
রয়্যাল কানাডিয়ান মিন্ট কানাডীয় বিজ্ঞানীদের দ্বারা ১০০ বছর আগে ডায়াবেটিস চিকিৎসার ইনসুলিন আবিষ্কারের স্মরণে একটি নতুন দুই ডলারের মুদ্রা প্রকাশ করেছে। এই মুদ্রায় মনোরম ইনসুলিন অণুর একটি ব্লক, পাশাপাশি লাল রক্তকণিকা, গ্লুকোজ, ইনসুলিন কোষ এবং ইনসুলিনের প্রাথমিক গঠনে ব্যবহৃত উপকরণগুলি দেখানো হয়। এই স্মরণীয় মুদ্রার প্রচলন কানাডিয়ান সাফল্যের পিছনে প্রতিভাবান গবেষক ও উদ্ভাবকদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা এবং ধন্যবাদ জানানোর প্রয়াস।
উল্লেখ করা যেতে পারে, রয়্যাল কানাডিয়ান মিন্ট একটি ক্রাউন কর্পোরেশন, কানাডার প্রচলিত মুদ্রার উৎপাদন এবং বিতরণের জন্য দায়িত্ব সম্পন্ন। এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং বহুমুখী টাকশালগুলির মধ্যে অন্যতম, বিশেষায়িত উচ্চ মানের মুদ্রা পণ্য এবং এ সম্পর্কিত পরিসেবা সরবরাহ করে।
১৯২১ সালে কানাডীয় বিজ্ঞানীর ইনসুলিন আবিষ্কার, ২০ শতকের চিকিৎসাশাস্ত্রে আলোড়ন সৃষ্টিকারী স্মরণীয় উদ্ভাবন, যে উদ্ভাবন কানাডাসহ বিশ্বজুড়ে লক্ষ কোটি জীবন বাঁচিয়েছে।
বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক ব্যান্টিং, চার্লস বেস্ট, জে আর ম্যাক্লিয়ড এবং জেমস কলিপ টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ইনসুলিনকে বিচ্ছিন্ন ও শুদ্ধ করতে একসাথে কাজ করেছিলেন।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ও এ বছর ইনসুলিন আবিষ্কারের ১০০ তম বার্ষিকী উদ্যাপন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় একটি ইনসুলিন ১০০ বৈজ্ঞানিক সিম্পোজিয়াম হোস্ট করেছিল যেটিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ডায়াবেটিস গবেষকদের সমাবেশ ঘটেছিল এবং একটি অনলাইন প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইনসুলিন গবেষণার ইতিহাস সম্পর্কিত মূল নথিগুলির সংগ্রহকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
একদিনের মারাত্মক রোগ, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা, ইনসুলিন আবিষ্কারের ১০০ তম বার্ষিকী স্মরণ করে রয়্যাল কানাডিয়ান মিন্ট যে মুদ্রা প্রচলনের ব্যবস্থা করেছে, খুব শীঘ্রই একটি ইনসুলিন স্মরণীয় টুনি আপনার পকেটে প্রবেশ করবে। এই দুই ডলারের কয়েনগুলির মোট তিন মিলিয়ন, রয়্যাল কানাডিয়ান মিন্ট কানাডার বাজারে ছেড়েছে।
এই বৎসরটি কানাডিয়ান চিকিৎসাশাস্ত্রে ইনসুলিন উদ্ভাবন সাফল্যের ১০০ তম বার্ষিকী, এ উপলক্ষে বিশ্ববাসী তথা ডায়াবেটিস সংক্রান্ত গবেষকগণ, আক্রান্ত রোগী ও চিকিৎসকগন সবাই প্রভাবিত। আজ এবং প্রতিদিন, আমরা ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হিসাবে ইনসুলিন উদ্ভাবনের উদ্যাপন করবো।
আজ সারা বিশ্বে প্রায় ৪৬৩ মিলিয়ন ডায়াবেটিসের রোগী রয়েছে, কানাডাতে ১১.৫ মিলিয়ন এ রোগে আক্রান্ত। ১৯২১ সালে ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য ইনসুলিন উদ্ভাবনের পর এ নিয়ে আর কোন বিতর্ক নেই, সমগ্র বিশ্ব তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। ডায়াবেটিস এখন আর নির্ণয়ের অপেক্ষায় নয়, আক্রান্ত হলে চিকিৎসা বা জীবনের গুণমানই বিবেচ্য।
বলা যেতে পারে ইনসুলিনের উদ্ভাবন চিকিৎসাশাস্ত্রে কানাডার সব চাইতে মহৎ অবদান। এই আবিষ্কার প্রাচীন যুগের মারাত্মক রোগের বৈপ্লবিক প্রতিকারের আলো দেখিয়েছে এবং মিলিয়ন মিলিয়ন লোকের জীবন বাঁচিয়েছে। আজো যদিও ডায়াবেটিসের পূর্ণ আরোগ্য সম্ভব নয়, আমাদের প্রত্যাশা ভবিষ্যতে নব উদ্ভাবন পূর্ণাঙ্গ আরোগ্যের দ্বারও উন্মোচন করবে।
১৯২১ সালে যেমনটি প্রত্যাশা ছিল, গবেষণার ফলাফলে বিজ্ঞানীদল বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিল,
এবং তারা অনুমান করেছিলেন অসাধারণ কিছু উদ্ভাবনের প্রান্তভাগে এসে গেছেন, তাই তারা সীমাহীন উদ্যম নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিলেন।
এই নব উদ্ভাবন ও সন্ধানগুলি কেবল কানাডিয়ান চিকিৎসা বিজ্ঞান নয় সারা বিশ্ব জুড়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষের ডায়াবেটিস চিকিৎসার স্বর্ণদার খুলে দেয়। এই মহান জীবন পরিবর্তনের উদ্ভাবন কানাডাকে তার প্রথম নোবেল পুরস্কার অর্জনের সাফল্যে পৌঁছে দেয়। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্বজুড়ে ইনসুলিন আজ ডায়াবেটিস চিকিৎসার জন্য বেপক ভাবে ব্যবহৃত ও উপযোগী প্রতিকারক হিসাবে স্বীকৃত।
আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের এই অভিনব অর্জনকে সম্মাননা জানাতে ১৯২৩ সালে ফ্রেডারিক ব্যান্টিঙ ও জে.আর. ম্যাক্লিয়ডকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করাহয়। এখানে আরো বলে রাখা প্রয়োজন, এই উদ্ভাবনে গবেষকদলে চারজন থাকলেও দুইজনকে নোবেল দেয়া হয়, চার্লস বেস্ট তখন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং ফ্রেডারিক ব্যান্টিঙকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করতে দেয়া হয়েছিল তাকে, তাছাড়া জেমস কলিপ ছিলেন একজন রসায়ণবিদ তিনি ইনসুলিনের নির্যাস পরিশোধনে সহায়তা করেন। নোবেল পাওয়ার পর অবশ্য ফ্রেডারিক ব্যান্টিঙ প্রাপ্ত অর্থের অর্ধভাগ চার্লস বেস্টের সাথে সহভাগ করেন এবং ম্যাক্লিয়ডও একইভাবে জেমস কলিপের সাথে অর্থ সহভাগ করে নেন। এই নোবেল প্রাপ্তি আমরা সকল কানাডাবাসীর জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এ কারনে যে, আজ অবধি কানাডার সর্বমোট ১৯ বারের নোবেল বিজয়ের মাঝে ১৯২৩ সালের এই বিজয় ছিল সর্বপ্রথম।
ড. ফ্রেডারিক ব্যান্টিঙ এলিস্টন-অন্টারিওর এক কৃষকের সন্তান, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রী প্রাপ্ত হন ১৯১৬ সালে। তিনি প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে অংশ নেন, পরে সার্জারিতে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করে লন্ডন, অন্টারিওতে চিকিৎসা বৃত্তি আরম্ভ করেন, একই সময়ে ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীর বিজ্ঞানের শিক্ষক রূপে সাময়িক কাজেও নিযুক্ত হন। শিক্ষকতা করার সময় প্যানক্রিয়াস নিয়ে ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে পরিবেশ পরিপ্রেক্ষিতে তার মনে এক ধারণা জন্মায়, ফলশ্রুতিতে তার গবেষণা অগ্রগতি লাভ করে। এখানেই ডায়েবেটিস বা মধুমেহ রোগ চিকিৎসার আবিষ্কারের উন্মেষ ঘটে।
১৯২০ সালের ৩১ অক্টোবর ড. ফ্রেডারিক ব্যান্টিঙ এক তরুণ চিকিৎষক ও সার্জন কানাডার অন্টারিও প্রদেশে লন্ডন শহরে প্যানক্রিয়াস সম্বন্ধে বিশেষ কিছু তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। তিনি প্রথম কুকুরের প্যানক্রিয়াস নালী থেকে ক্ষরণ রোধ করে নিরীক্ষায় সম্ভাব্য ধারণা পেয়ে গবেষণা চালাতে থাকেন।
ড. ব্যান্টিঙ, ডায়েবেটিস বা মধুমেহ রোগের যে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেন তাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষকদের নিকট এক আলোক বর্তিকা বলে মন হয়। তখনই তাকে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকা হয় যেখানে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ অবারিত ছিল। কার্বোহাইড্রেটের রাসায়নিক রূপান্তর বিশেষজ্ঞ খ্যাতিমান জন রিকার্ড ম্যাক্লিয়ডের তত্ত্বাবধানে ব্যান্টিঙ ১৭ মে ১৯২১ সালে টরন্টোতে কাজ শুরু করেন । তাকে প্রশস্ত ল্যাব দেয়া হয়, নিরীক্ষা চালাতে কুকুর এবং সহকারী হিসাবে চ্যার্লস বেস্ট নামের একজন তরুণ ছাত্রকে সংগে সার্বক্ষণিক নিযুক্তি দেয়া হয় ১৯২১ সালের গ্রীষ্মে, আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে।
বিজ্ঞানীগণ এবার শান্তভাবে কাজ করতে থাকেন, লিওনার্ড নামের একজন রোগীর ওপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রারম্ভিক ভূমিকা প্রকাশিত করেন কানাডীয়ান ম্যাডিক্যাল এসোসিয়েশনের জার্নালে। গবেষকদল ৩ মে ১৯২২ সালে ওয়াশিংটন ডি. সি তে আমেরিকান চিকিৎসক এসোসিয়েশনের সামনে, “ডায়েবেটিকের ওপর প্যানক্রিয়াস নির্যাসের প্রভাব” এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং গবেষকদল এই প্রথম বার নির্যাসের নাম “ইনসুলিন” বলে অভিহিত করেন, যেটি লেটিন শব্দ থেকে নেয়া হয়েছে । এই প্রতিবেদনটিও ব্যান্টিঙ নিজে রচনা করেন। সেদিন উপস্থিত সকল গবেষক ও চিকিৎসকবৃন্দ উদ্ভাবনের সাথে ঐক্যমত পোষণ করে, এমনকি টরন্টোর কৃতি গবেষক দলকে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
কানাডীয় বিজ্ঞানীর ইনসুলিন ( একটি হর্মোন ) আবিস্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির উদ্যাপন উপলক্ষে টরন্টোতে যে নৈশভোজের আয়োজন হয় ১৯২৩ সালে, সেখানে একজন গর্বিত বিজ্ঞানী বলেছিলেন, “ ইনসুলিন আমাদের সবার গৌরব, সকলের জন্য মহিমা”। লক্ষ কোটি লোক বিশ্বব্যাপী যারা ডায়াবেটিসে ( বহুমূত্র বা মধুমেহ রোগ ) ক্ষতিগ্রস্ত বা যন্ত্রনা ভোগী তারা সবাই হয়ত নোবেল বা বৈজ্ঞানিক সাফল্যে মর্যাদার ব্যাপারে কৌতুহল-উদ্দীপক বা সচেতন নয়, তবে নিঃসন্দেহে তারা সবাই হয়ত মনে করে কানাডার এ চিকিৎসা উদ্ভাবনের ফলে তাদের রোগ মুক্তি বা উপশম হয়েছে। ইনসুলিন উদ্ভাবনের ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনে গুণমান ও উৎকর্ষ প্রতিভাত হয়েছে আজ থেকে শতবর্ষ আগে থেকে। চিকিৎসাশাস্ত্রে গবেষণা ও যথাসময়ের ফ্রেডারিক ব্যান্টিঙ ও জে.আর ম্যাক্লিয়ডের ১৯২১ সালের অবদান, যেটি ছিল এক অভিনব ও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন বা ইতিহাসের এক মহান কীর্তিস্তম্ভ।
টরন্টো, কানাডা
