
২৫শে মে, রবিবার বিকেল চারটা। বাহিরে মুশলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আর মাত্র দুই ঘন্টা পরেই আমাদের আয়োজনে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষ্ঠান। আমার উপরে অনেক দায়িত্ব। ঘন্টা দুই আগে আজকের অনুষ্ঠানের মূল ব্যক্তি ড. নূরুন নবীকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছি। আমিন ভাইয়ের বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে নবী ভাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমিও একটি সোফায় দু’দিকে দুটো কুশন নিয়ে যথাসম্ভব আরামে চোখ বন্ধ করে আছি। চেষ্টা করছি অনুষ্ঠানের বিষয় মাথা থেকে ঝেড়ে একটু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হতে।
এরকম সময়ে বৃষ্টি আশীর্বাদ হওয়ার কথা। কিন্তু আমার জন্য এই সময়ে বৃষ্টি দুঃশ্চিতার কারণ হয়েছে। যদি আজকের অনুষ্ঠানে দর্শক উপস্থিতি আশানুরূপ না হয়! ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কিছু মাথায় এসে চোখ বন্ধ করা আমাকে উদ্বিগ্ন ও নিশ্চল অস্থির করে রেখেছে।
ঠিক এমন সময় ফোনে একটা শব্দ শুনলাম। কেউ একজন আমাকে ডাকছেন নিশ্চয়ই। ফোনের পর্দায় দেখি আরিফ হায়দার-এর ছোট্ট একটা বাক্য, ‘আমার বন্ধু ব্যস্ত?’
হিসেব করে দেখলাম বাংলাদেশে তখন গভীর রাত। এতো রাতে আরিফ! ভয় পেয়ে গলা শুকিয়ে গেল! কী এক আতঙ্ক এসে গ্রাস করলো যেন! সঙ্গে সঙ্গে কল দিলাম। ওপারে আরিফের ভরাট কণ্ঠ, ‘ কী করছো?’
আমি বললাম, ‘ কি করছি, সেটা বলবো। আগে বলো, কি হয়েছে? তুমি ভালো আছো? কোন অসুবিধে?’
‘না, না। কোন অসুবিধে নেই। আমিও ভালো আছি। মনে পড়ছে আমরা এখানে চা খেয়েছিলাম। বুঝতে পারছি, তুমি ভয় পেয়েছো এতো রাতে এখান থেকে তো কল দেওয়ার কথা নয়, তাই! কলকাতা থেকে ফসল আসছে৷ এখন তো ট্রেন যোগাযোগ নেই। তাই, ও যশোর হয়ে বাসে আসছে৷ আমি ফসলের জন্য অপেক্ষা করছি। কয়েক বছর আগে আমরা এখানে দাঁড়িয়ে চা খেয়েছিলাম। তোমাকে মনে পড়লো তাই ভাবলাম দেখি, তুমি আছো কি না।’
আরিফের সঙ্গে গল্প জমে উঠলো। মাকিদ ভাই, জাহিদ ভাই ও দাউদ ভাইয়ের প্রসঙ্গ এলো। সেবছর আরিফের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে জমজমাট একটা দিন পার করে ঢাকায় আসবো। ফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে ড. নূরুন নবী প্রণীত হেনরী কিসিঞ্জারের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে একটা বইয়ের আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। আমি বাংলাদেশে আছি বলে নবী ভাই নিউইয়র্ক থেকে আমাকে বলেছেন, বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে আমি যেন উপস্থিত থাকি। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কবি আসাদ চৌধুরী। রাজশাহী থেকে ঐদিন রাতে না গেলে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে থাকা সম্ভব হবে না। নবী ভাইয়ের চাওয়া মানে আমার কাছে আদেশ। এটা মান্য করা আমার কর্তব্য।
আরিফকে বুঝিয়ে বললাম ‘বন্ধু আমাকে ঢাকা যেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে খুব সহজেই কাউন্টার থেকে আরিফ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের টিকেটও পেয়ে গেল। আমাদের হাতে তখন বেশ কিছুটা সময় আছে। শহর থেকে আরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন জুবিলীতে নিয়ে এলো আরাম করে চা খাবো বলে। রাত গভীর হতে চললো। চারদিকের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলো। চা খেয়ে জুবিলীর পেছনে গেলাম। দূরের পদ্মা থেকে হিমশীতল এক স্নিগ্ধ পরশ শরীরে আদর বুলিয়ে দিল। কুয়াশার আস্তরণ ঘন হতে শুরু করেছে। সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করেই আরিফ মাকিদ ভাইকে ফোন দিল। আকিদ ভাই অট্টহাসি দিয়ে আপন করে নিয়ে বললেন, ‘আরিফের বন্ধু মানে, তুই তো আমার ভাই! কবে আসবি আমাকে দেখতে!’
পোড়া কপাল আমার, মাকিদ ভাইকে আর দেখা হলো না! দাউদ ভাইয়ের কত গল্প শুনেছি, কবি বেলাল চৌধুরী, অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখায় এবং আরিফের মুখে মুখে। নির্বাসিত একজন কবি দেখতে কেমন? দেশ নিয়ে, শৈশব নিয়ে, নিজের মা ভাইবোন নিয়ে তিনি কী ভাবেন! আরো কত ইচ্ছে ছিল এগুলো দাউদ ভাইয়ের কাছে জানতে চাইবো। খুব ইচ্ছে পুঁইশাক দিয়ে অল্প ঝোলে দাউদ ভাইকে ইলিশ মাছ রান্না করে খাওয়াবো! আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবো দাউদ ভাই খাচ্ছেন! আমার পোড়া কপাল, দাউদ ভাইও……!
আরিফ ফোন দিল রাজশাহী শহরের বাস টার্মিনাল থেকে। আমি টরন্টো থেকে তার সঙ্গে কথা বলছি। আরিফের ছেলে ফসল আর কিছুক্ষণ পরেই গন্তব্যে এসে পৌঁছাবে। অথচ, আমার কানে বাজছে মাকিদ ভাইয়ের ফোনে ভেসে আসা সেই কণ্ঠস্বর, ‘তুই না আমার ভাই! আমাকে দেখতে আসবি না!’
আরিফ কথা বলছে। কথার পিঠে আমিও কথা বলছি৷ দাউদ ভাইকে নিয়ে আরিফের লেখার, মতি ভাইয়ের লেখা নিয়েও কথা হচ্ছে। এরই মধ্যে ফসলকে নিয়ে বাসটি আসার সময়ও প্রায় হয়ে এসেছে। আমরা গল্প করছি, অথচ, আমার কানে অনুরণিত হচ্ছে সেই একটি বাক্য, ‘আমাকে দেখতে আসবি না’।
ভাগ্যিস মৃত্যুর আগে মাকিদ ভাই বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর জন্য এই বিষয়টি নির্বিকার হলেও আমাদের কাছে একটা স্বস্তি। একজন কবি মৃত্যুর আগে যথোপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন। সম্মানিত হয়েছেন।
এরই মধ্যে ফসলকে নিয়ে বাসটি এসে থামলো। ফসল বাস থেকে নামার পর আমার সঙ্গে দু’পশলা কুশল বিনিময় করে শস্য আর কবিতার কাছে তারা রওয়ানা দিল। শস্য ফসলের একমাত্র ছোট ভাই। কবিতা হায়দার আরিফ হায়দারের বন্ধু ও স্ত্রী। ফসল এবং শস্য কবিতা ও আরিফ হায়দারের দুই সন্তান।
ভালো থেকো ফসল ও শস্য।
টরন্টো, কানাডা
