কানাডার পর্যটন শিল্পে চরম ধস: অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ভয়াবহ প্রভাব

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পর্যটকের হার প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য কানাডা বর্তমানে পর্যটন খাতে নজিরবিহীন মন্দার মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন ১৮ শতাংশ কমেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পতনের জন্য দায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত পারাপারের জটিলতা, ব্যয়বৃদ্ধি এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতিগত অনিশ্চয়তা।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পর্যটকের হার প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। উল্লেখ্য, প্রতিবছর কানাডা ভ্রমণকারী মোট আন্তর্জাতিক পর্যটকের প্রায় ৭০ শতাংশই মার্কিন নাগরিক যা প্রায় ১৫ মিলিয়ন। এ হার কমে যাওয়ায় কানাডার পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

- Advertisement -

পরিসংখ্যান বলছে, কানাডার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। এই খাত থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বার্ষিক আয় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি, কর্মসংস্থান দেয় প্রায় ২০ লাখ মানুষকে। অথচ, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই খাতটি প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রিটিশ কলম্বিয়া, কুইবেক, অন্টারিও ও আলবার্টা, যেখানে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, গাইড সার্ভিস এবং খুচরা বিক্রিতে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ অবধি কমেছে।

এই সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ সীমান্ত পারাপারে জটিলতা। ভিসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, নিরাপত্তা জিজ্ঞাসাবাদ, ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স এবং কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতা অনেক পর্যটকের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, কানাডিয়ান নাগরিকদের মধ্যেও বিদেশগমনের অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করা কানাডিয়ানদের হার ৩৩ শতাংশ কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে সীমান্তবর্তী মার্কিন রাজ্যগুলোর পর্যটন অর্থনীতিতেও।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বাধ্য হয়েছেন কর্মী ছাঁটাই করতে। টরন্টো, মন্ট্রিয়াল ও ভ্যাঙ্কুভারের মতো বড় শহরগুলোতে চাকরি হারাচ্ছেন ট্যুর গাইড, হোটেল কর্মী, চালক এবং ট্রাভেল এজেন্সির স্টাফরা। অনেক হোটেল ও খুচরা বিপণি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ফেডারেল সরকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পুনরুদ্ধার তহবিল ঘোষণা করেছে। তহবিলটি পর্যটন খাতের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোকে ঋণ সহায়তা, কর্মী প্রশিক্ষণ, বিপণন ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ফেডারেল পর্যটন বোর্ড চালু করেছে একাধিক নতুন ক্যাম্পেইন যেমন “ডিস্কভার কানাডা”, “স্পেন্ড লেস, ডু মোর” এবং “রিকানেক্ট উইথ নেচার”।

তবে শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। সীমান্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সহজতর ভিসা নীতি, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কানাডার ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বৈদেশিক রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে পর্যটন খাতকে রক্ষা করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

এদিকে, প্রাদেশিক সরকারগুলো স্থানীয় পর্যটনে জোর দিচ্ছে। বৈচিত্র্যময় পর্যটন অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ উৎসাহিত করতে চালু হয়েছে ইনসেনটিভ ভিত্তিক ট্রাভেল প্যাকেজ। তরুণদের মধ্যে ঘরোয়া ভ্রমণের প্রবণতা বাড়াতে নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ।

সার্বিকভাবে বলা যায়, কানাডার পর্যটন শিল্প বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই খাত পুনরুদ্ধারে সরকার, ব্যবসায়ী ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া সামনে উত্তরণের পথ খুব একটা সহজ নয়। এখনই সময়, সক্রিয় ও সুসমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার।

- Advertisement -

Read More

Recent