
চ্যানেল আইএর লাইভ টেলিকাস্ট শেষ হলে আমি আর মাযহার তথ্য কেন্দ্রের সামনে ভিড়ভাট্টায় আড্ডা দিচ্ছি। একটু পরেই মাযহার চোখে চশমা পরা একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এলো—রিটন এই মেয়েটা একটা ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার। তোমার লগে কথা কইবো মেলা আর তোমার বই লইয়া। অরে একটু সময় দেও।
মেয়েটা এগিয়ে এলো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিষ্টি করে হেসে মেয়েটা বললো—আমার নাম প্রভা। বলেই মিটি মিটি হাসতে লাগলো। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি কেমন আছো মা? মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে মেয়েটা জানালো সে ভালো আছে।
মেয়েটাকে আমার মা সম্বোধনে মাযহার খানিকটা ভড়কে গেলেও আমার নানান কিসিমের পাগলামির ব্যাপারে ওর কিঞ্চিত পূর্বধারণা থাকাতে খুব বেশি অবাক না হয়ে বরং ঘটনার মজাটা উপভোগের নিমিত্তে পাশেই অবস্থান নিলো সে। মেয়েটা ওর মাথায় কপালে গালে আর চিবুকে বাবার আদরটুকু গ্রহণ করে সাংবাদিকতায় লেগে পড়লো—এই মেলায় আপনার কি কি বই…
প্রমিতি প্রভা চৌধুরী নামের এই মেয়েটা প্রায় আমার মেয়ে নদীরই সমবয়েসী। ওর বাবা কাউসার চৌধুরী আমার বন্ধু। টেলিভিশনের একজন বিখ্যাত অভিনেতা কাউসার। প্রভা যখন আট ন’বছরের পিচ্চি তখন ওদের গ্রিণ রোডের বাড়িতে পুরো একটা দুপুর কাটিয়েছিলাম। অনেক মজা করেছিলাম সেদিন চশমা পরা হাস্যোজ্জ্বল বেণী দোলানো ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে। আমার সঙ্গে অনেক ভাব হয়ে গিয়েছিলো ওর। আড্ডা-টাড্ডা মেরে ফিরে আসবার সময়, যখন বিদায় নেবার পালা, তখন আমি একটা কাণ্ড করেছিলাম। হঠাৎ করেই বলেছিলাম—কাউসার দোস্তো আমার মেয়েটাকে খবরদার বকা-টকা দিবানা একদম। আর মারার তো প্রশ্নই ওঠে না। তোমাকে আমি আমার এই মেয়েটাকে দিয়ে দিয়েছি অনেক আদর করে ওকে বড় করবে বলে। মারধর করার জন্যে নয় কিন্তু। যদি সেরকম কিছু শুনি তাহলে কিন্তু আমি আমার মেয়েটাকে এসে ফেরত নিয়ে যাবো। বুইঝো কিন্তু।
কাউসার মজাটা উপভোগ করে বললো—আচ্ছা দোস্তো।
এরপর প্রভাকে কাছে টেনে আদর করে ওর মাথার চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিতে দিতে বললাম—যদি তোমার বাবা তোমাকে কখনো কাঁদায় জাস্ট আমাকে একটা কল দিও মামনি কেমন?
মেয়েটা বিস্ময়ভরা চোখে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো।
পরদিন সেলফোনে কল পেলাম কাউসারের—তুমি তো আমারে কঠিন বিপদে ফালাইয়া দিলা দোস্তো!
–আমি কখন কী করলাম?
–আরে মিয়া মেয়েটা তো আমারে বিশ্বাসই করতে চায়না যে আমি তার বাপ। সে তো তোমার কথারে সত্য মাইনা বইসা আছে। আমি যতোই বলি রিটন আঙ্কেল মজা করেছে তোমার সঙ্গে ততোই সে বলে রিটন আঙ্কেল মিথ্যে বলতে পারে না। সত্যি করে বলো তো বাবা তুমি কি আমাকে রিটন আঙ্কেলের কাছ থেকেই নিয়ে এসেছিলে?
টেলিফোনের এইপ্রান্তে আমি দুনিয়া কাঁপিয়ে হাসতে থাকি। অপর প্রান্তে বিপন্ন কাউসারের কাতর অনুনয়—দোস্তো তুমিই এই বিপদ ডাইকা আনছো এখন এই বিপদ থিকা আমারে উদ্ধার তোমারেই করতে হবে। কী ভাবে করবা জানি না। আরে কী বিপদ আদর করতে কাছে ডাকলেই মেয়েটা আড়ষ্ট হইয়া যায়। তোমার বিটলামিতে আমার তো লাইফ হেইল মিয়া। জলদি আসো অথবা আলাদা টেলিফোন কইরা ওরে বুঝাইয়া কও। আমি আমার মেয়ে ফেরৎ চাই, ওকে?
এর অনেক বছর পর, ২০০৭-এর এক বিকেলে, চ্যানেল আই-এর সিদ্ধেশ্বরী কার্যালয়ে আড্ডা দিচ্ছি মাযহার আর আমীরুলদের সঙ্গে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বন্ধু কাউসার চৌধুরীর ফোন এলো। ফোনে ওর উচ্ছ্বাসমাখা কণ্ঠ—দোস্তো, তোমার মাইয়াটারে এইমাত্র জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে এন্থ্রোপলজিতে ভর্তি করাইলাম। ন্যাও কথা কও ওর লগে।
অনেক আনন্দ নিয়ে কথা বললাম প্রভার সঙ্গে। আহারে কতো বড় হয়ে গেছে পিচ্চিটা! ওকে দেখতে না পেলেও বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিলো না যে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা মেয়েটার চোখেমুখে বিচ্ছুরিত হচ্ছে লজ্জা আর হাসিমিশ্রিত আভা। ওযে আমারই মেয়ে, কাউসারকে দিয়েছি আমি অনেক আদর আর যত্ন করে ওকে বড় করবে বলে, এটা তো সে জানেই!
পাঁচ বছর পর ২০১৩ তে সেই মেয়েটাই বইমেলায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমার ইন্টারভিউ করছে!
আমাদের বাপ-বেটির এই আদরবিনিময়ের নেপথ্য কাহিনিটুকু পৃথিবীর মানুষের কাছে অজানা থাকলেও মাযহারের কাছে প্রকাশ করে ফেললাম। মাযহার বললো—তুমি মিয়া জিনিস একটা…
আজ হঠাৎ করেই প্রভাকে খুব মনে পড়ছে। কেমন আছো তুমি প্রভা? বাবাটা তোমাকে অনেক আদর করে তো? কখনো বকা-টকা দিলে আমাকে তক্ষুণি একটা কল দেবে, ঠিকাছে?
অটোয়া, কানাডা
