
বাতাসে একটা বুনো গন্ধ ভেসে আসছে, গোধূলির আলো ম্লান হয়ে পড়েছে, শহরের ওপর ধূসর ছায়া নেমে এসেছে।
আরিবান তার স্টুডিওর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, সাদা রঙের পর্দাগুলো বাতাসে হালকা দুলছে।
গান বাজছে জেমসের “তোর প্রেমেতে অন্ধ হলাম”—মৃদু, বিষাদময়, অপার্থিব।
তার হাতের মুঠোয় ডাক্তার সেফির দেওয়া মেডিকেল রিপোর্ট। পাতাটা কিছুটা ভাঁজ হয়ে গেছে, তার হাতের চাপে।
“Liver carcinoma, final stage. Estimated survival: 4-6 months.”
তার ঠোঁটের কোণে এক ধরনের ক্লান্ত হাসি খেলে যায়। “চার থেকে ছয় মাস… সময়টা কি খুব বেশি?!?!”
সে চোখ বন্ধ করে।
তার স্মৃতিতে একটা দৃশ্য জেগে ওঠে—
তারা দুজন বসে ছিল। আকাশে জোছনা, চারপাশে সাদা নরম আলো।
নাযাফা তার কাঁধে মাথা রেখেছিল।
“আরিবান,” নাযাফা ফিসফিস করে বলেছিল, “আমাদের গল্পটা কেমন হবে!??”
আরিবান তার চুলে হাত বুলিয়ে বলেছিল, “যেখানে কেউ কখনো কাউকে ছেড়ে যাবে না।”
তখন আরিবান জানত না, তার শরীরের ভেতর সময়ের ঘড়ি টিকটিক করছে।
আর আজ!?!?
সে জানে।
এবং সে জানে, এই গল্পটা নাযাফার জন্য শেষ করতেই হবে। তাকে ঘৃণা করিয়ে, তাকে তাড়িয়ে দিতে হবে, যেন সে কখনো ফিরে না আসে।
যেন তার মৃত্যুর পর নাযাফার হৃদয়ে কোনো দুঃখ না থাকে, কেবল রাগ আর ঘৃণা থাকে।
কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে কি এত সহজে দূরে সরানো যায়?!?
========
নাযাফা স্টুডিওর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টি অনুসন্ধানী।
“তুমি কিছুদিন ধরে কেমন যেন হয়ে গেছ, আরিবান,” সে ফিসফিস করে বলে।
আরিবান তার হাত থেকে প্যালেটটা টেবিলে রাখে, রঙের দাগগুলো তার আঙুলে ছড়িয়ে পড়ে।
সে এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে বলে, “তোমার ভুল হচ্ছে, নাযাফা। আমি বদলাইনি, আমি আসলে সত্যিকারের আমি হয়ে উঠেছি।”
নাযাফার চোখ সংকুচিত হয়ে আসে। “মানে?”
আরিবান জানালার দিকে ফিরে যায়। বাইরে গাছের পাতাগুলো ভারী হয়ে আছে, যেন ঝড় আসতে চলেছে।
তারপর সে হেসে বলে, “ভালোবাসা আসলে কেবল একটা অলীক গল্প। একটা নিরর্থক শৃঙ্খল। আমি কখনোই তোমাকে ভালোবাসিনি, নাযাফা। তোমাকে আমার প্রয়োজন ছিল না, কেবল সময় কাটানোর জন্য ছিলে তুমি।”
নাযাফার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যায়।
“তুমি এইসব বলছো কেন, আরিবান!??”
আরিবান চোখ তুলে তাকায়। তার ভেতর হাজারটা কষ্ট লুকিয়ে আছে, কিন্তু মুখে যেন কিছুই নেই।
“কারণ সত্যিটা কুৎসিত। তোমাকে ভালোবাসার অভিনয় করতে করতে আমি ক্লান্ত। এবার মুক্তি চাই।”
ঘরটা নীরব হয়ে যায়। বাতাস থেমে যায়।
নাযাফা কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু গলায় কিছু আটকে যায়। অবশেষে, সে এগিয়ে আসে, হাত বাড়িয়ে দেয় আরিবানের দিকে।
কিন্তু আরিবান এক ধাপ পিছিয়ে যায়।
নাযাফার চোখে জল টলমল করে ওঠে, কিন্তু সে একটাও শব্দ করে না। শুধু শূন্য কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“তুমি আমার কল্পনার চেয়ে ছোট, আরিবান। আমি ভাবতাম, তুমি প্রেমের শিল্পী। কিন্তু তুমি স্রেফ একজন পুরুষ।”
তারপর, কোনো শব্দ না করেই, সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
========
পাঁচ বছর আগের এক বিকেল।
মেঘলা আকাশ। গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়ছে নদীর ওপর। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ, এক ধরনের মিষ্টি শীতলতা।
সেদিন বৃষ্টি ছিল, যখন প্রথমবার নাযাফাকে সে দেখেছিল।
কলেজের পুরোনো লাইব্রেরির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল নাযাফা। সে হালকা বেগুনী রঙের কামিজ পরেছিল, চুলগুলো অগোছালো, আর হাতের মধ্যে ধরা ছিল একটা পুরোনো বই—”শরৎসমগ্র”।
আরিবান তখন নিচের করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই তার চোখ পড়ল মেয়েটার দিকে।
সে বইয়ের পাতায় ডুবে ছিল, অথচ চারপাশের দৃশ্য তার সঙ্গে এক অপার্থিব সংযোগ যেন।
হঠাৎ বাতাসের সঙ্গে একটা ডাল নড়ে উঠল, আর গুটিকতক বৃষ্টির ফোঁটা সরাসরি গিয়ে পড়ল নাযাফার খোলা পাতার ওপর।
মেয়েটা বিরক্ত হয়ে চোখ তুলল। আর তখনই, প্রথমবারের মতো, তার দৃষ্টি আরিবানের সঙ্গে মিলল।
একটা মুহূর্ত, নিঃশব্দ, স্থির।
তারপর, নাযাফা হেসে ফেলল।
“আকাশের কান্না শুরু হয়েছে,” সে বলল মৃদু গলায়।
আরিবান তখনো তাকিয়ে ছিল, তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
“তুমি কি সবসময় এমন কাব্যিক কথা বলো!??”
নাযাফা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, যেন সে নতুন একটা রহস্য পেয়েছে তার সামনে।
“কেন, কাব্যিক কথা শুনতে ভালো লাগে না?!?!?”
“ভালো লাগে।”
“তাহলে এই বৃষ্টির মধ্যে আমাকে একটু চা খাওয়াতে পারো!??”
আরিবান অবাক হয়ে গেল।
এই মেয়েটা এমন কেন!?
আসলে নাযাফা এমিনই। হুট করেই জীবনের মাঝখানে ঢুকে পড়ে, একদম নিঃশব্দে, অথচ প্রবলভাবে।
“চলো,” সে বলল।
সেদিনের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে তারা শহরের এক পুরোনো চায়ের দোকানে বসে ছিল।
দোকানটা খুব ছোট, কাঠের বেঞ্চ, টেবিলের উপর পুরোনো কালি লেগে থাকা দাগ। কিন্তু সেই জায়গাটাই একধরনের উষ্ণতায় ভরা ছিল।
নাযাফা তার সামনে বসে, চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর মেয়েটা হাসছে— ঠিক একটা শরতের নায়িকার মতো।
“তুমি কি সত্যিই কবিতা ভালোবাসো নাকি গল্প!??” আরিবান জিজ্ঞেস করেছিল।
“গল্প ভালোবাসি। আবার আমি ভাবি, কবিতা ছাড়া জীবন আসলে কি!??”
“বাস্তবতা।”
“বাস্তবতা তো নিরামিষ। তার মধ্যে তো কোনো উন্মাদনা নেই!”
“তুমি উন্মাদনাকে ভালোবাসো?”
“ভালোবাসি। কিন্তু তারচেয়েও বেশি ভালোবাসি…”
নাযাফা একটু থামল।
“কি?”
“তোমার চোখের এই গাঢ় ভাবটা,” মেয়েটা হেসে বলল। “যেন তুমি হাজারটা গল্প জমিয়ে রেখেছো, অথচ কাউকে বলো না।”
আরিবান চুপ করে গেল।
সেদিনের সেই বিকেল, সেই কথোপকথন—সবকিছু তার মনে গেঁথে ছিল, যেন একটা সুর।
======
বর্তমান।
আরিবান ধীরে ধীরে চোখ খোলে।
আজ, এতগুলো বছর পরেও, নাযাফার সেই হাসিটা স্পষ্ট মনে পড়ে যায়। সেই বিকেলের চায়ের ধোঁয়া, তার গলার শীতল কণ্ঠস্বর।
আর আজ, সে জানে, সেই হাসিটা মুছে ফেলতে হবে।
তার জন্য নাযাফার মনে কেবল ঘৃণা থাকতে হবে।
যাতে, যখন সে চলে যাবে, মেয়েটা কাঁদবে না।
সে জানে, তাকে অনেক কঠিন হতে হবে। তাকে একটা শীতল, নিষ্ঠুর মানুষ হতে হবে।
যেন নাযাফা আর কখনো তার মুখ মনে না করে, যেন সে কখনো ফিরে না আসে।
বাইরে বৃষ্টি ঝরছে। আরিবান জানালার কাঁচে হাত রাখে, ঠান্ডা কাঁচে তার নিঃশ্বাস জমে ওঠে।
এই গল্পটা শেষ করতে হবে।
নাযাফাকে বিদায় বলতে হবে।
তবে ভালোবাসা দিয়ে নয়—
ঘৃণা দিয়ে।
