
আলো বু পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কিছু কাজে বিকেলে গ্রামের বাড়িতে এসেছি। সন্ধ্যার পর পারিবারিক বৈঠক খানায় একটি বিচারে বসেছি। আলো বু আসামী। ভাইয়া আর আমি বিচারক। ভাবী অভিযোগকারী। আমার বড় বোন ও মেজ বোন দর্শক ও সাক্ষী। বাবা মা জীবিত থাকাকালীন সময়ে বড় চেয়ারটাতে সবসময় আলো বু’কে বসতে দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। আজ আলো বু আমাদের সামনে ছোট্ট একটা চৌকিতে বসেছেন। কারো দিকে তাকাচ্ছেন না। মাথা নিচু করে এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়ত কিছু একটা ভাবছেন। ভাবী শুরু করলেন, আলো বু’র বয়স হয়েছে!
উনি এখন আর তেমন কোন ভারী কাজ করতে পারেন না । “শুনেছি, উনি অনেক দিন থেকে এ সংসারে আছে। তেমন কোন কাজ না করলেও, তাড়িয়ে না দিয়ে, মানবিক কারনে থাকতে দিয়েছি। এখন উনি নিয়মিত ঘর থকে চাল ডালসহ বাসার বাজার সদায় চুরি করেন। এবার টাকা চুরি করেছে।” ভাবী একটু থেমে আবার শুরু করলেন। “বসিয়ে বসিয়ে বাড়ীতে চোর পালার কোন মানে নাই । ওনাকে বাড়ী থেকে না তাড়ালে আমি বাবার বাড়ি চলে যাব!” এটুকু বলে ভাবী থামলেন এবং রায়ের জন্য ভাইয়া ও আমার দিকে তাকালেন। ভাবীর অভিযোগ যে শতভাগ মিথ্যা সেটা বুঝতে পারি। ভাইয়াও বুঝতে পারে ।
কিন্তু কেউই ভাবীকে কিছু বলছি না। আলো বু আমার বাবার দূর সম্পর্কের ফুফু। সম্পর্কে আমাদের দাদী হন। আমরা সবাই তাকে আলো বু বলে ডাকি। বয়সে আমার বাবার থেকে সামান্য বড় । দুনিয়াতে আপন বলতে কেউ নাই। মা’র কাছে শুনেছি, আমার জন্মের ৩য় দিন থেকে আলো বু আমাদের বাড়ীতে আছেন। লঞ্চ ডুবিতে স্বামী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে মানসিক আঘাত পান এবং শ্বশুর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে আমাদের এক দূর সম্পর্কের চাচার বাড়িতে আশ্রয় নেন ।
আমার জন্মের পর মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। আমার অন্য তিন ভাই বোন ও বাবাকে রান্না করে খাওয়ানোর কেউ ছিল না। বাবার দূর সম্পর্কের এক চাচাতো ভাই যার বাড়িতে আলো বু থাকতেন, তিনি আমাদের দুর্দশা দেখে মা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রান্নার জন্য আলো বু কে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই থেকে আলো বু আমাদের পরিবারের একজন সদস্য । বুঝতে শেখার পর থেকে দেখে আসছি বাবা মা – দুজনেই আলো বু’কে খুব সমীহ করতেন , সন্মান করতেন।
আমাদের ঘরের যে কোন সিদ্ধান্তে বাবা সব সময় আলো বু’র মতামতকে প্রাধান্য দিতেন। এমনকি, মা কে ও দেখেছি কোন কিছুর দরকার হলে আলো বু’কে দিয়ে বাবার কাছে বলাতেন। কেন যেন বাবা আলো বু’র কথাকে সম্মান করতেন, ফেলে দিতে পারতেন না । একবার আমার বড় বোনের বিয়ে ঠিক হয়। বাড়ীতে বিয়ের আয়োজন চলছে। আমি তখন আলো বু’র ঘরে তার সাথে ঘুমাতাম। রাতের বেলা কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বড় আপা কাঁদছে। আলো বু’কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। সে কিছুতেই এ বিয়েতে রাজি না। এখানে বিয়ে দিলে সে বিষ খাবে। বড় আপা মা’কে অনেক বার বলেছে। মা একথাটা বাবার কাছে বলতে সাহস পান নি। বাবাকে রাজী করাতে, মা-ই বড় আপাকে আলো বু’র কাছে পাঠিয়েছেন ।
আলো বু কাপড় ঠিক করতে করতে বাবার ঘরের দিকে চললেন। ঘুম চোখে আলো বু’র কাপড় ধরে আমিও তার সংগী হলাম। আলো বু, বাবার রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে কাশি দিয়ে ডাক দিলেন। :ও কদম ( আমার বাবার নাম কদম আলী)। বাবা উঠে এসে দরজা খুলে আলো বু কে ভিতরে আসতে বললেন । “ মেয়ে কি পানিতে পড়ছে! মেয়ের বিয়ের বয়েস হয়নি। মেয়ে এমনও ছোট। সে এ বিয়েতে রাজি না। এখনই বিয়ে দেয়ার দরকার নাই । তাদেরকে না করে দে।” : “আচ্ছা না করে দেব।” এই বলে আব্বা একটা শার্ট পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাবা সেই রাতে ঘটক চাচাকে নিয়ে ছেলে পক্ষের বাড়ি গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়ে আসলেন। পরে অন্য জায়গায় ধুমধাম করে আপার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে দিলেন।
আপা এখন খুব ভালো আছেন। ভাবছিলাম সেই রাতের কথা মনে করে হলেও আপা আলো বু’র পক্ষে কথা বলবেন। কিন্তু না। তিনি ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বৃহৎ স্বার্থ ত্যাগ করতে চাইলেন না। আমার মেজ বোনের বর এ্যাকসিডেনট করে কর্মহীন দিনাতিপাত করছেন। আমি জানি আলো বু হয়ত তাকে সময় সময় কিছু চাল ডাল দিয়ে সাহায্য করেন। সেও দেখি চুপচাপ বসে আছে । আমি বুঝতে শেখার পর থেকে একমাত্র আলো বু ই ছিল আমার সকল আবদার পুরনের জায়গা। ছোট বেলায় রাতে ঘুমের মধ্যে বিছানাতে প্রাকৃতিক কাজ কাজ করে ফেলতাম। তাই আপারা কেউ আমাকে তাদের সাথে ঘুমাতে নিত না। ভাইয়াও নেয় নি। মা প্রায়ই অসুস্থ থাকেন।একা ঘুমাতে ভয় পাই। আলো বু’র সাথে আমার ঘুমের জায়গা হয়। আলো বু রাতের বেলা কয়েকবার ঘুম থেকে উঠিয়ে প্রাকৃতিক কাজ করিয়ে নেন। তারপরও মাঝে মধ্যে বিছানায় কাজটি করে ফেলতাম। আলো বু বিছানা ধুয়ে ফেলতেন। হাসি মুখে বলতেন, এটা নাকি তার দোষে হয়েছে।
রাতে আমাকে ঘুম থেকে জাগাতে ভূলে গেছিলেন। বিদ্যুৎ ছিল না। রাতে হেরিকেনের আলোতে পড়তে বসতাম। যাতে ভয় না পাই তাই আলো বু আমার পাশে বসে থাকতেন। পিঠে হাত বুলাতেন। কাপড়ের আঁচল দিয়ে মশা তাড়াতেন। হাতপাখা দিয়ে বাতাস দিতেন। যত অন্যায় করতাম না কেন আলো বু’র আঁচল ধরতে পারলে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না । মা মাঝে মাঝে বলতেন,” আলো বু আমাদের পরিবারের জন্য আলো হয়ে এসেছেন।” আজ আলো বু বয়সের ভাড়ে ন্যুজ হয়ে পড়েছেন। সবার প্রয়োজনে আলো বু পাশে ছিলেন। এখন আলো ফুরিয়ে গেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। তাই কেউ পাশে থাকতে চায় না। আলো বু আমদের পরিবারে আলো হয়ে আসার কিছু কারণ উল্লেখ করেছি ।
মা যে কারনে আলো বু’কে আমাদের পরিবারের আলো বলতেন তা আরো পরে জানতে পারি। ভাইয়া আমাকে বসত বলে অন্যদেরকে যেতে বললেন । সবাই চলে যাওয়ার পর, ভাইয়া বললেন, “ তোর ভাবী আলো বু’কে সহ্য করতে পারে না। অনেকগুলো কারণ আছে। সে যখন এ বাড়িতে বৌ হয়ে আসে, তখন বাবা মা দুজনেই জীবিত ছিলেন। তোর ভাবী দেখেছে বাবা মা যেকোন ব্যাপারে আলো বু’কে বেশী গুরুত্ব দিতেন। আমাকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে , একজন কাজের মহিলাকে এত গুরুত্ব দেয়ার কি আছে! এরপর বাবা মারা গেল। কয়েকদিনের ব্যবধানে মাও তার সংগী হন। তাদের অবর্তমানে আমিও বাবা মার মত আলো বু’কে যে কোন কাজে গুরুত্ব দিতাম। তোর ভাবী এটা মানতে পারত না। একদিন আলো বু’র সামনে তোর ভাবীকে একটু শাসন করি। ব্যস ! সেই থেকে তোর ভাবী আলো বু’কে তাড়ানোর উপায় খুজছিল।
তোর ভাবীর করা অভিযোগ যে শতভাগ মিথ্যা এটা আমি বুঝি! কিন্তু শান্তিতে সংসার করতে হবে তো! এই টুকু বলে আবার শুরু করলেন। “এক কাজ কর, করম চাচার বাড়ী যা। তার বাডীতে আলো বু কে একটু রাখতে বল। খরচের জন্য মাসে কিছু টাকা দেব।” করম চাচা আব্বার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। যিনি আলো বু কে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে এসেছিলেন। করম চাচা আব্বার সাথে আমাদের ব্যবসা দেখতেন। তার ছেলেরা এখন শহরে থাকে। বয়স হয়েছে। এখন আর কাজ করেন না। এ বাড়ির প্রতিটি জায়গায় আলো বু ছোঁয়া লেগে আছে। আলো বু কে ঘিরে ছোট বেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল ।আমার শৈশবের খেলার সাথী, কৈশোরের বন্ধু। মধময় শৈশব উপহার দানকারী, তাকে এ বাড়িতে রাখা যাবে না। কিছু সময়ের জন্য ভাবনায় পড়ে গেলাম। সময়ের সাথে মানুষ পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন হয়।
আমিও কি সেই পরিবর্তনের পিছনে ছুটছি! আমি কি কিছুই করতে পারব না! নিজে এখনো সংসার শুরু করিনি । বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি এক মাস ও হয়নি। এখনো বিয়ে থা করি নি। কয়েক দিন আগে হল ছেড়ে ছোট একটা বাসা নিয়েছি। আলো বু কে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভাইয়ার মটর সাইকেল নিয়ে করম চাচার বাড়ির দিকে ছুটলাম। করম চাচা যেন আমার অপেক্ষায় ছিলেন। বসতে দিয়ে কিছু খাবার নিয়ে আসলেন। হাতে একটা পুরনো ফাইল। নিজেই শুরু করলেন। বুঝলা বাবা! মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র । আল্লাহ কার রিজিক কোথায় রেখেছেন কেউ জানে না । তোমারে কিছু সত্য জানানো দরকার। আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। মারা গেলে সত্যটা কখনো জানতে পারবা না।
আমি আগ্রহী হয়ে শুনতে চাইলাম। কি এমন সত্য! চাচা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে শুরু করলেন। তোমার জন্মের আগে, তোমাদের ছোট একটা ছনের ঘর ছিল। তোমার বাবা বাজারে কয়েকটা জুড়িতে কাঁচামাল বিক্রি করতো। কোন রকম তোমাদের দিন চলে যেত। তুমি জন্মের পর থেকে তোমার মা অসুস্থ । বিছানা থেকে উঠতে পারে না। তোমার ৩ ভাই বোন না খেয়ে থাকে । তোমার বাবা পড়ছে বিপদে। কাজ না করলে খাবার জুটে না।তোমার বাবা কি তোমার মা ও ভাই বোনের দেখাশোনা করবে নাকি আয় রোজগার করবে! সে সময় লঞ্চ ডুবে আলো ফুফু তার স্বামী ও দুই ছেলেকে হারিয়ে পাগলের মত পথে পথে ঘুরে বেড়াত। স্বামী নাই, সন্তান নাই । তাই তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে তাড়িয়ে দেয় ।
আপন কেউ না থাকাতে আমার বাড়ীতে থাকতে দেই। আমি তখন দিন মজুরের কাজ করতাম। দিন আনি, দিন খাই । আলো ফুফু আমাদের সাথেই থাকত। তোমার বাবা ও আমি ছাড়া আলো ফুফুর আপন বলতে তেমন কেউ নেই । আমরা না খেয়ে থাকলে , আলোও না খেয়ে থাকত। তোমার বাবার দূর্গতি দেখে আলো ফুফুকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যাই। তোমার বাবার সাথে কথা হয়, তোমার মা সুস্থ হলে, আলো ফুফুকে আবার আমার বাড়ীতে নিয়ে আসবো। তোমাকে পেয়ে আলো ফুফু তার দুই সন্তানের কথা ভুলে গেল। তোমাকে কোলে নিয়ে পিছনের সব স্মৃতি ভুলে গেল। তোমার মা একটু সুস্থ হলেও পুরোপুরি সুস্থ না। একদিন পত্রিকায় খবর এল, সরকার ও মালিক পক্ষ লঞ্চ ডুবির ঘটনায় মৃত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করবে।
ক্ষতিপূরণ বাবদ পরিবারকে প্রতি লাশের জন্য ১ লাখ করে টাকা দিবে। সে সময় ১ লাখ টাকা অনেক টাকা! আলো ফুফু তিন লাখ টাকা পেয়েছিল। তোমার বাবা আলো ফুফুর সাথে গিয়ে সেই টাকা তুলে আনে। আলো ফুফু সে টাকা দিয়ে ইচ্ছে করলে কিছু করতে পারত। জমি কিনে ঘর তুলে থাকতে পারত। আলো ফুফু সেই টাকা তোমার বাবার হাতে তুলে দেয়। তোমার বাবাকে ব্যবসা করার জন্য বলে। আলো ফুফু তোমাদের সাথেই থাকবে। বিশেষ করে, তোমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে রাজি না । তোমার বাবা বাজারে অনেক বছর ধরে কাঁচামালের ব্যবসা করত । সে ব্যবসা বুঝত। টাকা পেয়ে বাজারে মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করল। অল্প দিনে তোমার বাবা পরিচিতি পেয়ে গেল। সৎ ও ভালো মানুষ হিসেবে পাইকারি বাজারে পরিচিতি পেল। আমিও তোমার বাবার সাথে থাকতাম। তোমাদের ঘর হল। জমি হল।
এখন তো বাজারে তোমাদের অনেকগুলো দোকান । তোমার বাবা আলো ফুফুকে খুব সন্মান করত ও মান্য করতো। তোমার বাবা সেই সময়ে বাজারের দোকানটা আলো ফুফুর নামে দলিল করেছিল । আলো ফুফু তা জানতে পেরে সেটা তোমার নামে দলিল করে দেয়। যা আমার কাছে রেখে দেয়। তার বিশ্বাস , তুমি তাকে কোন দিন ফেলে দিবা না । আমার যে সম্পদ দেখ , এটাও আলো ফুফুর জন্য । তোমার বাবা মা মারা যাওয়ার পর আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়ে আলো ফুফুকে আমার বাড়িতে এসে থাকতে অনুরোধ করি । সে কিছুতেই তোমাদের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে রাজি না। বাড়ির সব জায়গায় তোমার স্মৃতি, তোমাদের সাথে তার স্মৃতি। মাঝে মাঝে আমি তোমাদের বাড়ি গিয়ে আলো ফুফুকে কিছু টাকা দিয়ে আসতাম। তুমি আসার কয়েক দিন আগে গিয়েছিলাম। তোমাদের বাড়িতে তার থাকতে কষ্ট হয় বুঝতে পেরে আমার সাথে নিয়ে আসতে চাইছিলাম। সে কিছুতেই রাজি হল না। তোমাদের বাড়িতে কষ্ট হয়। তাও কোথাও গিয়ে থাকতে চায় না । চাচা একটু থামলেন। কি বলবো, ভেবে পাচ্ছি না । এই বার বুঝলাম বাবা মা কেন আলো বু কে এত সন্মান করত! সেখান থেকে বাড়ী ফিরতে কিছুটা রাত হয়ে গেল।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো বু ঠিকই জেগে আছে । আমি খাচ্ছি। আলো বু চুপচাপ বসে আছে। আমি শুরু করলাম, তোমার জিনিসপত্র গুজগাছ করবা। আলো বু কোন কথা বলছে না। দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। অস্ফুট স্বরে বললেন,তোদেরকে না দেখে থাকব কি ভাবে! আমি জড়িয়ে ধরে বললাম, এখান থেকে না গেলে আমার কাছে থাকবা কিভাবে? কি বুঝল জানি না। শক্ত করে আমাকে ধরে আছে। পরম নির্ভরতায়। আমাদের মাঝে রক্তের কোন সম্পর্ক নেই । তারপরও মনে হল, এমন মধুর সম্পর্কের জন্য রক্তের বন্ধন প্রয়োজন হয় না । বাসায় তেমন কিছু নাই । সাত পাঁচ না ভেবে আলো বু কে নিয়ে পরদিন বেড়িয়ে পড়ি। আমার এক সহপাঠীকে পছন্দ করি। সেও আমাকে পছন্দ করে ।
আমি মূলত বাড়ী এসেছিলাম ভাই বোনের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে । ব্যপারটি নিয়ে কোন কথা হল না । আসমাকে কিভাবে ম্যানোজ করব ! বিয়ের পর আসমা যদি আলো বু কে আমাদের সাথে থাকা মেনে না নেয়। তাই আপাতত বিয়ের চিন্তা বাদ দিলাম। আসমার সাথে কথা বলার সাহস হল না। সপ্তাহ খানেক পর, একদিন বিকেলে আসমা আমার কর্মস্থলে হাজির । আমার ইতস্ততা দেখে আসমা আমাকে বাইরে নিয়ে এল। কেউ কোন কথা বলছি না। একটি দোকানে গিয়ে বয়স্কদের প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করল। আমি ভাবছি, হয়তো বাড়ির কারো জন্য কিনতেছে। দাম পরিশোধ করে বলল, চল লাল চাল কিনতে হবে। না থেমে বলতে লাগলো, আলো বু সাদা চালের ভাত খেতে পারে না । তা জানো না ! কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছিনা । আসমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি । কি দেখছ! ভাবছ আমি কিছু জানি না । আলো বু কে হয়ত তোমার মত করে ভালবাসতে পারব না । তবে তার কোন অযত্ন বা অবহেলা হবে না । আমাদের বিয়ে হয়েছে। বাচ্চার বাবা মা হয়েছি। মেয়ের বয়স প্রায় তিন বছর হতে চলল ।
আসমার একটা ট্রেনিং চলছে । মেয়েকে রেখে আসমাকে খুব সকালে বের হতে হয় । ফিরতে রাত ৮ টা বেজে যায় । মেয়েকে নিয়ে আমাদের কোন চিন্তা করতে হয় না। আলো বু আছে না। সে ই সব কিছু করে। পড়ন্ত বিকেলে, আলো বু ‘র রুম থেকে হাসির শব্দ আসছে । মেয়ে আর আলো বু হাসছে। উঁকি দিয়ে দেখলাম । দুজনের কারো দাঁত নেই । ফোকলা দাঁতে আলো বু কি জেন বলছে আর মেয়ে খিলখিল করে হাসছে । বলা শেষ করে দু জন মিলে হাসছে। এ হাসিতে কোন ভেজাল নাই। কোন চাওয়া পাওয়ার হিসেব নাই । একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, বিশ্বাস ও নির্ভরতার হাসি। আমার মেয়ের শৈশবটা তিক্ত বা কষ্টের হতে পারত। আলো বু আমার মেয়েকে একটা সুন্দর শৈশব উপহার দিয়েছেন।
আসলে, আলোরা এভাবে আসে। সলতের শেষ তেলটুকু দিয়ে কারো পরিবারে আলো জ্বালিয়ে এক সময় নিজেই অন্ধকারে হারিয়ে যায় । দুই দিন আগে, হঠাৎ করে আলো বু অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমার হাত ধরে খুব অনুরোধ করেছিল, সবাই মিলে কিছু দিনের জন্য আমাদের গ্রামের বাড়িতে থেকে আসি। আলো বু কে কথা দিয়েছিলাম। প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে আজকে সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। আলো বু কে সেখানে স্হায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছি । সাদা কাপড়ে মোড়ানো আলো বু’র দেহটার দিকে তাকিয়ে আছি। আর হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি ।”
