ঘরের বউ

কেটেছে আরো তিন মাস নয়না বাবার বাড়িতেই আছে

কেটেছে আরো তিন মাস। নয়না বাবার বাড়িতেই আছে। শশুর বাড়ির মানুষের সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ। শিহাবের সঙ্গে যোগাযোগ নেই আরো আগে থেকেই। নয়না এখন আর মন খারাপ করে না। তার মনে কোনো অপরাধ বোধ নেই সে তার যথাসাধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছে একজন পারফেক্ট বউ হওয়ার। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। নয়নার চেষ্টায় কোনো কমতি ছিলো না ভেবেই নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে পুরোপুরি। নয়না একা মানিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউ তাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টাও করেনি। তাহলে কেনো নিজেকে অপরাধী ভাবতে যাবে, কেনো মন খারাপ করতে যাবে, সব ছেড়ে চুড়ে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ভালো থাকতে চেয়েছিলো। যতো অত্যাচার সব মুখ বুজে সহ্য করেছে। কখনো প্রতিবাদ করেনি। কি করা হয়নি তার সঙ্গে? অন্যায়, অত্যাচার, অপমান, লাঞ্ছনা, অপবাদ সব সহ্য করেছে। নিজের শখ, আহ্লাদ, স্বপ্ন মাটি চাপা দিয়েও যখন কাজ হয়নি। তাই সে নিজের মনে নিজের চেষ্টার প্রতি কোনো ত্রুটি খুঁজে পায় না। সে পুরোপুরি মনোযোগ দিয়েছে পড়াশোনায়। নয়না পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করায়। এনামুল হক মানে নয়নার বাবা এবিষয়ে অমত করেনি বরং মেয়েকে যথেষ্ট সাপোর্ট করেছে। বাড়ির সামনের রুমটা খালি করে দিয়েছে। মন খারাপ করে বসে থাকার চেয়ে ব্যস্ত থাকুক। টাকা কোনো ব্যাপার না, মেয়েদের সব শখ আহ্লাদ প্রয়োজন মেটানোর মতো উপরওয়ালা তাকে সেই সামর্থ দিয়েছে। প্রতিদিনের মতো আজো নয়না কলেজ থেকে এসেই নিজের রুমে চলে গেলো। রুমের লাইট জ্বালাতেই সদৃশ্য হলো চিরচেনা এক পুরুষালী মুখ। নয়নাকে দেখা মাএই উঠে বসেছে শিহাব। আস্তে করে বলল,

“এসে পড়েছো?”

- Advertisement -

নয়না চুপ। শরীর যেনো বরফের ন্যায় জমে গেছে। স্বপ্ন নাকি সত্যি তা যেনো টের পাচ্ছে না! নয়নার অস্থির মনটা চিৎকার বলছে এটা স্বপ্ন হলে দীর্ঘস্থায়ী হোক আর বাস্তব হলে তার এখুনি ধ্যান কাটুক। শিহাব নয়নার অবস্থাটা হয়তো সামান্য উপলব্ধি করতে পেরেছে। কয়েক পা এগিয়ে নয়নার কাছে আসলো। বাম হাতে লাইটের সুইচ টা বন্ধ করে দিলো। জানালা গুলো বন্ধ পর্দা টেনে দেওয়া। লাইট বন্ধ করতেই পুরো রুম অন্ধকার হয়ে গেলো আগের ন্যায়। আলিঙ্গন! চিরচেনা সেই বাহু বুক শরীরের গন্ধ। এই পুরুষটিকেই তো নয়না ভালোবাসে পাগলের ন্যায়। তার ছোঁয়ায় শরীরের যতো ব্যাথা ক্লান্তি যন্ত্রণা ধুয়েমুছে সাফ করে দিতে সক্ষম। নয়না চুপ করে শুনছে শিহাবের দ্রুত গতিতে ছুটে চলা হার্টবিটের শব্দ। নয়নার শরীর অসারের থেকেও অসার হলো। সমস্ত অনুভূতি যেনো তার শরীর থেকে কেউ আলাদা করে ফেলেছে। কথা বলতে চাইলে কন্ঠ কাঁপছে। ভারী অনুভূতিশূন্য নিঃসাড় কন্ঠে শুধু কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করল,

“তুমি সত্যিই এসেছো?”

শিহাব নিশ্চুপ! নয়নার কপালের চুলগুলো সরিয়ে আলতো করে অধর ছুঁয়ালো।৷ নয়না কেঁপে উঠল সামান্য। নিজের হাতদুটো শিহাবের পিঠ আরেকটু জাপ্টে ধরল। পেরুলো অনেকক্ষণ! নয়না সংবিৎ ফিরে তাকালো শিহাবের দিলে। অভিমানে পাল্লা এসে দেয়াল হলো তাদের মাঝে। সরে গেলো নয়না। শিহাব অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখলো নয়নার সরে যাওয়া। অথচ আগে এই মেয়েটাই সরতে চাইতো না।  ভাবতেই শিহাবের বুকে চিনচিন ব্যাথা হলো। নয়না রুম ছাড়ল দ্রুত! চোখ ভর্তি পানি নিয়ে শিহাব দেখলো সেই মর্মান্তিক দৃশ্য।

___________

ঘড়ির কাটা রাত আটটায় পৌঁছে গেছে। শিহাব এনামুল হক আর তাহমিনা বেগমের সঙ্গে গল্প গুজবে ব্যস্ত। মাঝে মাঝেই আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নয়নাকে খুঁজছে। নয়না ওদের কথা শুনছে পাশের রুম থেকে কিন্তু সামনে আসছে। নয়না মনে মনে খানিকটা অবাক হলো তার মা-বাবার ব্যবহারে। অদ্ভুত! ওরা সবাই এমন ভাবে কথা বলছে যেনো তাদের প্রতিদিন কথা হবো। এনামুল হক শিহাবের টুকটাক অনেক বিষয়ে জানেন যা নয়না এই তিন চার মাসে জানে না। তাহমিনা বেগমও সে সঙ্গে মতামত দিচ্ছেন। শিহাবের প্রতি তাদের কোনো রাগ নেই তাদের কথা বার্তায় বোঝা যাচ্ছে। অথচ শিহাব একবারের জন্যও তো তাদের সাথে যোগাযোগ করেনি তবুও আম্মা আব্বা এতো নরমালি কথা বলছে। অদ্ভুত! অদ্ভুত!

তাদের কথোপকথনে বোঝা যাচ্ছে শিহাবের চাকরি হয়েছে। শিহাবের বাবাও সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি আসবেন আগামীকাল নয়নাদের বাসায়। শিহাব চাচ্ছে কয়েকবছর চাকরি করে নিজেই ল্যাবরেটরি দিতে। এ বিষয়ে এনামুল হক আর তাহমিনা বেগম খুব উৎসাহ দিলো শিহাবকে। জহির আহমেদেরও প্রবল ইচ্ছে ছেলের ল্যাবরেটরি করে দেওয়ার। জহির আহমেদ নিজের ফার্মেসির ব্যবসাও শিহাবের ল্যাবরেটরির সাথে দিতে চান। শিহাব তার মায়ের অসুস্থতার বিষয়েও জানে। আগামীকাল সব কথা হবে জহির আহমেদ আসলে। নয়না বেকুবের মতো শুনল সব কথা। সবগুলো তার মাথার উপর দিয়ে গেলো। সবাই এতো স্বাভাবিক কিভাবে? এ প্রশ্নের উওর নয়নার মাথায় আসছে না কোনো ভাবেই? তাহলে কি সবাই আগে থেকে সবকিছু জানতো?

এনামুল হক শিহাবের এদিক ওদিকে খোঁজাখুঁজি লক্ষ্য করেছে অনেকবার। এই ছেলের সরলতাই মুগ্ধ করেছে এনামুল হক কে। তাইতো এতে কিছুর পরেও তিনি মেনে নিয়েছে শিহাবকে। এনামুল হক তাহমিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি যাও রাতের খাবার তৈরি করো আমি সামনের দোকান থেকে কয়েল নিয়ে আসি। কয়েল শেষ তুমি আগে বলবে না। এতো মশা কয়েল ছাড়া থাকা যায়?”

তাহমিনা বেগম অবুঝের ন্যায় তাকালো। গতকালকেও কয়েলের বক্স এনেছে তবে আজ আবার কেনো আনবে? এনামুল হক চোখের ইশারায় কিছু বুঝালেন। তাহমিনা বেগম আমতা আমতা করে বলল,

“ওহ হ্যাঁ! নিয়ে আসো যাও! আমারো অনেক কাজ পড়ে আছে। আমি যাই।”

শশুর শাশুড়ী বের হতেই শিহাব এদিক ওদিকে তাকিয়ে ছুটল পাশের রুমে। সে জানে নয়না ও রুমেই আছে। রুমটা অন্ধকার! পাশের রুম থেকে হালকা আলো এসে পড়ছে শিহাব হালকা আলোয় দেখলো নয়নার মুখটা। চোখ বুঝে শুয়ে আছে চুপচাপ। দেখে মনে হচ্ছে না ঘুমাচ্ছে! শিহাব আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করল। রুমে থাকা ড্রিম লাইটটা জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলো বিছানায়। নয়নার মাথাটা বুকে নিয়ে লম্বা একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল শিহাব। নয়না সজাগ ছিলো, ঝটকায় উঠে বসলো। আস্তে আস্তে বেশ অনেকটা দূরে দিয়ে বলল,

“ছুঁবে না তুমি আমায়?”

দু’জনের চোখে চোখ। দু’জনের চোখেই পানি। শিহাব অসহায় অপরাধী দৃষ্টিতে তাকিয়ে, নয়না এক আকাশ সমান অভিযোগ অভিমানী চোখে তাকিয়ে আছে। নয়নার বজ্রপাতের ন্যায় কথাটা শিহাবের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিতে সক্ষম। ভালোবাসার মানুষের মুখে এমন কথা পৃথিবীর সবথেকে কঠিন থেকে কঠিন পুরুষকে ভেঙে চুরমার করে দিতেও যথেষ্ট। নয়নার কন্ঠ শিহাবের কানে বাজছে ঢোলের মতো। অভিমানের এতো বড় পাহাড় সে ভাঙবে কিভাবে?

- Advertisement -

Read More

Recent