
বাংলাদেশে ধর্ষণ একটি ক্রম বর্ধমান সামাজিক সমস্যা। অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে হঠাৎ করেই নারী নিপীড়ন বা ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে একথা যারা বলেন, তারা বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের কথা বেমালুম চেপে যান। এরা একচক্ষুদর্শী।
বিগত সময় নারী নিপীড়ন ও ধর্ষন হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের অংগসংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারাও । এরও আগে ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জসিমউদ্দিন মানিক ধর্ষনের সেঞ্চুরি করেছিলেন। ধর্ষন সেঞ্চুরির পর মানিক দলবল নিয়ে ক্যাম্পাসে সেলিব্রেট করেছে।
পরবর্তীতে শুধু ছাত্রলীগ নয়, সারাদেশে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ ছিল। অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। মহিলা যুবলীগের নেত্রী পাপিয়া ওয়েস্টিন হোটেলে সুন্দরী নারীদের দিয়ে দেহব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি সমাজসেবা ও গাড়ি ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হন। উল্লেখ যে, পাপিয়া নরসিংদী জেলা যুবমহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
আওয়ামী শাসনামলের ১৬ বছরের পুরো সময়জুড়ে জুয়া, ক্যাসিনো, মদ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম। কোন সুশীল,সংস্কৃতিজন কেউ তখন টু শব্দ করেনি।
আওয়ামী লীগের সোনার ছেলেদের নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের মহান কীর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেই।
২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেতাসহ দুজনের বিরুদ্ধে। আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা গেছে। এছাড়া অভিযুক্তকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে আরেক ছাত্রলীগ নেতা।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে এসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর হাতে গণধর্ষণের শিকার হন তাঁর স্ত্রী। সন্ধ্যার পর কলেজের প্রধান ফটকের সামনে থেকে নবদম্পতিকে তারা জোর করে গাড়িতে তুলে ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যায়। পরে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষেই ধর্ষণ করে তারা। পরে ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
২০২১ সালের ২০ এপ্রিল,বিয়ের আশ্বাস দিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণের করেন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন ।
২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি, স্কুলছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল বাদশা।
৫ জুলাই, ২০২৪ সালে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ হাওলাদার কলেজছাত্রী লোপা আক্তারকে (১৭) ধর্ষণের পর হত্যার করে।
২৪ জুন, ২০২৪ সালে ফেনিতে নিজ সংগঠনের নেত্রীকে ধর্ষণের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান স্পেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাঈল হোসেন রায়হান (৩৫)।
২২ মে ২০২৩ সালে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ছাত্রলীগ নেতা জয়ন্ত কুমার মোহন্ত দুই স্কুলছাত্রকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় থানায় মামলার এজাহার দিয়েছে ভুক্তভোগী দুই ছাত্রের পরিবার।
২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি,সাভারে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা সোহেল রানা গ্রেপ্তার হয়।
২০২৩ সালের ১৬ মে, টাঙ্গাইলের বাসাইল পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি সাকিব মিয়া ঘরে ঢুকে এক নববধূকে ধর্ষণ করে।
২০২৩ সালের ৭ জুলাই, মুন্সীগঞ্জের সরকারী হাসপাতালে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ভুক্তভোগীর পরিবারের।
২২ এপ্রিল ২০২১ সালে খাগড়াছড়ির গুইমারায় স্ত্রী হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা সাগর চৌধুরী এক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষিকাকে ধর্ষণ করে।
২২ আগস্ট ২০২৩ সালে ভোলার মনপুরায় উপজেলায় গৃহবধূ ধর্ষণ করে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এনাম হাওলাদার।
১৮ অক্টোবর ২০২৩ সালে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করে লালমনিরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সোলায়মান আলী সবুজ।
২২ মে ২০২১ সালে সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলায় শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করে ছাত্রলীগ নেতা আক্তার হোসেন।
এই পরিসংখ্যান লিখতে গেলে আরো বড় হবে। যুবলীগ, ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা এরকম কয়েক হাজার ধর্ষনের খবর ছড়িয়ে আছে সংবাদমাধ্যমে। গুগলে সার্চ দিলে পেয়ে যাবেন সব তথ্য।
আওয়ামীলীগের শাসনামলে ২০১৬ সালে এক হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৩০০-র বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।
২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হন ৮১৮ জন নারী৷
২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী৷
ডিডাব্লিউ’র এক রিপোর্টে জানা যায়, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ১১৮টি দেশে নারী নিপীড়ন ও ধর্ষন নিয়ে জরিপ করা হয়।
এই জরিপে সাউথ আফ্রিকার নাম এক নাম্বারে উঠে আসে । দেশটির প্রতি এক লাখের মধ্যে ১৩২ জনেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। জরিপে ৪০তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ১০ জন ধর্ষণের শিকার হন। কি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছিল, তা এখনকার চিত্রের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
সেই জরিপে উঠে আসে ভারতের প্রতি লাখ নারীর মধ্যে এক দশমিক ৮ জন ধর্ষণের শিকার হন। ভারতে প্রতি ১৬ মিনিটে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই সংখ্যা ২০১৮ সালে ১৫ মিনিট ছিল।
রিপোর্টে বলা হয়, বিশ্বের ৩৫ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হলেও চুপ থাকেন, ১০ শতাংশ আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেন।
২০২০ সালে বাংলাদেশে ৩৪৪০ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৪ জন ধর্ষণ, ২৩৬ জন গণধর্ষণ ও ৩৩ জন ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৩ জন ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র আত্মহত্যা করেছেন।
২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ ও পারিবারিক নির্যাতন হয়েছে। ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট বিচারাধীন মামলা ছিল ১,৬১,২১৮টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার ৫২ শতাংশই ছিল ধর্ষণের।
২০২৫ সালের ৯ মার্চে ডয়েচে ভেলের এক রিপোর্টে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে দুই মাসে নির্যাতিত ২৯৪ নারী, ধর্ষণের শিকার ৯৬ জন। যার মধ্যে ৪৪ জন শিশুও রয়েছে। ভয়ংকর চিত্র!
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র – আসক এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন নারী। এদের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২১ টি এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন।
ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৭টি, এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১৭টি, ধর্ষণের পর হত্যার দুইটি ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে পাঁচ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীও রয়েছেন।
ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের শিকার ৫৭ জনের মধ্যে ১৬ জন শিশু, ১৭ জন কিশোরী রয়েছেন। অন্যদিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিন জন কিশোরী ও ১৪ জন নারী, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন দুই জন নারী। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ১৯টি, যৌন হয়রানি ২৬টি, শারীরিক নির্যাতনের ৩৬টি ঘটনা ঘটেছে এই মাসে।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন এমএসএফ এর প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বেশি।
এছাড়া পরিবারিক সহিংসতা ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা বিগত মাসগুলোর মতো একই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে, যা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
২৭ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক গ্রুপ- ইউএনএফপি এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোন না কোন সময় শারীরিক, যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন।
২০২৪ সালে ধর্ষণের শিকার ৪০১ নারী
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ৪০১ জন নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাত জন। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন ১০৯ জন। এর মধ্যে একজনকে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে ২১ জন নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আসকের পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৬৬ জন নারী। উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন দুই জন ও খুন হয়েছে তিন জন নারী। এ ছাড়া ২০২৪ সালে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে মোট ৫২৩ জন নারী। এর মধ্যে নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন ২৭৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৭৪ জন।
কেন নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে?
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী নির্যাতনের মাত্রা কমলে আমরা খুব খুশি হতাম। কিন্তু এটা কমার কোনো লক্ষণ দেখছি না। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজে নারী বিদ্বেষী মনোভাব বাড়ছে। নারীবিরোধী গোষ্ঠী আবার তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা ধর্মকে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, নারীর চলাচলে বাধা দিচ্ছে, নারীর পোশাকের প্রতি আঙুল তুলছে, ধর্মকে হিংসা‑বিদ্বেষের কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার যিনি নারী দিকে আঙুল তুলছেন তাকে ফুলের মালা দিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। এগুলো তো ভালো লক্ষণ না।”
নিরাপত্তা রক্ষায় হিমশিম সরকার ‘কঠোর’ হতে চায়
ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। মাগুরায় আট বছরের শিশু ধর্ষিত হওয়ার পর থেকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশের নানা প্রান্তে আন্দোলনে মুখর হয়েছে ছাত্র-জনতা।
উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বভারতে ৩৫,০৪০ টি ধর্ষণের মামলা অথবা প্রতিদিন গড়ে ৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে,যা ২০১৮ সালের তুলনায় কিছুটা কম, যখন প্রতিদিন ৯১ টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
