
আমি জানি, আপনি আমার সাথে আবার বসার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন। একজন রোগী আপনার কাছে একটা জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার পরামর্শ চাচ্ছে। খুন করার মতো একটা বিষয়ের। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে নতুন। কিন্তু জানেনই তো আপনাকে পে করার মতো টাকার অভাব আছে আমার। সেই টাকাটা রোজগার করতে কয়েকদিন সময় লাগলো।
আমি জানি, আপনার মনে এখন আমাকে নিয়ে হাজারো প্রশ্ন জমা হয়েছে, তাই না ডক্টর । আপনার কাছে হয়তো বিষয়টা মজারও ঠেকছে। এমন তো কখনো ঘটেনি যে আপনি পেশেন্টকে আরো সময় পেতে চাচ্ছেন কিন্তু পেশেন্ট নিজে থেকেই আপনাকে বলছে আজকের মতো অনেক হলো। বাকিটা আগামী দিন।
আমি জানি, আপনি আমাকে কল করেছেন। আপনার এসিস্টেন্ট সাহেবও আমাকে কল করেছে। আপনার এসিস্টেন্ট কিন্তু খুব হ্যান্ডসাম, তাই না? আমার কিন্তু এটাও একটা মজার দিক। মানুষকে পছন্দ করতে আমি পছন্দ করি। তবে আমি কিন্তু বেশিরভাগ মানুষকেই অপছন্দ করি। কারণ মানুষ মাত্রই স্টুপিড, বিরক্তিকর। বেশিরভাগ মানুষই ঠিক তাই।
তো, যখন আমি হ্যান্ডসাম কাউকে দেখি আমি তাকে উপভোগ করি।
তাই বলে এমনটা কিন্তু সবসময় ঘটে না।
আমি এখনো আপনার সম্পর্কে খুব একটা জানি না। তবে আপনাকেও আমার ভালো লাগতে পারে। আর তাছাড়া আমি আমার টাকা আপনার পেছনে খরচ করার সিদ্ধান্ত নেবার আগে আপনার বিষয়ে কিছুটা হোমওয়ার্ক করে এসেছি। আপনার পেশায় আপনার যোগ্যতা, আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড- এসব নিয়ে আমি বিশাল একটা গবেষণা করে এসেছি। কয়েকজনের কাছ থেকে আপনার চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়েও ফিডব্যাক নিয়েছি। এটা করেছি আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎকারটাকে ফলপ্রসূ করার জন্য।
তাই বলছি আপনার ভাগ্যদেবী আপনার উপর সহায় থাকলে আপনাকে আমার পছন্দ হয়েও যেতে পারে।
তবে স্বাভাবিকভাবে আমি প্রথম দর্শনেই লোকেদের পছন্দ করে ফেলি। এটা কিন্তু লাভ এট ফার্স্ট সাইটের মতো কিছু না। অপেক্ষা করুন। আপনাকে আমার ভালো লাগলে সেটাও জানতে পারবেন। কারণ একজন ডাক্তার হিসেবে আপনাকে আমার ভালো লাগতেই হবে। নাহলে তো আপনার থেরাপি আমার কোনো কাজে আসবে না, তাই না?
আমি জানি, আপনি আমার সাথে বসার জন্য অস্থির হয়ে ছিলেন। কিন্তু ঐ যে বললাম না। আমার তেমন টাকাপয়সা নেই। আপনাকে সপ্তাহে একবার পে করার মতো সামর্থ্য হয়তো আছে তবে প্রতিদিন পে করে আপনার সাথে সেশনে বসার কোনো সামর্থ্য আমার নেই। আমি কিন্তু আপনার ফি নিয়ে কোনো অভিযোগ করছি না। অথবা আমার জন্য আপনার মনে কোনো করুনার সৃষ্টি করতেও চাইছি না। করুনায় বিগলিত হয়ে আপনি আমাকে ফ্রিতে সেশন দিতে থাকুন সেটা কখনোই আমি মেনে নিতে পারবো না।
গত সেশনে আমার কথা শুনে আমাকে নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই। আমি কাউকে খুন করতে চাই এটা শুনে একটা ঘাবড়ে যাবারও কিছু নেই।
না, ভুল ভাববেন না। আমার মনের ভেতর এখনো সেই ইচ্ছেটা আছে। বহাল তবিয়তেই আছে। আমি এখনো তাকে খুন করতে চাই। এখন এই আপনার সামনে বসেই অনুভব করতে পারছি, তাকে হত্যা করার পর আমি যে কি ভীষণ শান্তি পাবো।
যাই হোক, অপনার কাছে এসেছি এটা বুঝে নিতে যে আমি আসলেই কাউকে খুন করতে পারবো কি না। এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারটা আমি বাদ দিতে চাই না। আমার মনস্থির করার আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহেই আমি আপনার সাথে বসতে চাই। আপনার সাহায্যে ব্যাপারটা আমি বুঝে নিতে চাই।
এর মানে কিন্তু এই না যে হঠাৎ একদিন আমি অদৃশ্য হয়ে যাবো আর আপনি আমাকে সংবাদপত্রের পাতায় খুঁজে পাবেন। যাতে আমার নামের পাশে বড়ো করে লেখা থাকবে- খুনি। এখন অবশ্য কেউ সংবাদপত্র পড়ে কি না জানি না।
আমি যখন উপসংহারে পৌঁছাবো মানে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবো তখন আপনাকে সেটা জানিয়ে তবেই কাজে নামবো।
তবে আমি কী সিদ্ধান্ত নেবো সেটার এখনো কোনো ঠিক নই। আমি অত্যন্ত খোলা মনের মানুষ। আপনার কাছে কোনো যন্ত্র থাকলে আপনি আমার ভেতরটা স্ক্যান করে দেখতে পারেন। আমি ভেতরে কিছুই লুকিয়ে রাখি না। আর একবার কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললে সেই কাজটা আমি করবোই করবো। আপনার মতামতও আমাকে তখন থামাতে পারবে না।
তো, আমি যদি ঐ মানুষটাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেই, তবে আমি সেটা করবোই, করবো। আর সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমি কখনোই পুরো ঘটনাটা আপনাকে বলবো না। আপনি কেবল আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পরেই সবকিছু জানতে পারবেন। আমি তখন আপনাকে জানাবো যে, আজকে আমাদের শেষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট । তারপর যদি আপনি আমাকে সংবাদপত্রে দেখতে পান, তাহলে বুঝে নেবেন যে আমি আমার খুনের সিদ্ধান্তে অটুট ছিলাম। আর যদি আমার কোনো খবর না পান তাহলে বুঝে নেবেন যে আমি আমার সাধারণ জীবনে ফিরে গেছি আর সেই শুয়োরটাকে বেঁচে থাকতে দিয়েছি।
যেটাই করি না কেন তাতে অবশ্য আপনার কোনো দায় থাকবে না। আমি জানি আপনাদের মানে ডাক্তারদের এক সেট ইথিকস আছে, যা আপনাদের মেনে চলতে হয়। আবার এটাও তো ঠিক যে আপনাদের কাছে রোগীদের সকল কনফেশন গোপন রাখতে হয়।
আমি কি ঠিক বলছি?
আবার কয়েনের উল্টো পিঠ বিবেচনা করলে বলতে হয়, আপনি যদি মনে করেন আমার দ্বারা কারো জীবন হুমকির সম্মুখীন হয় তবে তাকেও রক্ষা করা আপনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, তাই না?
কিন্তু আপনি তো এখনো জানেন না যে আমি কাকে মারতে যাচ্ছি। এই অবস্থায় পুলিশের কাছে গেলে তো আপনার কিছু বলারও থাকবে না। আপনি তো তার নামও জানেন না। সে আছে কি নাই সেটাই আপনি জানেন না।
আমি বুঝাতে চাচ্ছি এখানে একটা মেয়ে এসে আপনাকে বলছে যে সে একজনকে খুন করতে চায়। আপনি জানেন সে কেউ একজনকে খুন করতে চায়, কিন্তু কাকে খুন করতে চায় সেটা জানেন না। এই অবস্থায় কি ঝুঁকি নিয়ে আপনি পুলিশের কাছে যাবেন একজন বাইশ বছর বয়সী যুবতীর একটা ইলিউশনের কথা পুলিশকে বলতে? আপনি কি পারবেন এমন বোকামী করতে?
এভাবে কি আপনি কাউকে সাহায্য করতে পারবেন?
আচ্ছা আমরা বরং একটু কল্পনা করি, আপনার বিবেক আপনাকে বললো যে আমার এই খুন করার ব্যাপারটা পুলিশের সাথে শেয়ার করা উচিত। পুলিশকে গিয়ে আপনার বলা উচিত যে, আপনার এক পেশেন্ট কেউ একজনকে মেরে ফেলতে চায়। এই বিষয়টা নিয়ে এগুবার জন্য তারা তখন আপনার কাছ থেকে আরো বিশদ জানতে চাইবে। আপনি তখন আমার নাম ছাড়া আর কিছুই জানেন না। তখন পুলিশ এসে আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে আমি সেটা পুরোপুরি অস্বীকার করবো। যদি পুলিশ আমাকে ইনভেস্টিগেট করা শুরু করে তখন নিচের যে কোনো দুটো অপশন থেকে আমি একটা বেছে নেবো-
১. আমি বলবো যে আমি একজন মানসিক রোগী। মানসিক ভাবে অসুস্থ অবস্থায় আমি কাকে কী বলেছি কিছুই মনে করতে পারছি না। আর তারপর থেকে আমি খুব ভালো একটা মানুষ হয়ে দিন যাপন করতে থাকবো। জানেনই তো, অন্যরা আমাকে খুব ভালো একটা মেয়ে মনে করে।
২. অথবা, আমার পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাবো আর সেই মানুষটাকে খুন করবো। পুলিশ যখন জেনেই ফেললো তখন আমার আর কী-ই-বা করার থাকতে পারে?
আপনার হাতে কিন্তু আরেকটা অপশন আছে। আপনি এমন হীন একটা কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিতে আমাকে সাহায্য করতে পারেন।
তবে আমি যখন সেই হীন মানুষটি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত বলবো তখন আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন যে আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটাই সঠিক। তবুও হয়তো আপনি আমাকে এ বিষয় নিয়ে আর না এগুতে বলবেন।
তাই আমি আবারো জিজ্ঞেস করছি ডক্টর, আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন?
ওকে, ফার্স্ট থিং ইজ ফার্স্ট।
আপনি আামাকে জিজ্ঞেস করছিলেন কেন আমি আপনার দেয়া টেস্টগুলো করাচ্ছি না। কারণ আমি এসব পরীক্ষার ভেতর দিয়ে আগেই গিয়েছি। আমি যখন আরো ছোটো ছিলাম তখন আমাদের গোটা পরিবারের সকল সদস্যকে এসব পরীক্ষা করানো হয়েছিল।
আমার মনে হয়েছে এ কথা বললে আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। তাই আমি পরীক্ষার সকল রিপোর্ট আজ সাথে নিয়ে এসেছি। আপনি এগুলো আপনার কাছে রেখে দিতে পারেন। এগুলো ধীরে সুস্থে চেক করে দেখতে পারেন। আমার কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তাররা আমার মধ্যে কোনো সমস্যা খুঁজে পাননি। আর এজন্যই আমি নিজেকে সবসময় সুস্থ বলে দাবী করি।
যখন তারা বললো যে, আমাদের সবাইকেই পরীক্ষাগুলো করাতে হবে। শুধু মাত্র মাধবীর পরীক্ষা করলেই হবে না।
মাধবী?
আপনি হয়তো জানেন না, মাধবী আমার মা। না, মাধবীকে আমি কখনো মা বলে ডাকি না। কারণ সে কখনো আমার মা হতে পারে না। তার সে অধিকার ছিল না। সে হয়তো অনেক কিছুই হতে পারে কিন্তু সে কখনো আমার মা হতে পারেনি।
পৃথিবীর সবাই মা হতে চায়। মা কিংবা বাবা। সবাই মনে করে যে, সে মা হতে পারবে অথবা বাবা হতে পারবে। তারা মনে করে তাদের বাবা বা-মা হবার অধিকার আছে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে ভিন্ন। বাবা কিংবা মা হওয়া অতো সোজা কিছু না।
