।”

এটা বলে কাশেম মোল্লা হাত পা দিয়ে যেভাবে পারছে পারুলকে আঘাত করে যাচ্ছে। মনোরমা বেগম বলে,“ছাড় বাপ ছাড়। বুড়ির খেয়াল রাখার কি দরকার? বৌমার কোন দোষ নাই। বুড়ি মানুষ আমি, আমাকে ময়লা পানি দেওয়ায় কি আর হবে?”

ময়না এসব দেখে কান্না করে দেয়। সে মা মা বলে কান্না করছে। কাশেম মোল্লা পারুলের চুলের মুঠি ধরে বলে,“তোকে খাওয়াই কি চেহারা দেখার জন্য? তুই আমার আম্মার যত্ন নিতে পারবি না। তয় তোরে আমি এই ঘরে কেন রাখবো।”

ময়না কান্না করে যাচ্ছে। পারুল কোনমতে বলে,“পানিতে কোন ময়লা ছিলো না। আর মাত্র দশ মিনিট আগে সে পানি চেয়েছে।”

“হয় হয় আমি মিথ্যাবাদী। আমারই দোষ। আমি কেন তোমার কাছে পানি চাইলাম।”

মনোরমা বেগমের আহাজারি দেখে কাশেম মোল্লার মারের পরিমান বেড়ে গেল। মারছে আর বলছে,“তুই আমার আম্মার নামে মিথ্যা অপবাদ দিস। তোর এত সাহস?”

ময়নার কাছে এটা নতুন কিছু নয়। প্রায় দিন এমন ঘটনা ঘটে তার বাড়িতে। তাই কান্না করা ছাড়া তার কোন উপায় নাই।

আবির মাহমুদ বলে,“সামান্য কারণে তোমার বাবা তোমার মাকে এভাবে মারতো?”

শেহা বলে উঠে,“তুমি তাদের কিছু বলতে না। বুঝানোর চেষ্টা করোনি কখনো?”

ময়না উপহাস করে হাসে। তারপর বলে,“গ্রামে এসব স্বাভাবিক বিষয়।”

“মানে?”

“খুবি স্বাভাবিক ঘটনা। নিত্য দিনের ঘটনা। আমি এই ঘটনাটি এজন্য বললাম, যাতে আপনারা বুঝতে পারেন আমি কোন পরিবেশে বড় হয়েছি।”

ময়নার এমন কথা শুনে আবির এবং শেহা একে-অপরের দিকে তাকায়। তারপর বলে,“সব পরিবারে শাশুড়ীরা এভাবে মিথ্যা বলে ছেলেদের কান ভাঙায়? বউদের এভাবে মার/ধর করা হয়।”

“না। সবাই বউদের উপর অত্যা/চার করে এমন নয়। এখানে পুরুষ মানুষটি যার পক্ষে রাজত্বও তার পক্ষে।”

“মানে?”
আবির বুঝতে পারে না। ময়না বলে,“যার স্বামী মা ভক্ত, তার মা তার স্ত্রীকে এভাবে অত্যা/চার করিয়ে মজা পায়। আর যার স্বামী স্ত্রী ভক্ত, সে শ্বশুড় শাশুড়ীকে না খাইয়ে মা/রে।

গ্রামে দু’টোই দেখা যায়। তবে আমাদের বিষয়টি হলো শাশুড়ীর রাজত্ব। আমার বাবা প্রথমত মা ভক্ত, দ্বিতীয়ত নেশায় আসক্ত। তাই আমার জন্ম হ’তে মায়ের উপর অত্যা/চার, নির্যাতন দেখে বড় হয়েছি। এটা আমাদের কাছে পান্তা ভাত। এসব পরিবারে আমাদের শেখানোই হয়, কান্না করা। সকল অত্যা/চার মুখ বুঝে মেনে নেওয়া। মেয়ে মানুষের প্রতিবাদ করতে নেই। তবে তার সম্মান যায়।”

“সব পরিবার এমন?”
শেহা কিছুটা ভাবনায় পড়ে যায়। ময়না বলে,“না। হাতে গোনা কয়েকটা পরিবার রয়েছে, যেখানে সত্যিকারের পুরুষ বাস করে। যে পরিবারগুলো সুখে শান্তিতে বসবাস করে। যাদের মধ্যে সমস্যা থাকলেও, সেটা জটিল নয়। কারণ তার পরিবারে সত্যিকারের পুরুষ বাস করে। যার পুরুষত্ব রয়েছে।”

“সত্যিকারের পুরুষ? পুরুষত্ব বলতে কাকে বুঝিয়েছো?”

আবিরের প্রশ্নটি শুনে ময়না কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে,“সেই পুরুষ। যে না মা ভক্ত, না স্ত্রী ভক্ত। যে নিজের বিবেক দিয়ে চিন্তা করে, তারপর সমাধান করে। যে বউয়ের সামনে স্ত্রীকে মৃদু শাসন করে। তারপর আড়ালে মা এবং স্ত্রী দু’জনকে বুঝায়। স্ত্রীর আড়ালে যে পুরুষের সামনে তার মা স্ত্রীর দোষ বললে, সে তার মাকে বোঝায় এটা ঠিক নয়। অন্যদিকে স্ত্রী মায়ের নিন্দা করলে তাকে শাসন করে। যাতে পরবর্তীতে সে এমন না করে। আমি সেই পুরুষকে বুঝিয়েছি। যার মাধ্যমে সংসারে শাশুড়ি, বৌমার মধ্যে মনোমালিন্য থাকলেও তার স্থায়ীত্ব বেশি হয় না।”

একটু থেমে ময়না পুনরায় বলে,“আপনার জীবনে আপনার মা এবং স্ত্রী দু’জনেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপনাকে দু’জনকে ব্যালেন্স করে চলতে হবে। তাদের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব আপনার।কারণ দু’জনে আপনার সবচেয়ে আপন মানুষ। একজনকে অগ্রাহ্য করে অন্যজনকে গুরুত্ব দেওয়া আপনার উচিত নয়। এটা আপনাকেই বুঝতে হবে। যেটা আমার বাবা কখনো বুঝেনি।”

ময়নার এই কথাটি শুনে শেহা তার পরিবারের কথা ভাবে। তার পরিবারে তবে তেমন পুরুষ নেই। কারণ তার বাবা তো তার মায়ের কথা শুনে সবসময় দাদা, দাদিকে অগ্রাহ্য করে। আবিরও বেশ গভীরভাবে ময়নার কথাটি ভাবে। ময়না পুনরায় তার গল্প বলা শুরু করে..

ছোটবেলা হ’তে বাবার মায়ের উপর অত্যা/চার। দাদির সব বিষয়ে মাকে দোষারোপ করা। এসব দেখে ময়না বড় হয়। তার কাছে এটাই নারীদের জীবন। মাঝে মাঝে ময়না পারুল বেগমকে জিজ্ঞেস করতো,“আচ্ছা মা, বাবা যে তোমাকে এত মারে তাও তুমি তাকে এত ভালোবাসো কেন?”
পারুল বেগম সহজ সরল মনে বলে,“এটাই নারীদের জীবন। স্বামীকে ভালো বাসবো না তো কাকে বাসবো?”

“তোমার ওসব অত্যা/চারের কথা ভাবলে কষ্ট হয় না? আমার তো দেখেই অনেক কষ্ট হয়, আর তুমি তো তার ভুক্তভোগী।”

“হয় কষ্ট। কিন্তু কি করার? মানুষটা পরিবর্তন হওয়ার নয়।”

“বাবাকে তুমি ছেড়ে দিতে পারো না? আমার তো মাঝে মাঝে বাবার উপর রাগ হয়, সে কেন তোমায় মারে? দাদির উপরও রাগ হয়। ইচ্ছা করে তোমাকে নিয়ে চলে যাই।”

পারুল বেগম ময়নার মুখে হাত দেয়। তারপর বলে,“এসব বাজে কথা বলতে নেই ময়না। বাবা হয় তোমার। বাবার উপর আবার কিসের রাগ? তাছাড়া স্বামী ছেড়ে দেওয়া ঠিক না। এটায় পাপ হয়। অনেক পাপ।”

সেদিন ময়নাকে তার মা এমন শিক্ষায় দিয়েছিলো। যার ফলে তার মধ্যে প্রতিবাদ করার ইচ্ছাটা আর জাগেনি। রাগ হয়, কষ্ট হয়। তবুও চুপ থাকে। কারণ তাকে শেখানো হয়েছে, এটাই জীবন। গ্রামের লোকজন একটি কথা সবসময় বলে। তাহলো,“যতই মাইয়া মানুষ পড়ালেখা করুক, যাই করুক। সেই তো পরের ঘরের গিয়ে উনুন জ্বা/লাতে হবে। স্বামীর সেবা করতে হবে। এটাই তো মাইয়া মানুষের জীবন।”

ময়নাও মেনে নিয়েছে এটাই জীবন। তখন তার হৃদয় তাকে এই প্রশ্ন করেনি, মেয়ে বলেই কি সব মেনে নিতে হবে? আল্লাহ মেয়েদের নরমভাবে বানিয়েছে বলে কি, তার নিজস্ব কোন ইচ্ছা নাই? তখন তার হৃদয় তাকে এমন কথা বলেনি। তখন তার হৃদয় তাকে বলেছে, সে নারী। নরম, কোমল হৃদয়ের নারী। যার একটা সময় বিয়ে হবে। স্বামীর কথা মেনে তাকে চলতে হবে। নারীদের গায়ে কলঙ্ক লাগা মানে বিশাল অপরাধ। কলঙ্কিনী হওয়ার চেয়ে জীবন বিসর্জন করা ভালো।কলঙ্কের দাগ শরীরে বহন করার চেয়ে নিরবে অন্যায় মেনে নেওয়া উত্তম। ময়নার পনেরো বছর বয়সে, সে এই কথাটি জেনেছে।

- Advertisement -

Read More

Recent