ক্যালগেরি থেকে : আমার ভাবনায় আওয়ামী লীগ

যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্ম সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে সোভিয়েত অবস্থানটি ছিল স্পষ্ট এবং মূলত তা ছিল সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ

যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্ম, সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে সোভিয়েত অবস্থানটি ছিল স্পষ্ট এবং মূলত: তা ছিল সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুঁজিবাদের স্বাভাবিক বিকাশকে পাশ কাটিয়ে অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প থেকে তিরিশের দশকে তৃতীয় বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পেছনে মদদ দিয়েছিল লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এশিয়ায় বড় দেশগুলোর মধ্যে চীন ও ভারত ছিল তাদের প্রথম টার্গেট, সে মোতাবেক চীনে মাও-সেতুঙের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হলেও ভারতে তা হয়নি। নব্বইয়ে সোভিয়েত ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে লেনিনিয় প্রকল্পটি মুখ থুবরে পড়ে। তৃতীয় বিশ্বে তাদের ফান্ডিংও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু, সমাজতন্ত্রের প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে থেকে বিলীন হয় না। বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোন দেশ না, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আকাঙ্খা যেখানে সমাজতন্ত্র, সেখানে তাকে পরিত্যাগ করা পুরোপুরি সম্ভবপর হয় না। তো কল্যানরাষ্ট্রের আড়ালে সমাজতন্ত্রের ওই আকাঙ্খাটা জীবিত থাকে। বাংলাদেশের বেলায় কল্যানরাষ্ট্রের সবচে বড় জোগানদার আওয়ামী লীগ। কৃষিতে ভূর্তকি, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রায়ণ প্রকল্প–সবই সমাজতন্ত্র থেকে অর্জিত কল্যানরাষ্ট্রের প্রায়োগিক দিক। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ সফলতা দেখিয়েছে পুঁজিবাদ বিকাশে–যদিও অনেকে একে ক্রোনি-ক্যাপিট্যালিজম বলে জাতে উঠতে দিতে চায় না। মাত্র এক যুগে ২ কোটি মানুষকে নতুন করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত করা বিস্ময়কর ঘটনা, যা সম্ভবপর হয়েছে পুঁজিবাদের উপর আস্থা রাখার কারণে।

ভূ-রাজনীতির সংকট থেকে উদ্ভুত বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র এবং দলের মধ্যে কোটারিস্বার্থের প্রবলতার কারণে আওয়ামী লীগকে গদিচ্যুত করার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র তার পুঁজিবাদি পথটি হারিয়ে ফেলেছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি রাতারাতি ৩.৩-এ নেমে আসাটা তারই লক্ষণ। অর্থপাচার, ব্যাংক-খাতের লুটপাট নিয়ে যে রোমান্টিক গুজব ছড়ানো হয়েছিল, দিনে দিনে তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়েছে। আরও হবে। মধ্যবিত্তের ভ্রমন ও সঞ্চয়ে টান পড়লেই বুঝতে পারবে, কী থকে কী হয়ে গেল! সারকথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যে পুঁজিবাদি অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তুলেছিল, তার কোন বিকল্প অন্য কোন রাজনৈতিক বা অ-রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে হাজির করতে পারেনি। জামায়াত, তথা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক বন্দোবস্তটি অন্তর্ভূক্তমূলক না, সেখানে রয়েছে তাদের দলীয় কর্মীদের একচ্ছত্র অধিকার। সেজন্য, রাষ্ট্র সংস্কারের নামে তারা তুষলকি কর্মকান্ডে ব্যস্ত। সাধারণ মধ্যবিত্ত যে দ্রুতবেগে পতিত হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা উদাসীন। সাধারণ মানুষ যখন জামাতের এই অপকর্মটি বুঝে যাবে, তখন তাদের সামনে নেমে আসবে মহাবিপদ, যার নমূনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিরা দেখেছে।

- Advertisement -

পুঁজিবাদ সম্পর্কে ধারণা না থাকার একটা কুফল হচ্ছে, অর্থনীতিকে রোমান্টিক জায়গা থেকে দেখার ঝুঁকিটা তখন প্রবল থাকে। জুলাই-আগস্টে মধ্যবিত্তকে তেমন রোমান্টিক গল্পে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতো কিছু মানুষ। বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থপাচারের অংক কয়েক মাসের মাথায় ১৬ বছরে মোট ২০ বিলিয়েনে ঠেকেছে, অর্থাৎ, বার্ষিক গড় ১.২৫ বিলিয়ন। সেটিও অপ্রমানিত। আর গদিতে বসার পরে রাতারাতি বাংলাদেশকে ইউরোপ বানানোর গল্প ফেঁদেছিল ইউনুস থেকে ফরহাদ মজহার, সকলেই। কথা হচ্ছে, গুজব দিয়ে অর্থনীতি চলে না, বিনিয়োগও হয় না। পুঁজিবাদের একমাত্র লক্ষ যদি হয় মুনাফা করা, তো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা হচ্ছে সেই মুনাফার গ্যারান্টি। বিগত ১০ বছর সেটা সম্ভব হয়েছিল বলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ফুলে উঠেছিল, জনপ্রতি আয় গিয়ে পৌঁছেছিল প্রায় ৩ হাজার ডলারে।

আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে মূলত: পুঁজিবাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতর থেকে জেগে থাকা হাহাকার থেকে। প্রয়োজন ধৈর্য ধরে সংগঠনকে গড়ে তোলা। বাংলাদেশের মানুষ বাজার অর্থনীতিতে অভ্যস্ত হয়েছে। পণ্য ও সেবা প্রশ্নে রাষ্ট্র চাইলেও যেমন তার উপর আর খবরদারি করতে পারে না, তেমনি নেতৃত্বও গড়ে উঠতে হবে সংগঠনের কর্মীদের পছন্দমাফিক। ‍ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে দল যত দ্রুত বের হয়ে আসবে, তত টেকসই হবে তাদের ক্ষমতা গ্রহন। একটা আধুনিক পুঁজিবাদ যে ধরণের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমৃদ্ধি অর্জন করে, তা দেওয়ার পূর্ণ সামর্থ আওয়ামী লীগের আছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জন্য আমার পরামর্শ একটাই: আপনার গণতন্ত্র প্রশ্নে আপোস করবেন না।

 

ক্যালগেরি, আলবার্টা

- Advertisement -

Read More

Recent