মা

নারীর পরিচয় বদলায় প্রথমে বাবার পদবীমাঝে অনেকটা বাধ্য হয়ে স্বামীর পরিচয়েএরপর পুত্রের নামে

রূপকের ঝোঁকটা গান বাজনার দিকে। ছায়ানটে নজরুল সংগীতের কোর্সটা শেষ করেছে পড়ালেখার পাশাপাশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে চান্স পাবার সাথে সাথে সে বাসায় একটা প্রস্তাব দিয়ে বসলো।

তার আগে রূপকের বাসার পরিবেশ সম্পর্কে একটু জেনে নেই। রূপকের বাবা চিকিৎসক। প্রফেসর সার্জারি ডিপার্টমেন্টের। তাও আবার সরকারি মেডিকেলে। অতি ব্যস্ত। তাঁর ইচ্ছে ছিল ছেলেও মেডিকেলে পড়বে। রূপকের কোনো ইচ্ছে ই নেই। আপাতত টার্গেট রূপকের ছোট বোন রূপন্তী। বিনা বাক্য ব্যয়েই সে মেনে নেবে বাবার সিদ্ধান্ত,আকমল সাহেব নিশ্চিত।

- Advertisement -

রোকেয়া হারুন,আকমল হারুন সাহেবের স্ত্রী। রূপক-রূপন্তীর মা। ব্যস। আর বলার মতো আগে পরে কিছু নেই। বিয়ের আগে তিনি রোকেয়া ইসলাম ছিলেন,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশে গ্র‍্যাজুয়েশন। এরপরেই বিয়ে,মাস্টার্স ক্লাসে থাকার সময় রূপকের আগমনী বার্তা। আপাতত তিনি রূপকের মা হিসেবেই আছেন।

নারীর পরিচয় বদলায়। প্রথমে বাবার পদবী,মাঝে অনেকটা বাধ্য হয়ে স্বামীর পরিচয়ে,এরপর পুত্রের নামে। সে পুত্র মানুষ না হলেও তিনি বাকি জীবন তার ই মা হয়ে বাঁচবেন। তাঁর আলাদা অস্তিত্ব আমাদের সমাজে জরুরি নয়।

ঝামেলাটা লাগলো রূপক যখন একটা গানের দলে যোগ দিতে চাইলো। মানে একেবারে ব্যান্ডের ভোকাল। এসব আকমল সাহেব মানবেন কেন?

পারিবারিক মিটিং হলো। মিটিং এ উপস্থিত আকমল সাহেব,তাঁর সেজো ভাই আজমল সাহেব(উনিও চিকিৎসক), তাঁর স্ত্রী বিউটি,আজমল সাহেবের পুত্র আসিফ,সেও মেডিকেল প্রথম বর্ষে।

আকমল সাহেব গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন একটু। এর মানে তিনি একটা ভাষণ দেবেন। রোকেয়া জানেন তিনি কী বলবেন। বিয়ের ২২ বছর পরে আসলে কিভাবে কোন কথাটা বলবেন,সেটা বোঝা হয়ে যায়।

“রূপক,তুমি আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য জানো। আমরা বাকি সবাই চিকিৎসক। তুমি তা হওনি। আমি মেনে নিয়েছি। যা পড়ছো,তাতে ভালো করবার চেষ্টা করো। এসব কেন?”

“আমি তো আমার কেরিয়ার ছাড়ছি না। গান করলে কী সমস্যা,বাবা?”

“বাবা,দেখো,আসিফ কিন্তু অন্য কোনো দিকে যায় নাই” আজমল সাহেব উস্কানী দিলেন আরও।

“চাচা,সেটা আসিফের নিজের সিদ্ধান্ত। আমি কেন আমার ইচ্ছে শুনব না?”

“শেষ পর্যন্ত নাম পরিচয়হীন রয়ে যাবি। তোর মায়ের মতো। ”

রোকেয়া হাসলেন। জানতেন এ কথা আসবে। কারণ আছে।

ভার্সিটিতে বেড়াতে এসেছিলেন রূপকের বাবা। সেই সময়ে স্টেজে নেচেছিলেন রোকেয়া। দেখেই প্রেমে পড়লেন। এরপর বাসায় প্রস্তাব দেওয়া। কিন্তু প্রথমেই খড়গ নামলো সেই নাচের উপরেই। বিবাহিতা মুসলিম নারী, আর নাচ?

ঘুঙুর তাই আলমিরাতে উঠলো। ধুলো জমে পরে চলে গেলো স্টোর রুমে। মেয়ে মানুষের শখের শেষ ঠিকানা!

রূপক একতরফা ভাবে যুক্তি দিয়েই যাচ্ছে। কেউ তাঁর পক্ষে নেই।

রূপক বুঝতে পারছে না ২০ বছর বয়সে তাঁকে কেন শাসন করা হবে? সে তো ভালো রেজাল্ট করছে ই। ব্যান্ডে জয়েন করলে কী হবে?

তাঁর নিজের জীবন, ইচ্ছের মূল্য থাকবে না?

রোকেয়া নীরবতা ভাঙলেন।

“এটা রূপকের জীবন। ওর ইচ্ছেকে সম্মান করা উচিত।”

“তুমি কেন কথা বলছো? তুমি নিজেই তো কিছু করতে পারো নাই। নাচতে পেরেছো?” আকমল সাহেব বললেন।

“সেটা পারিনি,চাকরিও করতে পারিনি। কাউকে দোষ দেবো না। দুজন ছেলে মেয়েকে বড় করার দায়িত্ব আমার একার ছিল। কিন্তু রূপকের ব্যাপার তা না। ও ওর জীবন ওর মতো করে কাটাবে।”

“ভাবী,আপনি জীবন কী জানেন না।”

“আর তুমি ইচ্ছে পূরণ করতে না পারার কষ্ট কী জানো না। কথা বলবে না এখানে”

রূপক সারগাম ব্যান্ডে জয়েন করলো…

……………………………

সময় পেরিয়ে যায়।

রূপক এখন প্রতিষ্ঠিত একজন শিল্পী। মাসে দুই থেকে তিনটা কনসার্ট থাকে। বাকি সময় সে দেয় চাকরিতে। সেখানেও উচ্চ পদস্থ। আর পরিবারে। স্ত্রী সুস্মিতা আর কন্যা রাইমাকে।

রাইমার সব ইচ্ছে পূরণ করে সে। বাবা অন্ত প্রাণ মেয়ে। সুস্মিতা চিকিৎসক। ছেলেকে দিয়ে না পেরে,আকমল সাহেব চিকিৎসক বউ এনেছেন বাসায়। অবশ্য আপাতত রাইমা ছোটো বলে সুস্মিতা কিছু করছে না। চমৎকার ছবি আঁকে সুস্মিতা। অথচ কেউ জানে ই না। শুধু ওর বাবার বাসায় ফ্রেম করা ওর আঁকা। আর এখানে? কারো সময় কই?

আকমল সাহেব রিটায়ার করেছেন আরও আগেই। এখন প্রাইভেট প্র‍্যাক্টিস করেন। এখনো ব্যস্ত অনেকটাই।

রোকেয়া আর্থ্রাইটিসের জন্য বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না। হাটু রিপ্লেস করতে হবে। ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে আসছে না। আপাতত হুইলচেয়ারে জীবন।

এর মাঝেই কোভিডের হানা। টানা দু’বছর জীবন থেমে গেলো। আকমল সাহেবের কোভিড হলো,ফিরলেন না।রোকেয়া হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন,দু”সপ্তাহ পর ফিরে এলেন বিধবা হয়ে।

তিনি কি কিছু মিস করছেন? আকমল সাহেব বেঁচে থাকতেও তাঁকে সময় দেননি। সময়টা গেছে রোকেয়ার কাছ থেকে।

খুব অবাক হয়ে তিনি দেখলেন,তাঁর সময়ের সঙ্গী কেউ নেই। ছেলে ব্যস্ত,বউ কন্যাকে নিয়েই আছে। রূপন্তী বিয়ে করে দেশের বাইরে। ওখানেই সে চিকিৎসক। কোভিডের কারণে বাবাকে শেষ দেখাটাও দেখতে পায়নি।

যদি আর দু’বছর ও তিনি বাঁচেন,কী নিয়ে বাঁচবেন?

পত্রিকায় দেখলেন,নৃত্য দিবস দুদিন পর। শিল্পকলায় একটা অনুষ্ঠান আছে। ইস,যদি যেতে পারতেন!

পাশেই গ্যালারিতে চিত্র প্রদর্শনী। সুস্মিতাকে নিয়ে দেখাতে পারলে মেয়েটা অনুপ্রেরণা পেতো।

সন্ধ্যের চা তে বউকে বললেন,

“যাবে?”

“মা,আপনার ছেলে অনুমতি দেবে না। আপনি মাত্র ফিরলেন”

“তিন মাস চলে গেছে এরপর।”

“তাও হুইলচেয়ারে,মা। দেবে না” সুস্মিতা অসহায়…

রূপক অফিস থেকে ফিরেই এই আলোচনা একটু শুনতে পেলো…

“মা,কী শুরু করলে!”

“আমি যাবো। আমি কতদিন বাইরে যাই না।”

“নাচ দেখতে চাইলে টিভিতে দেখো।”

“তুই গান করিস কেন? এখন যে কনসার্ট বন্ধ,তুই মিস করিস না?”

“করি। আমার বয়স আর তুমি এক হলে?”

“শখের আবার বয়স কী রে? আমি হুইলচেয়ারে, এটা আমার শারীরিক সমস্যা,মানসিক না। বয়স হলে কি মানুষ ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে?”

“সম্ভব না,মা”

“আমি অনুমতি নেইনি। জানালাম। আমি যাবো। সুস্মিতাকে নিয়ে”

“ওকে আমি অনুমতি দেবো না”

“সেও তো চাইছে না,রূপক। ঠিক যেমন এক সময় তুই ব্যান্ডে জয়েন করার সময় বাবার অনুমতির ধার ধারিস নাই,তেমন!”

রূপক স্তব্ধ হয়ে গেলো..

“তোর কন্যার দুই বছর বয়স। ওর সব ইচ্ছে পূরণ করিস তুই। আমাদের ইচ্ছের সংজ্ঞা আলাদা কেন রে?

ইচ্ছের বুঝি কোনো মেয়াদ থাকে? এরপর পচে যায়? মা হলেই?

- Advertisement -

Read More

Recent