
মাত্র কয়েকদিন আগেই আম্মা চলে গিয়েছেন। মন ভারাক্রান্ত। ছোট বোন শাহীন এসেছিল আম্মাকে শেষবারের মতো দেখতে। আমি কানাডা থেকে যাওয়ার পরে শাহীন ও তার দুই কন্যাকে নিয়ে বগুঢ়া গিয়েছি শাহীনের বাসায়। আমি আর শাহীন দুই ভাইবোন আম্মার কথা স্মরণ করে গল্প করতে করতে সহসাই কেঁদে বুক ভাসাই। শাহীনের বাসায় ঘুম থেকে ওঠেও হঠাৎ হঠাৎ কেঁদে উঠি। ঠিক এরকম সময়টায়ই খবর আসছিল লতাজির শারীরিক অবস্থা আশংকাজনক। বয়স হয়েছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের কথা ভেবেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম যে কোন ধরনের খবরের। ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ খবরটি রটে যায় পৃথিবীব্যাপী : লতাজির শারীরিক জীবনের অবসান। কিন্তু, সত্যিই কি লতাজিকে ভারত উপমহাদেশের মানুষ ভুলে যেতে পারবেন কোনদিন! তাদের কাছে কি লতাজির মৃত্যু বিশ্বাসযোগ্য আদৌ!
সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত মানবসন্তানের জন্ম হয়েছে আদিকাল থেকে, লতা মঙ্গেশকর তাদের সবার মাঝে অগ্রণী তালিকার অগ্রভাগে। সাক্ষাৎ মা সরস্বতীর মতো এমন এক পূর্ণ জীবনশিল্পীর সহাবস্থান তার যাপনে, যা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশকেও তিনি আশ্চর্য মহিমায় সুরের যাদু দিয়ে ভরিয়ে রেখেছেন। এমন শত শত গান আছে লতাজির কণ্ঠে- যার একেকটি গানের অতি ক্ষুদ্র মুহূর্তকণায় তাঁর কণ্ঠের কারুকাজ বিস্মিত করে রাখে। বাকরুদ্ধ করে দেয়। মনে হয় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুধুই ঐ বিশেষ কাজটিই শুধুই শুনি৷
একজন সাধক শিল্পীর জন্য সাফল্যের বা আত্মার যন্ত্রণাদগ্ধতাকে আরো মধুর যন্ত্রণার বিচলিত একান্ত অস্বস্তিবোধকে বাড়িয়ে দেওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য একটি পুরো জীবনই তুচ্ছ। অথচ, লতাজির কণ্ঠে এরকম কাজ, এরকম বিস্ময়কর ঐন্দ্রজালিক সুরবন্ধনের যাদু আছে শত-সহস্র! ভাবা যায়!
লতাজিকে পরিপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন, এরকম কেউ কি আছেন এই পৃথিবীতে; মানুষের নিখাঁদ মুগ্ধতা ও ভালোবাসা ছাড়া! আমার মনে হয়, এই মহাবিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু মহামূল্যবান সবই আরো মূল্যবান হয়ে ওঠে লতাজিকে সম্মান দেখিয়ে। তাঁকে ভালোবাসা প্রকাশ করে।
লতা মঙ্গেশকর : আমার জীবনকালের এক নিখাঁদ মুগ্ধতা ও ভালোবাসার নাম। ]
লতাজি
পৃথিবী বাঁধা একটি মাত্র সুরে,
এমনকি যত গ্রহ-নক্ষত্র আছে।
যতই তফাতে আলোকবর্ষ দূরে,
হীরা জহরত যা নিয়ে তারা বাঁচে।
হয়তো তারা সূর্যের কাছাকাছি,
হয়তো তাদের ভুবন ভরা আলো।
হয়তো সেখানে মুক্তোর নাচানাচি
হয়তো সেখানে কিছুই নেই কালো।
সেই গ্রহ নক্ষত্র এসে মাটির পৃথিবীতে,
আজকে তাদের একটি মাত্র খোঁজা।
মহাবিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভরা যার কণ্ঠ মাধুরিতে
হীরা জহরতে দেবে তাঁকেই শেষ পূজা।
টরন্টো. কানাডা
