
কন্ট্রাক্টরের ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার এসেছিলো দেখা করতে। ইয়াং ছেলে। চেহারা দেখেই বুঝলাম দেশী। তবে সুঠাম দেহের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলে দেয় সে বাংলাদেশী নয়। কানাডায় দেশী/Desi বলতে সাতচল্লিশ পূর্ব ভারতবর্ষের সকল মানুষকেই বুঝায়। সাদা অঙ্গের লোকেরা যদিও Desi বলতে শ্রীলঙ্কা ও নেপালীদেরও অন্তর্ভুক্ত করে।
তরুণ প্রকৌশলী নিজ থেকেই নাম বললো, ইরতাজ। ইরতাজ আহমেদ।
কাজের কথা শেষে ইরতাজকে বললাম, তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো?
পাকিস্তান।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছো কোথায়? ইউইটি লাহোর? নাকি এনইডি করাচী?
আন্দাজে ঢিল ছুড়লাম। পাকিস্তান থেকে আসা সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রকৌশলী দেখেছি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি (ইউ.ই.টি) লাহোর থেকে পাশ করা। অনেক পুরনো ইউনিভার্সিটি। ১৯৬২ সালে আইউব খান দুটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন। একটি ঢাকা’র আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। দ্বিতীয়টি লাহোরের ইস্ট পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
প্রথমটির নাম হয় ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি। দ্বিতীয়টি হয় ওয়েস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্ম হয়। ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি হয়ে যায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি। বাংলায় নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তীতে ইংরেজী ‘টেকনোলজি’ বজায় রাখলেও বাংলায় ‘কারিগরি’ শব্দটি তুলে দেয়া হয়। ইংরেজির সংক্ষিপ্ত রূপ ’বুয়েট’ নামটি ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়।
অন্যদিকে পাকিস্তান নামের আগে পূর্ব বা পশ্চিম লাগানোর বৈধতা না থাকায় ওয়েস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি নাম বদলে ফেলে। ১৯৭২ সালে তাঁরা নাম দেয় ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি, লাহোর। ইউইটি লাহোর।
ইরতাজের গল্পে ফিরে আসা যাক। ইউইটি লাহোরের কথা বলতেই ও উত্তর দিলো, “না, আমি ইউইটিতে পড়িনি।
তাহলে কোথায় পড়েছো?
বুয়েটে।
উত্তর শুনে ভীষণ খুশী হলাম। বললাম, বাহ… তুমি তাহলে আমার দেশ ভালোই চেনো? আমার প্রিয় ঢাকা শহর নিশ্চয়ই চষে বেড়িয়েছো।
একটু মনেহয় ভ্যাবাচ্যাকা খেলো বেচারা। আমার কথার ঢঙে বুঝে উঠতে পারছিলোনা, হঠাৎ এমন মন্তব্য কেনো করছি?
ইরতাজের উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার জিজ্ঞেস করলাম, কোন বছর পাশ করেছো?
২০১৬ সালে। একটু কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বললো, তুমি কি বুয়েট চেনো?
কি বলো তুমি? দেশের সর্বপ্রথম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। আর আমি চিনবো না? পড়ার সুযোগ হয়নি এখানে। তবে একই শহরে বড় হয়েছি।
ইরতাজ মিনমিনিয়ে বললো, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। তুমি খুজদারে বড় হয়েছো বলে মনে হয়না।
খোঁজদার? এ আবার কোথায়? তুমি না বললে বুয়েটে পড়েছো?
জ্বী। বুয়েটে পড়েছি। এটি খুজদার শহরে। খোঁজদার নয়। বেলুচিস্তানের বিপদজনক একটি জায়গা। যখন তখন গোলাগুলি হয়। তোমাকে দেখে নিরীহ ভদ্রলোক মনে হয়। খুজদার শহরে টিকে থাকার মানুষ তুমি নও।
মাই গুডনেস…. আমিতো ঢাকা সিটির কথা বলছি। আমি বাংলাদেশী। ভেবেছি তুমি সেখানে পড়তে গিয়েছিলে।
না। পাকিস্তানের বাইরে পড়ার আর্থিক সঙ্গতি ছিলোনা। ইসলামাবাদ বা লাহোরের নামকরা ইউনিভার্সিটি গুলোয় ভর্ত্তি হতে পারিনি। পরে বুয়েটে চান্স পেয়ে খুজদার চলে যাই। বুয়েট মানে হলো “বেলুচিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি।”
তুমি কি পাঞ্জাবী?
না। আমাকে দেখে কি পাঞ্জাবী মনে হয়?
তোমার গড়নে একটা শহীদ আফ্রিদী ভাব আছে। সুতরাং পশতুন বা পাঠান হতে পারো। তবে বেলুচ নও এটা শিওর।
না। আমি কাশ্মীরি। জন্ম মোজাফ্ফরাবাদে। বাবার চাকরী সুবাদে বড় হয়েছি পাঞ্জাবের পিন্ডিতে।
মানে রাওয়ালপিন্ডি?
জ্বী।
ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি ক্যাপিটাল জোন ছেড়ে এতো দূরে খোঁজদার না খুজদারে পড়তে গেলে?
আগেই বলেছি, বড় ইউনিভার্সিটিগুলোতে সুযোগ হয়নি। তাছাড়া বুয়েটের রেসিডেন্স ফ্যাসিলিটিস খুবই ভালো। হলগুলো অত্যন্ত মর্ডার্ণ। খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা এবং ইন্টারনেট সুবিধার দিক থেকে তারকা মানের। থাকা সমস্যা হয়নি।
কিন্তু শহরে গোলাগুলির কথা বললে যে?
শহরে সমস্যা আছে। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা পন্থীদের অতর্কিত হামলা আছে। পাশে ক্যান্টনমেন্ট। কথায় কথায় আর্মি নেমে আসে। আবার এঁদের সামনেই অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ায় মানুষ।
বলো কি?
হ্যাঁ। জনসাধারণের কাছে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। নিত্যদিনের ঘটনা। কানাডার মানুষ এসব কল্পনাতেও আনতে পারবে না।
কেবল কানাডা কেনো! বাংলাদেশেও এমন খারাপ দৃশ্য কল্পনা করতে পারিনা। তো… খুজদারে কতোদিন ছিলে?
চার বছর।
জঞ্জালে ভরা শহরে চার বছরেই কোর্স শেষ হয়ে গেলো?
এ প্রশ্নে একটু অবাক হলো ইরতাজ। বললো, ফেল না করলে চার বছরই তো লাগার কথা।
বললাম, বিশেষ পরিস্থিতিতে ইউনিভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা হলে?
আমি কোনোদিন রুটিনের বাইরে বুয়েট বন্ধ হতে দেখিনি। অন্য ইউনিভার্সিটিকেও বন্ধ হতে দেখিনি।
বাহ্ এদিক থেকে তোমরা বেশ ভালো তো!
কেনো তোমাদের ইউনিভার্সিটি কি রুটিনের বাইরে বন্ধ থাকে? ইরতাজ জানতে চায়।
একটু থেমে রইলাম। কিছু বললাম না। কি বলবো? ছাত্র রাজনীতি? শিক্ষক হত্যা? আজ সকালেই আবরার হত্যার রায় দেখলাম। চেপে গেলাম আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাহিনী। পড়াশুনার চ্যাপ্টার ইস্তফা দিয়ে জানতে চাইলাম খুজদার বেলুচিস্তানের কোথায়?
বেলুচ রাজধানী কোয়েটা থেকে সোজা দক্ষিনে তিনশো কিলোমিটার। করাচির চারশো কিলো উত্তরে। রুক্ষ মরুময় জায়গা।
পপুলেশন কতো?
সবমিলিয়ে লাখ দুয়েক হবে হয়তো।
দুই লাখ লোকের শহরে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি। তাও ন্যাশনাল লেভেলের। খুজদারের জনগণ বেশ সৌভাগ্যবান।
খুজদারের ঐতিহাসিক গুরুত্ত্ব কিন্তু কোয়েটা’র চেয়ে বেশী। এটা ওদের প্রাপ্য।
কবে হয়েছে বুয়েট?
১৯৮৭ সালে।
এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসাবে তুমি কি গর্ববোধ করো?
প্রশ্নটা করে নিজেকে একটু বেকুব মনে হলো। সবাই তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ববোধ করে। ইরতাজের গর্ববোধ থাকবেই।
এক গাল হাসি দিয়ে বললো, বুয়েট আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান। আমি গর্বিত বুয়েটিয়ান। জীবনের সেরা সময় কাটিয়েছি সেখানে। পাকিস্তানীদের ছাত্রজীবন ছাড়া আছেটা কি? বাইরে গুলি চললেও ক্যাম্পাস শান্ত। পাশ করার পর বরং নৈরাজ্য দেখেছি। ধর্মীয় উগ্রবাদ, সামরিক শাসন, জন্মস্থান কাশ্মীর বর্ডারে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসন… নোংরা জাতীয় রাজনীতি, নোংরা উপ-আঞ্চলিক কূটনীতি…. ছাত্রজীবন শেষ হবার আগে অতোটা খেয়াল করিনি!!
শেষদিকে গলা ধরে আসে ইরতাজের।
হঠাৎ মনে হলো নব্বুই দশকে জন্ম নেয়া ছেলেটি কি একাত্তরের ঘটনা জানে? বেশীরভাগ পাকিস্তানিই তা জানেনা। জানতে দেয়া হয়না।
সাদা হার্ড হ্যাট মাথায় চড়িয়ে ডব্লিউএসপি’র লাল ভিজিটিং কার্ডটা ধরিয়ে দিলাম। বললাম, ইরতাজ যোগাযোগ রেখো। উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে আড্ডা হবে একদিন। পারলে বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত পাকিস্তানের ইতিহাসটা দেখে এসো।
ব্রাম্পটন, কানাডা
