মধ্যবিত্তের চাহিদার বিকাশ এবং পণ্যবাজার

ছবিসিন পোলোক

মধ্য আফ্রিকার কোনো একটি দেশ যেমন কঙ্গো কিংবা উগান্ডার কথা যদি বলা হয় তবে কোন ছবিটি সবার আগে ভেসে ওঠে? এই প্রশ্নটি কয়েকজনকে করেছি। উত্তর এসেছে বনজঙ্গল, গরিলা, দিগম্বর উপজাতি, বন্যতা ইত্যাদি। যদি কোনো পশ্চিমা বিদেশীকে বাংলাদেশ সম্পর্কে (যিনি কখনো বাংলাদেশ ভ্রমণ করেননি) একই প্রশ্ন করা হয় তবে কি ধরনের উত্তর হতে পারে? পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারছেন। মিডিয়াতে নেতিবাচক সংবাদই সবসময় প্রাধান্য পায়। তবে আজ একটি পশ্চিমা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতে অন্য এক বাংলাদেশের কয়েকটি প্রেক্ষাপট তুলে ধরবো।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালন্টিং গ্রুপ সম্প্রতি বাংলাদেশের ভোক্তাদের উপর একটি জরিপ চালায়। ক্রেতাদের পছন্দ, ক্রয়ক্ষমতা, পণ্যের চাহিদা এবং মধ্যবিত্তের ক্রয়স্বভাবের নানা দিক এবং চমকপ্রদ সব তথ্য বের হয়ে আসে এই গবেষণায়। সারাদেশে দুই হাজার পরিবারের ওপর এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়।
গত দুই-তিন দশকে বাংলাদেশে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিকাশ লাভ করেছে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখ এবং যাদের আয় বছরে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ চার লাখ টাকা বা তার উর্ধ্বে। এবং আগামী এক বছরে প্রায় বিশ লাখ ভোক্তা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে প্রবেশ করবে। ধারণা করা হয় ২০২৫ সালের মধ্যে এই মধ্যবিত্তের সংখ্যা দাঁড়াবে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি। বর্তমানে মধ্যবিত্তের পরিমাণ মোট জনসংখ্যার সাত ভাগ। ২০২৫ সালে এই অনুপাত বৃদ্ধি পেয়ে হবে জনসংখ্যার ১৭ ভাগ।
অন্যদিকে দারিদ্র্যের হারও ক্রমশ কমছে। ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল জনসংখ্যার ৩১.৫ ভাগ যা ২০১৫ সালে হ্রাস পেয়েছে ২৪.৭ ভাগে। ২০২০ সালে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা যায়।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায় দারিদ্র্যের দুইটি ভাগ আছে। দরিদ্র্য এবং হতদরিদ্র্য। যেসব পরিবারের মাসিক আয় ১৫০ মার্কিন ডলার (১২০০০ টাকার নিচে) বা তারচেয়ে কম তাদেরকে দরিদ্র্য হিসেবে অবিহিত করা হচ্ছে। আর হতদরিদ্র্যদের আয় দিনে ২ মার্কিন ডলার বা তারচেয়ে কম। এটা প্রতীয়মান যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ, ব্র্যাক এর মাঝারী ঋণ, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে প্রায় ৯০ লাখ মহিলা এবং তাদের পরিবার চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি প্রবাসী শ্রমিক প্রতিমাসে গড়ে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রেরণ করছে। (সূত্র- বাংলাদেশ ব্যাংক)
অপরদিকে শিক্ষার হারও ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছে। ২০১০ সালে শিক্ষিতের হার ছিল ৬০ ভাগ, যা ২০১৫ সালে ৭০ ভাগে উন্নীত হয়েছে এবং ২০২০ সালে শিক্ষার হার ৭৫ ভাগে উন্নীত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ ভাগের মধ্যে উঠানামা করছে। ২০১৬ সালে এই প্রবৃদ্ধি ৭.০৫ ভাগ ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধির হার ৮.১ ভাগে উন্নীত হয়। ২০১৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ১,৪৬৬ মার্কিন ডলার যা ২০১৯ সালে ১,৯০৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। এছাড়া ২০১৯ সালে মাথাপিছু ক্রয় শক্তি সমতা দাড়ায় ৫,০২৮ মার্কিন ডলার। ফলে এই ধারা বজায় থাকলে স্পষ্টত বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার পথে।
তৈরি পোশাক রপ্তানীতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। এছাড়াও চামড়া শিল্প, ঔষধ এবং তথ্য প্রযুক্তি শিল্প বিকাশমান। ২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৪.২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানী করে (সূত্র- রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো)। ২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানী বা প্রবাসী প্রেরিত অর্থ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও (৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলার) সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে।
উপরোক্ত তথ্যগুলো পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বাংলাদেশে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমশ বিকাশমান। কিন্তু এই মধ্যবিত্তের সবার কি পণ্য বা সেবার চাহিদা কি সমান পর্যায়ের? মোটেই নয়। পন্য বা সেবার চাহিদা তখনই তৈরি হবে যখন ইচ্ছার সাথে আর্থিক সামর্থ্য যুক্ত হবে। পন্যের বাজার বোঝার জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কেট ম্যাট্রিক্স মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করেছে।
যাদের মাসিক আয় ৩২ হাজার থেকে ৫২ হাজারের (৬৫০ মার্কিন ডলার) মধ্যে রয়েছে তাদেরকে স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত বলা যায়। যাদের আয় ৫২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের মধ্যে তারা হলেন স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত। আর যাদের আয় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে তারা হলেন উচ্চ মধ্যবিত্ত।
স্থিতিশীল মধ্যবিত্তের পণ্যের চাহিদার তালিকায় শীর্ষে আছে কালার টিভি, রেফ্রিজারেটর, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি। অপরদিকে স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের চাহিদার তালিকায় আছে ইকনমি এপার্টমেন্ট, সিডান কার, ফ্লাট প্যানেল টিভি, রেফ্রিজারেটর, মাইক্রোওয়েভ, হোম এপ্লায়েন্স, স্কিন কেয়ার কসমেটিকস, প্যাকেজ ফুড, পারসোনাল কেয়ার পণ্য ইত্যাদি।
বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ভোক্তা গত দুই দশকে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রমশ ব্রান্ড সচেতন হয়েছেন। স্থিতিশীল এবং স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের কাছে বাটা, সিঙ্গার, ওয়ালটন, সিমফনি ইত্যাদি ব্রান্ড জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। অপরদিকে উচ্চমধ্যবিত্ত ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সনি, এ্যাপেক্স, স্যামসং ইত্যাদি ব্রান্ডকে পছন্দের তালিকায় প্রাধান্য দেন। এছাড়াও ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে শীর্ষ ব্রান্ডের তালিকায় রয়েছে লাক্স, স্কয়ার, প্রাণ, কোহিনূর, পারটেক্স, অলিম্পিক, নাবিস্কো, বাটা, এপেক্স ইত্যাদি।
উচ্চ মধ্যবিত্তের চাহিদা অনেকটা স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের মতই। তবে তারা সিডান কারের থেকে দামী ব্রান্ডের জিপ বা স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেইকেলের (ঝটঠ) প্রতি বেশি আকৃষ্ট। এমনকি অনেকে পরিবারের প্রয়োজনে একাধিক গাড়ি ক্রয় করেন। অভিজাত এলাকায় এপার্টমেন্ট কেনার প্রতি তাদের ঝোঁক রয়েছে।
স্বচ্ছল এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত উভয়ই বিনোদনের জন্য আয়ের একটি অংশ ব্যয় করেন। ছুটি কাটাতে পরিবারসহ বছরে এক বা একাধিকবার কোনো অবকাশকেন্দ্র বা রিসোর্টে যান। উচ্চ মধ্যবিত্ত গ্রুপের অনেকেই শীত, গ্রীষ্মে কিংবা ঈদের ছুটিতে সপরিবারে বিদেশে বিশেষত মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুর বেড়াতে যান। অন্যদিকে স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ভারত, নেপাল বা ভূটানকে অবকাশ যাপনের জন্য বেছে নিচ্ছেন। দীর্ঘ সপ্তাহ অন্তে কক্সবাজারের তারকাখচিত হোটেলগগুলো মধ্যবিত্তের ভিড়ে গমগম করে।
সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ৬৮ ভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭৫ লাখ লোক স্মার্টফোন ব্যবহার করেন এবং ৪৩ ভাগ অর্থাৎ ৪৮ লাখ লোক ল্যাপটপ ব্যবহার করেন। দৃশ্যতই বোঝা যায় যে, স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের একটা বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। সমীক্ষা বলছে, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ৬৬ ভাগ ব্যক্তি ইন্টারনেটে পণ্য বা সেবার খোঁজখবর নেন এবং ১৫ ভাগ অনলাইনে কেনাকাটা করেন। তার মানে রিটেলশপের পাশাপাশি একটি অনলাইন শপিংয়ের বাজারও গড়ে উঠেছে। তবে লক্ষণীয় যে, মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্রেডিটকার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে ক্রেডিটকার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র সাত লাখ।
মধ্যবিত্তের বিকাশের সাথে সাথে শহর বা নগরে বসবাসকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে নগরে বসবাসকারীর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ। এই উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রায় ৮০ ভাগ লোক বাস করে ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে। ২০২০ সালের পর মধ্যবিত্তের ব্যাপক উত্তরণ হবে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী এবং বগুড়ায়, আর দক্ষিণে বরিশাল আর খুলনা শহরে। অপেক্ষাকৃত ছোট শহরগুলোর মধ্যে লক্ষীপুর, গাজীপুর, ব্রাহ্মনবাড়িয়া, যশোর, টাঙ্গাইল এবং ঝিনাইদহে বিকাশ লাভ করবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৬ ভাগ, শিল্প ২৮ ভাগ এবং সেবা খাত ৫৬ ভাগ। বর্তমানে কৃষিখাতে কাজ করছে ৪০ ভাগ কর্মী, শিল্প খাতে ৩০ ভাগ এবং সেবা খাতে ৩০ ভাগ কর্মী। সরকার আগামীতে অবকাঠামো খাতে আরো অনেক বেশি বিনিয়োগ করছে। পরিকল্পিত একশোটি ইকনমিক জোনে গড়ে উঠবে বিবিধ শিল্প কারখানা। সেবাখাতও বিকাশমান। সেই কারণে শিল্প ও সেবাখাতে আরো অনেক বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ফলে আশা করা যায় বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য হ্রাস পাবে।
সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশের জনগণ বেশ আশাবাদী। প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ মনে করে তাদের আয় আগামীতে বৃদ্ধি পাবে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ৭০ ভাগ মানুষের ধারণা তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল। প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ মনে করে তাদের জীবন যাত্রার মান পূর্বের প্রজন্ম থেকে উন্নত হয়েছে এবং তারা এটাও বিশ্বাস করেন যে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনচারণের মান আরো সমৃদ্ধশালী হবে।
অন্যদিকে যদি পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দৃশ্যপট ভিন্ন। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে মাত্র ২৪ ভাগ মানুষ মনে করেন তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান বর্তমান প্রজন্ম থেকে উন্নততর হবে। ইউরোপ এবং জাপানের বর্তমান প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনমান নিয়ে আরো কম আশাবাদী। কারণ পশ্চিমা বিশ্বে তরুণ প্রজন্ম থেকে বয়স্ক প্রজন্মের সংখ্যা অধিক। অর্থাৎ পেনশনভোগীদের সংখ্যা বাড়ছে আর করদাতাদের সংখ্যা কমছে। তবে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং শিক্ষিত অভিবাসী গ্রহণের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। যদিও যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসনের পথ ক্রমেই কঠোরতর করছে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা (বয়স ২৫-৫৪) প্রায় ৪০ ভাগ, পৌঢ় এবং বয়স্কের সংখ্যা ১২ ভাগ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকসমূহ যেমন জিডিপির প্রবৃদ্ধি (৭.০৫%), বেকারত্বের হার (৪.৩%), মুদ্রাস্ফীতি (৫.৫%), ব্যাংক সুদের হার (<৯.৯%) ইত্যাদি উন্নয়ন সহায়ক এবং অনুকূল অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া সামাজিক সূচকে যেমন শিশু মৃত্যুর হার, গড় আয়ু, লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস এবং নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষিন এশিয়ার পাশ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। কিন্তু ধনী বা দরিদ্র্যের বৈষম্য দূরীকরণে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। এই বৈষম্য অচিরে হ্রাস করা না গেলে সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করবে যা সামাল দেয়া কঠিন হবে। আয় বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য কর ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রগতিশীল কর ব্যবস্থায় ধনী এবং উচ্চমধ্যবিত্তের আয়ের কর্তন থেকে যে অর্থ উত্তোলিত হবে তার একটি অংশ নিম্নআয়ের ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য ব্যয় করতে হবে। করের রিটার্ন দাখিল করলে যে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় এই অভিজ্ঞতা লাভ করলে করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা এক কোটির মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। অপরদিকে যেসব করদাতা বছরে পাঁচ লাখ টাকা বা তার বেশি কর প্রদান করবে তাদেরকে বিশেষ নাগরিক সুবিধা কার্ড প্রদান করতে হবে। এতে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত উভয়েই টিন (ঞওঘ) কার্ড সংগ্রহ করবে এবং কর রিটার্ন দাখিলের জন্য উৎসাহিত হবে।
পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোতে আয় বৈষম্য বাড়ছে বিপজ্জনক হারে। একটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিশ্বের ধন্যাঢ্য এক শতাংশ ব্যক্তিবর্গের কাছে বাকী পঞ্চাশ শতাংশ জনগণের সম্মিলিত আয় ও সম্পদের চেয়ে বেশি অর্থ এবং সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়ে গেছে। এটি আমাদের জন্য একটি বিপদ সংকেত। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণের মধ্যে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে তার অন্যতম কারণ হল কর্মসংস্থানের অভাব এবং আয় বৈষম্য।
প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং প্রয়োগের মাধ্যমে হয়তো নিম্নমধ্যবিত্তের সামাজিক সুরক্ষা দেয়া যেতে পারে কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে আয় বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের গিনি সহগ ০.৪৫ ভাগ যা সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মোটেও সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ৫০ হাজার এবং দরিদ্র্য লোকের সংখ্যা ৪ কোটির অধিক। সামাজিক স্থিরতা এবং ভোক্তা শ্রেণি তৈরি করার জন্য এটা কোনো সন্তোষজনক অনুপাত তো নয়ই বরং অস্বস্থিকর একটি বিষয়।
এজন্য কর ব্যবস্থা বিন্যাসের পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসার প্রসারকে প্রাধান্য দিতে হবে। সনাতনী মুনাফাভোগী কোম্পানি তৈরি করবে পুঁজিপতি আর সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে কর্মসংস্থান। নবীন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রনোদনা প্রদানের মাধ্যমে কয়েকটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
সামগ্রিক বিচারে গত এক দশকে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, শিক্ষার হার এবং মধ্যবিত্তের বিকাশে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অর্জন প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এতসব অর্জন এবং উন্নয়নের ধারা থমকে যেতে পারে কিংবা শ্লথ হয়ে পড়বে যদি প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্নীতি নির্মূল করা না যায়। ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া কঠিন হবে যদি আমাদের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে সঠিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা এবং পরিকল্পিত কারিগরী প্রশিক্ষণ দেয়া না যায়। জনবাহু তখনই সম্পদে পরিণত হয় যখন সেই বাহু হয় দক্ষ কর্মীর হাত। বর্তমানে এই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিশ্বায়নে টিকে থাকতে হলে মেধা এবং শ্রমের সমন্বয় ঘটানো অত্যন্ত জরুরী।
মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং পণ্যবাজারের প্রসার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এই মধ্যবিত্তের সংখ্যা যতই বিকশিত হবে দারিদ্রের হার ততই হ্রাস পাবে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষ জনশক্তির বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে।

- Advertisement -

Read More

Recent