
ইস্কন নিয়ে দেশে অনেক তোলপাড় হচ্ছে দেখলাম। ওদের নেতাকে (যাকে ওরাই কয়েক মাস আগে বহিষ্কার করেছিল) এরেস্ট করা হয়েছে, আদালতে নেয়া হয়েছে, এবং ওর ভক্তরা আদালত প্রাঙ্গনে হামলা চালিয়ে ভাংচুর এবং মানুষ খুনের ঘটনা ঘটেছে।
উনি নাকি প্রিজন ভ্যান থেকে সবাইকে শান্ত হতে বলছিলেন, কিন্তু কেউই পাত্তা দেয়নি।
এ থেকে কথা উঠছে, আসলেইকি কেবলমাত্র ইস্কনের সমর্থকরাই আন্দোলনে নেমেছিল? নাকি ওদের কাঁধে বন্দুক রেখে অন্য কেউ আন্দোলন করেছে? এর প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটবে, সবই যাবে সনাতন সম্প্রদায়ের উপর দিয়ে, মাঝে দিয়ে ওরা সফল।
এখন এই চিন্ময় প্রভুকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন:
যে লোকটা প্রকাশ্যে “গৃহযুদ্ধের” হুমকি দিয়েছে (“আমরা এসব প্রশ্রয় দিলে বাংলাদেশ হবে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার মত”), যে লোকটা প্রকাশ্যে “হিন্দুদের চাকরিচ্যুত করে দেশছাড়া করা হচ্ছে” (সূত্র: প্রথম আলো) ধরনের মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং উষ্কানীমূলক মন্তব্য করছে, ওকে এরেস্ট করায় সমস্যাটা কি আছে? আদালতে যাবে, যদি নির্দোষ হয়, বেরিয়ে আসবে। যদি দোষী হয়, তবে শাস্তি পাবে।
আচ্ছা, উনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার উপরে আরেক পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দেশকে অবমাননা করার অভিযোগে। যে মামলা করেছে, ওকেও বিএনপি পার্টি থেকে বহিষ্কার করেছে।
কিন্তু কথা হচ্ছে, এখানে ইন্ডিয়া কেন ইন্টারফেয়ার করবে? এ যেন ঠিক জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর সময়ে পাকিস্তানের মন্তব্যের মতন ঘটনা। ইন্ডিয়াতেতো কিছু নেতা এমনভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে যেন ওর আব্বুকে এরেস্ট করে ফেলেছে। তাহলে কি এই লোকটা ইন্ডিয়ার এজেন্ট? সাধারণ পাবলিকের মনে সন্দেহতো জাগবেই।
কথা হচ্ছে, এই লোকটাই কি সনাতন ধর্মের “ভগবান?” না। সে একজন মানুষ মাত্র, এবং মানুষের পক্ষে বদমাইশ হওয়া খুবই সম্ভব। একটা বদমাইশকে শাস্তি দিলে যদি “ধর্মের উপর আঘাত” হিসেবে ধরা হয় তাহলে আলকায়েদা, আইসিস ইত্যাদি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর উপর যখন হামলা করা হয়, আমরা কি তখন কান্নাকাটি জুড়ে দেই? মারধর করি? আমাদের দেশেইতো কত উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নাশ করা হলো। জেএমবি, বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমান এদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হলো। যারা নির্দোষ ছিল, ওদেরকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। সেটাইতো উচিত।
শ্রী কৃষ্ণের নামে যে সংগঠন চলছে, ওর নেতাকেতো বিতর্কমুক্ত একজন লোক হতেই হবে। যদি ধান্দাবাজ হয়ে থাকে, তাহলে ওকে কি সরানো উচিত না? আমি হিন্দু এবং ইস্কনের সদস্য হলে আমিই সবার আগে রাস্তায় নামতাম এই দাবিতে যে এই লোকটা এমন মন্তব্য করতে পারবে না, কারন সেটা আমার ধর্মের বিরুদ্ধে, আমার ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যায়।
আমি মুসলিম, তাই আমি আমার ধর্মের নামে চালানো যেকোন বাটপারের বিরুদ্ধে লিখি। আমাকে যারা চেনেন, তাঁরাতো জানেনই, যারা নতুন পড়ছেন, আমার অতীত রেকর্ড ঘাঁটতে পারেন।
একাত্তরে রাজাকারি করার অভিযোগে প্রমান সাপেক্ষে যখন সুন্নতি লেবাসের একেকজন “বুজুর্গ” নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হলো, আমরা কি ওদেরকে “ইসলামী নেতা” “আল্লাহর অলি” হিসেবে দেখেছি নাকি একাত্তরে নৃশংস ঘাতক হিসেবে গণ্য করেছি?
আমাদের দেশে করোনা চলার সময়েও মুফতি ইব্রাহিম ও আমির হামজাকে এরেস্ট করা হয়েছিল কারন উনারা করোনা নিয়ে মনগড়া মন্তব্য করে সাধারণ মূর্খ পাবলিককে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। অন্তত যতদূর আমার মনে পড়ে, এইটাই ছিল অভিযোগ।
আরও কিছু মুসলিম নেতাকেও নানান সময়ে এরেস্ট করা হয়েছিল। কাউকে কাউকে দেশে আসতে দেয়া হয়নি। জাকির নায়েকের মতন বিশ্বনন্দিত একজন ইসলামিক স্কলারকে বাংলাদেশে ব্যান করা হয়েছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে কুরআন তেলাওয়াত করা নিষেধ ছিল। মেয়েদের হোস্টেলে গরুর মাংস রান্না/পরিবেশন ইত্যাদি নিষেধ ছিল। হলে মসজিদে জোরে আজান দেয়া নিষেধ ছিল। ইত্যাদি ইত্যাদি বহু লম্বা তালিকা দেয়া যায়। ওসব বাদ দেই।
গ্রেফতার হওয়া মাওলানাদের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ ছিল, তারচেয়ে গৃহযুদ্ধের উস্কানি দেয়া বা মিথ্যাচার করে গন্ডগোল বাঁধিয়ে দেয়ার অভিযোগটাতো অনেক বেশি গুরুতর। তাহলে এখন হঠাৎ কি হলো যে সবার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে গেল?
মামুনুল হকের রিজোর্ট কেলেঙ্কারির সময়ে একটা কথা বলেছিলাম যা বাঙালির ব্যাপারে আমার জীবনের অন্যতম সেরা অবজারভেশন। সেটা হচ্ছে, “আমাদের ইসলাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(সঃ) ভিত্তিক না হয়ে হয়ে যাচ্ছে আলেম ভিত্তিক।” আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে নির্দেশনা পাঠিয়েছেন নিজের বাপও যদি অন্যায় করে থাকে, এমনকি নিজের বিরুদ্ধেও সাক্ষ্য দিতে হয়, তাহলেও আমরা যেন ন্যায়ের পক্ষে থাকি। কারন আল্লাহই ন্যায়।
তিনি মানুষকে ভুল করার ক্ষমতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। যেমন আদম (আঃ) নিষিদ্ধ বৃক্ষ আস্বাদন করে ভুল করেছিলেন, ভুল করেছিলেন ইউনুস (আঃ) নবীও – প্রতিটা নবীর জীবনী ঘাঁটাঘাঁটি করলে কিছু না কিছু ভুল ভ্রান্তি আমরা পাবই। ইসলাম ধর্মানুযায়ী একমাত্র “পারফেক্ট” হচ্ছেন আল্লাহ। আর কেউ নন।
তবে উনারা নবী রাসূল, আমাদের তুলনায় এগুলো অতি ছোটখাট ভুল। আর আমরা মানে সাধারণ মানুষদের যেন জন্মই হয়েছে পাপ করার জন্য। পাপের সমুদ্রে সাঁতরাতে সাঁতরাতে আমাদের লক্ষ্য থাকে কিছুতেই যেন ডুবে না যাই।
মোট কথা, মানুষ অন্যায় ও পাপ করবেই। সে পথের ফকির হোক, দেশের প্রধানমন্ত্রী হোক, বিশিষ্ট আলেম-উলামা হোক। এতে মোটেই অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী ও উনার লোকজন যদি হাজার হাজার কোটি টাকা চুরির ঘটনায় ধরা খায়, এতে যেমন দেশটা ভুয়া হয়ে যায়না, তেমনই একটা ধর্মীয় নেতা যদি শিশু বলাৎকারের মতন নিকৃষ্ট ঘটনায় হাতেনাতে ধরা খায়, এর অর্থও এই না যে ওর ধর্মটা ভুল বা মিথ্যা, এর অর্থ সেই নেতারা ও ধর্মগুরু নিজেরা পাপী।
আমেরিকায় খ্রিষ্টান গির্জাগুলোতে কয়টা শিশু বলাৎকারের ঘটনা ঘটে কেউ একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন, চোখ কপালে উঠে যাবে। ইন্ডিয়ার হিন্দু মন্দিরগুলোতেও এমন ঘটনাসংখ্যা প্রচুর। আমেরিকায় দুইদিন পরপর একেকটা লোক পয়দা হয় যে নিজেকে জিসাস ক্রাইস্ট বা আল্লাহর নবী দাবি করে। থাবড়ায়ে ওদেরকে লাইনে আনা হয়।
অথচ আমাদের দেশে আমরা অন্ধভাবে নেতা, পীর, পুরোহিতদের পূজা করি। জ্বি, ওদেরকে সুপার হিউম্যান, পাপ পুণ্যের ঊর্দ্ধে মনে করাকেই “পূজা” বলে। আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের লয়াল্টি কার প্রতি? আল্লাহ/ভগবান/ঈশ্বর/দেশ? নাকি নির্দিষ্ট মানুষ?
এখন আমার আশা থাকবে সনাতনী ভাই বোনেরা যেকোন উষ্কানীমূলক মন্তব্য শুনে বিশ্বাস করার আগে তথ্য ভ্যারিফাই করবেন। যেমন “বাংলাদেশের হিন্দুদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে” – শোনার পরে খোঁজ নিলে জানবেন সেই তালিকায় ৯১ জন চাকরিচ্যুত হিন্দুর বিপরীতে ১৬১জন মুসলিমের চাকরিও গেছে। অভিযোগ ছিল ওদেরকে গত সরকারের নানান সুপারিশের মাধ্যমে চাকরিতে ঢুকানো হয়েছিল। যদি শুধুমাত্র হিন্দুদের চাকরি যেত, তাহলে একটা কথা ছিল। মুসলিমেরও যেহেতু গেছে, কাজেই এখানে মূল কারন “ধর্ম” না, মূল কারন “আওয়ামীলীগ।”
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটা বলি, বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘুকে নিয়ে রাজনীতি দুনিয়ার প্রতিটা দেশেই খেলা হয়ে থাকে। আমেরিকাতেও। এইটা অতি পুরানো রাজনৈতিক ঘুঁটি যা সব দলই ব্যবহার করে, এবং কখনই একে হারাতে চায় না।
আমাদের দেশে যেমন, বিএনপি এক সময়ে বলতো “আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গেলে মসজিদ থেকে উলুর শব্দ আসবে।”
আর আওয়ামীলীগ বরাবরই বিএনপি জামাতকে হিন্দুদের শত্রু হিসেবে পরিচিত করে আসছে। বিএনপি জামাত ক্ষমতায় থাকাবস্থায় মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
তা আওয়ামীলীগ দেড়যুগ ক্ষমতায় ছিল, দেশের প্রতিটা সেক্টরে নিজেদের লোক ছিল, পুলিশ ওদের কথায় উঠতো বসতো, প্রয়োজনে মানুষ খুন করতো। এরপরেও একটা দুর্গাপূজা দেখান যখন দেশের কোথাও কোন প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেনি। আমারতো মনে পড়েনা। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হোক বা যাই ঘটুক, প্রতিটা দূর্গাপূজায় কোথাও না কোথাও প্রতিমা ভাংচুর বা সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছেই।
তাহলে কি বুঝলেন? জ্বি, “জোকার যদি মরে যায়, তাহলে ব্যাটম্যানের কি প্রয়োজন?” অন্ধকার না থাকলে আলোর গুরুত্ব কেউ বুঝেনা। তাই আলো নিজেই প্রদীপের নিচে অন্ধকারের আয়োজন রাখে।
এই বছর কি প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে? ঘটে থাকলে কয়টা? আমি ফেসবুকে দুয়েকটা পুরানো পোস্ট রিশেয়ার করে হাইপ তোলার ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া একটাও ঘটনা দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। শুনেছি গেল দুর্গাপূজায় আশি হাজারের বেশি ভলান্টিয়ার দেশের সর্বত্র পূজা মন্ডপ পাহারা দিয়েছে। হ্যা, কিছু ছাগল মন্দিরে গিয়ে ইসলামী গীত গেয়েছিল, ছাগলগুলিকে মুসলিমরাই ছাগ্লামির জন্য যথেষ্ট গালাগাল করেছে। আক্কেল থাকলে ওরা তওবা করে ফেলার কথা যে বাকি জীবনে গান গাইবে না। নিজের বিয়েতেও না।
এই সরকারের প্রধান ফোকাসই ছিল ইন্ডিয়া যেন কোন অবস্থাতেই “বাংলাদেশে হিন্দুদের মেরে ফেলছে” টাইপ প্রোপাগান্ডা না চালাতে পারে।
এ থেকে আমরা বুঝলাম, সরকার চাইলেই মন্দির বা মসজিদের দরজা থেকে কেউ একটা স্যান্ডেলও চুরি করতে পারবে না। ইচ্ছাটাই আসল।
এখন আপনারা যদি বুদ্ধিমান হন, তাহলে যা করবেন তা হচ্ছে যেকোন খবর শোনার সাথে সাথে বিশ্বাস না করে যাচাই বাছাই করবেন। যদি খবরটা সত্যি হয়, তাহলে অবশ্যই রিয়েক্ট করবেন। আর যদি খবরটা ভুয়া হয়, এবং সেই ভুয়া খবর প্রচারকারি কোন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতাও হয়, তাহলেও রিয়েক্ট করবেন যেন এমন ভন্ড, মিথ্যাবাদী, চালবাজ কেউ অমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে না পারে।
আর আল্লাহর ওয়াস্তে এমন কিছু করবেন না যে লোকজন আপনাদের use করতে পারে।
এই যে একটা মানুষকে মেরে ফেলা হলো, ওর অপরাধ কি ছিল? “উত্তেজনার বশে, আবেগের কারনে মেরে ফেলেছিলাম। কাজটা ঠিক হয়নাই।”
বুঝলাম আপনি অনুতপ্ত, তা এর প্রাণ ফিরায় দিতে পারবেন? তাহলে মারলেন কেন?
যাই হোক – আশা করি দেশে উস্কানিদাতাদের পাত্তা না দিয়ে সবাই যে যার অবস্থান থেকে সত্য বিষয়টা জানার চেষ্টা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিবেন। শুধু শুধু নিজের দেশে অশান্তি তৈরী করে আল্টিমেটলি লাভ লোকসান কার হয়?
