খালি পেটেও সে সুখেই থাকে

খালি পেটেও সে সুখেই থাকে

আমরা যখন বাইরে কোথাও বেড়াতে যাই, যত সুন্দর দেশ/শহর/গ্রাম হোক, ফেরার সময়ে নিজ শহরের আকাশ সীমায় যখন প্লেন ঢুকে, মেঘের উপর থেকে নিচে পরিচিত কংক্রিট টাওয়ারগুলো নজরে আসে, মনে হয় যেন বুকটা হঠাৎ করেই ঠান্ডা হয়ে আসে। একই ঘটনা রোড ট্রিপের বেলাতেও ঘটে। রাস্তার সাইন বোর্ড যখন দেখায় ডালাস এত মাইল দূরে, বুকের ভিতর কাঁপন উঠে, কত দ্রুত সে দূরত্ব কমানো যায়!

ঘরে ফেরার অনুভূতির কাছে পৃথিবীর অন্য কোন অনুভূতির তুলনা হয় না। সোনার খাঁচায় বন্দি পাখির যতই যত্নআত্তি করা হোক না কেন, মুক্ত আকাশের নিচে খালি পেটেও সে সুখেই থাকে।

- Advertisement -

এখন এই অনুভূতিই কয়েকগুন বেড়ে যায় যখন বিমানের চাকা ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোঁয়। আহ স্বদেশ! যে দেশের মাটিতে আমার জন্ম, যে দেশের হাওয়ায় বেড়ে ওঠা, সেই দেশে ফেরার অনুভূতি যে কী সেটা বোঝানোর ক্ষমতা আমার অন্তত নেই। আবেগ তখন সব ধরণের বাঁধ ভাঙে, দুই চোখ ভিজে উঠে উষ্ণ জলে। বিমান থেকে বেরুতেই এয়ারপোর্টে একটা বোটকা গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা দেয়, অনেক অনিয়ম বিশৃঙ্খলা চোখে শুল হয়ে বিঁধে, রাস্তার ট্রাফিক জ্যামে ফুরিয়ে যেতে থাকে আয়ু, দূষিত বায়ু ফুসফুসে জ্বালা বাড়ায়; কিন্তু তারপরেও দেশে ফেরার অনুভূতির সাথে তুলনীয় কোন সুখানুভূতি মর্ত্যলোকে নেই। আমরা প্রায় প্রতিটা প্রবাসী মনে এই স্বপ্নই লালন করি যে একদিন সব দায়িত্ব পালন শেষে আমরা ফিরে যাব লাল সবুজের দেশে। একদিন সেই মাটিতেই মিশে যাব, ছড়িয়ে দেব বাতাসে আমাদের প্রাণের শেষ নিঃশ্বাস।

আমরা অনেকেই স্বাধীন দেশের মূল্য বুঝতে পারি না। আমের পোকা মিষ্টির স্বাদ আলাদা করে চিনতে পারেনা। অনেককেই বলতে শুনি, “স্বাধীন হয়ে কি লাভটা হয়েছে? এইটা নাই, ঐটা নাই,……..” ইত্যাদি ইত্যাদি নানান অভিযোগ। এখন যাদের পরাধীনতার সাথে কোন পরিচয়ই ঘটেনি তাঁরা কি করে বুঝবে এর কষ্ট?

তাঁদের জন্য কেবল দুইটি উদাহরণ দেব। নিজেদের তাঁদের স্থলে বসিয়ে নিন, তাহলে বুঝতে পারবেন নিজের দেশের একটি পতাকা, নিজের দেশের পাসপোর্টের মূল্য কী।

সেদিন ফেসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার হতে দেখলাম। রাত দেড়টা বাজে, এই সময়ে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনি এক পরিবারের বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। সেনাদের অভিযোগ, তাদের গায়ে এই এপার্টমেন্ট থেকে পাথর ছুড়ে মারা হয়, তারা দেখতে এসেছে এই বাড়িতে কে এই কাজটি করে। পাথর পাওয়া গেলে খবর আছে। বন্দুকের নল ঠেকিয়ে উঠিয়ে নেয়া হবে, কেউ কিচ্ছু করতে পারবেনা।

গৃহকর্তা ভিডিও করতে লাগলেন। দেখা গেল গভীর রাতে কোন বাড়িতে এসে সেনা সদস্যরা কিভাবে সেই বাড়ির মহিলাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে একে একে প্রতিটা শিশুকে কাঁচা ঘুম থেকে তুলে এনে প্রশ্ন করে। বুট পরে পুরো বাড়ি তল্লাশি চালায়। জিনিসপত্র হাতড়ে বেড়ায়। এবং এমন ঘটনা সেই অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। হাজার বছর ধরে যে অঞ্চলে যাদের আবাস, স্রেফ গায়ের জোরে তাঁদের তাড়িয়ে দিয়ে দখল করে নিচ্ছে একদল মানুষ। প্রতিবাদ করলে বোমা মেরে হত্যা করা হচ্ছে মানব সন্তান।

কিংবা বাড়ির পাশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। স্রেফ রোহিঙ্গা হবার অপরাধে যাদের নির্বিচারে হত্যা করে হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। লাত্থি, উষ্টা খেয়ে হলেও মাটি কামড়ে পরে থাকতে হচ্ছে বিদেশ বিভূঁইয়ে।

স্বাধীন দেশের মূল্য বুঝতে হলে ফিলিস্তিনিদের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন। রোহিঙ্গাদের সাথে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে দেখতে পারেন। সদ্য স্বৈরাচারমুক্ত সিরিয়ান নাগরিকদের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন। এরপর স্রেফ এইটা অনুভব করবেন যে ওদের সাথে যা ঘটছে, সেই বর্বরতা চালানো হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের সাথে। যাদের অনেকেই এখনও জীবিত আছেন। স্বাধীনতার মূল্য মাত্র নয়মাসে তিরিশ লক্ষ প্রাণ, লক্ষাধিক মা বোনের সম্ভ্রম, হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ, লাখো মানুষের শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, এই ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কাজ হবে আশা করি।

- Advertisement -

Read More

Recent