অর্থনীতির ঘেরাটোপে প্রেত ও প্রচ্ছায়া

ছবিমার্কিন স্কালিশ

ছেলেবেলায় বোতল ভূতের গল্প শুনেছি। বোতলের ছিপি খুললেই সে দৈত্যের আকারে বেরিয়ে পড়ে। মজার ব্যাপরে হলো কানাডার অর্থনীতি সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে একদিন ঘাটাঘাটি করতে যেয়ে তেমনি বেরিয়ে পড়লো প্রেত ও প্রচ্ছায়ারা। এই প্রেত কোনো সাধারণ টাইপের ভূত নয়। এরা অন্ধকারের বাসিন্দা নয়, আলোর জগতের বাসিন্দা। তবে এদের সাধারণ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু পদে পদে অনুভব করা যায়। আর প্রচ্ছায়া- সে তো ছায়ারও উপভূমিকা পালনকারী। দিনের বেলা, এদের ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় বটে কিন্তু ধরা যায় না। এরা ঠিক জীব নয়, জীবের ছায়া মাত্র। কানাডার অর্থনীতির জীবনধারায় এই প্রেত ও প্রচ্ছায়ারা বিপরীত ভ‚মিকায় অভিনয়রত। এই প্রেত ও প্রচ্ছায়ার রহস্য ভেদ করার আগে আসুন একবার ঢুঁ মারি কানাডার অর্থনীতির ঘেরাটোপে।
কানাডিয়ানরা তাদের অর্থনীতিকে বিশ্বের অন্যতম ‘সফিসটিকেটেড এন্ড এফিসিয়েন্ট ইকোনোমি’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে। যার বাংলা দাঁড়ায় অনেকটা এরকম – যোগ্যতাভিত্তিক দক্ষ অর্থনীতি। স্বভাবতই ব্যবসা প্রশাসনের ছাত্র হিসেবে এ আধুনিকতম অর্থনীতির রহস্য আমার আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণেই কানাডার নাগরিকদের জীবন ধারা, ক্রয় স্বভাব ইত্যাদি বোঝার চেষ্টা করছিলাম। তাই একদিন কানাডার পরিসংখ্যান ব্যুরোর কিছু ফ্যাক্টস এবং ফিগার নিয়ে খেলায় মেতে উঠলাম। মনে হলো, যে বিষয়টি সবার আগে জানা দরকার তা হচ্ছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক অবস্থান। একুশ শতকের প্রথম বছরের পরিসংখ্যান রিপোর্ট অনুযায়ী পনেরো বছর বা তার বেশি বয়সের উপার্জনক্ষম প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৩২ হাজার ডলার; বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। অবশ্য প্রধান চার পাঁচটি শহরের বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড় আয় থেকে অনেকটা বেশি। যেমন টরান্টো শহরের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় ৩৮ হাজারের কিছু বেশি, ভ্যাংকুভারে ৩৪ হাজার আবার ক্যালগেরিতে ৩৬ হাজার। অবশ্য জীবনযাত্রার ব্যয়ও এসব শহরে তুলনামূলকভাবে অধিক। একটা বিষয় বলে রাখা দরকার মাথা পিছু আয় নির্ধারণের সময় ফুলটাইম ও পার্টটাইম দুই ধরনের কর্মীদের আয়কে গড়পরতায় ফেলা হয় কিন্তু যদি শুধুমাত্র ফুলটাইমার চাকুরিজীবীদের আয় গড় করা হয় তবে চিত্রটা হবে অনেক ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ টরান্টো শহরের ফুলটাইমারদের মাথাপিছু আয় ৫০ হাজার ডলারেরও কিছু বেশি এবং তা ফুলটাইমারদের জাতীয় মাথাপিছু আয় (৪৩ হাজার) থেকে ৭ হাজার ডলার বেশি।
গত এক দশকে কানাডার নাগরিকদের গড় আয় বেড়েছে ৭.৩ ভাগ। এই আয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পরিসংখ্যান ব্যুরো তিনটি প্রধান বিষয়কে শনাক্ত করেছে। এক. প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বেড়েছে; দুই. সেই চাহিদা পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আরো বেশি সুশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা বের হয়ে অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে এবং তিন. চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকে জš§গ্রহণকারী বেবি বুমারগণ তাদের অভিজ্ঞতাকে আয় বৃদ্ধিতে কাজে লাগিয়েছেন।
অর্থনীতির ভাষায় যখন মাথাপিছু আয়ের কথা বলা হয় তখন কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে অনেক তথ্য ঢাকা পড়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় সবার সার্বিক আয় মন্দ নয় বরং বেশ ভালো। কিন্তু বাস্তব চিত্র তা সমর্থন করে না। বাস্তব চিত্র অনুধাবন করতে হলে ভেতরের চাপা পড়া তথ্য সমূহ বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন।
উপার্জনকারীদের মাত্র ৫ ভাগের আয় বছরে ৮০ হাজার ডলারের অধিক, অন্যদিকে ৪০ ভাগ লোকের আয় ২০ হাজার ডলারের নিচে। কানাডার জীবন যাত্রার মানের বিচারে বছরে ২৩ হাজার ডলারের নিচে আয় হল দারিদ্র্যতার লক্ষণ অর্থাৎ নিম্ন আয়। কারণ আয়ের পরিমাণ ভেদে মূল বেতন থেকে কম বেশি ২০ থেকে ৪৫ ভাগ অর্থ কেটে নেয়া হয় আয়কর, আয়-ইন্সুরেন্স, অবসরকালীন ভাতা ইত্যাদি খাতে। তাছাড়া বেশির ভাগ পণ্য কেনার সময় বিক্রয় কর দিতে হয় পণ্যমূল্যের পনেরো ভাগ। ফলে মূল আয়ের পয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ ভাগ চলে যায় বিবিধ কর প্রদানে। তার মানে কেউ যদি একশ ডলার আয় করে তবে সে তার নিজের প্রয়োজনে খচর করতে পারে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ ডলার। তার পর কিছু ব্যয় রয়েছে যা তাকে অবশ্যই প্রদান করতে হবে যেমন মর্টগেজ বা রেন্ট, টেলিফোন বিল, কেবল লাইন চার্জ, ইন্টারনেট বিল, ইউটিলিটিস বিল ইত্যাদি। যেসব পরিবারের আয় বছরে ৪০ হাজার ডলারের নিচে তারা তাদের আয়ের খুব সামান্য অংশই বিলাস বসনে ব্যয় করতে পারে এবং এই ধরনের লোকের সংখ্যাই অধিকÑ প্রায় সত্তর শতাংশ। বাদবাকী ৩০ শতাংশ লোকের মধ্যে ১৭ শতাংশ মধ্যবিত্ত, ৭ ভাগ স্বচ্চল মধ্যবিত্ত এবং ৫ ভাগকে উচ্চবিত্ত বলা চলে। আমার ধারণা অবশিষ্ট একভাগ নিশ্চয়ই বিত্তবৈভবে ধনী, যারা সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে!

আয় বৈষম্যের এই চিত্রের আরেকটি দিক রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে উচ্চ আয়ের দরজা হলো উচ্চশিক্ষা। কারণ অধিক আয়বানদের ৬০ ভাগের রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আর নিম্ন আয়ের ৬০ ভাগ লোকের শিক্ষার দৌড় হাইস্কুল পর্যন্ত।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় নিম্ন আয়ের অন্তত ৪০ ভাগ লোকের যে উচ্চশিক্ষা রয়েছে তারা কারা? তাদের কি পরিচয়? কেন তারা উচ্চ আয়ের দরজার পেছনে আটকে পড়ে গেছে? কেন তারা সেই দরজা অতিক্রমে ব্যর্থ? আর উচ্চ বেতনের চাকুরিজীবীদের যে ৪০ ভাগের শিক্ষার দৌড় হাইস্কুল পর্যন্ত, তারাই বা কারা? তাদের রং কি? কোনো মাপকাঠিতে তারা নিম্নবেতনের উচ্চশিক্ষিত শ্রমজীবিদের থেকে অধিকতর যোগ্য? এইসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পরিসংখ্যান রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এরা যেন কর্মক্ষেত্রে ছায়া-প্রচ্ছায়া রূপে ঘুরপাক খাচ্ছে। এরা যেন নাগরিকের ছায়ামাত্র, কখনোই সত্যিকার নাগরিকের মর্যাদা পাচ্ছে না। কোনো এক অদৃশ্য প্রেতের সাথে যুদ্ধ করে তারা ক্লান্ত এবং অবসন্ন। এই অসহায় ছায়া নাগরিকগণ হাল ছেড়ে দিয়ে বাধ্য রোবটের মত জীবনের গুণ টেনে যাচ্ছে। এই গুণ তাদের টানার কথা নয়। মেধা বিকিয়ে দিয়ে এরা গুণ টেনে টেনে পরিণত হয়েছে কলুর বলদে।
স¤প্রতি (মে ২০০৪) কানাডিয়ান বিজনেস ম্যাগানিজ ও অমনি টেলিভিশনের যৌথ উদ্যোগে ৪৫০টি প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালানো হয়। জরিপের উদ্দেশ্য হলো এইসব প্রতিষ্ঠানে কানাডার মাইনরিটি নাগরিকদের কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতাভিত্তিক অংশগ্রহণের অনুপাত বের করা। ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’ শিরোনামে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, কর্মক্ষেত্রে কানাডিয়ান সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব পরিমাপের জন্য এটাই প্রথম উদ্যোগ। দশমাস ব্যাপী পরিচালিত এই জরিপ চালাতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে অনেক অজানা তথ্য। প্রতিবেদক ভ্যালেরি মার্চেন্ট জানান যে, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে এই ধরনের তথ্য বের করে আনা ছিল এক কঠিন কাজ। প্রতিবেদক জানান, যখন কর্পোরেট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করা হয় তাদের প্রতিষ্ঠানে ভিজিবল মাইনরিটি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব কেমন, তখন অনেকেই অস্বস্তিবোধ করতে থাকে। কেউ কেউ জানান যে, এটা কোনো যুক্তিসঙ্গত বিষয় নয়। ভাবটা এমন যেন এটা একটা অশ্লীল প্রশ্ন! প্রতি বছর কানাডাতে গড়ে প্রায় দুই লাখ অভিবাসী প্রবেশ করছে। এদের প্রায় ৪০ ভাগ উচ্চশিক্ষা ও কর্ম-অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে নির্বাচিত। কানাডার চাকুরি বাজারে এরা যেন অনাহুত অতিথি। এদের খুব কম সংখ্যকই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরি পায়। বেশির ভাগই পূর্বেকার পদের থেকে অনেক নিচু পদে যোগ দেয়। তবে যে সমপর্যায়ের চাকুরি কেউ পায় না তা নয়। অন্তত আমার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে অনেকেই রয়েছে যারা রিসার্চ এসোসিয়েট, পদস্থ ব্যাংকার, আইনজীবি, পরিবেশবিদ, তড়িৎ প্রকৌশলী, আন্তর্জাল বিশারদ, ফাইন্যানসিয়াল এনালিস্ট পদে অধিষ্ঠিত। এরা সকলেই গত পাঁচ সাত বছরের মধ্যে কানাডার অভিবাসী হয়েছেন। তবে সামগ্রিক বিচারে এরা হলেন ব্যতিক্রমÑ বিরল সৌভাগ্যবান। বাদবাকী বৃহদাংশ বেছে নেয় কারখানা, রেস্টুরেন্ট, দোকানদারী, নিরাপত্তারক্ষী বা যানবাহন চালকের কাজ। টরান্টোর ক্যাব চালকদের দাবী তারা হল পৃথিবীর সবচে উচ্চশিক্ষিত ড্রাইভার। এদের মধ্যে প্রকৌশলী, কম্পিউটার প্রোগ্রামার এমনকি পিএইচডির সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
একদিন এক সুবেশী কানাডীয় ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে একটি চলমান ক্যাবে ঢুকে পড়লো। ক্যাব ড্রাইভারকে তাড়া দিলো যত দ্রæত সম্ভব তাকে ডাউন টাউন-এর একটি হাসপাতলে পৌঁছে দেয়ার জন্য কিন্তু বিধিবাম – সময়টা ছিল শুক্রবার বিকেল। ডাউন টাউনে যাবার পথে প্রচÐ ট্রাফিক।
যাত্রীর টেনশন দেখে ড্রাইভার তাকে শান্ত হবার জন্যে বললোÑ রিলাক্স, আপনার এত ব্যস্ততার কারণ কি জানতে পারি?
যাত্রীটি জানালো যে দীর্ঘ তিন মাসের অধিক সময় অপেক্ষার পর সে একজন নিউরো সার্জনের এপয়েন্টমেন্ট পেয়েছে। এই এপয়েন্টমেন্ট মিস হয়ে গেলে আরো কতদিন অপেক্ষা করতে হয় সে অনিশ্চয়তার কারণে সে অস্থির।
তখন ক্যাব ড্রাইভারটি যাত্রীকে মৃদু হেসে বললো, আমি যদি আমার কাজ করার সুযোগ পেতাম তা’হলে হয়তো আপনাকে এত অস্থির হতে হতো না।
ক্যাব ড্রাইভারের কথায় বিস্মিত হয়ে যাত্রীটি প্রশ্ন করলো, তার মানে? আপনি কিভাবে আমার সমস্যার সমাধান করতেন?
ক্যাব ড্রাইভারটি তখন যাত্রীকে জানালো, আমি নিজেই একজন নিউরো সার্জন।
ক্যাব ড্রাইভারের কথা শুনে যাত্রীটি থ’ হয়ে তাকিয়ে বললো, তাহলে আপনি এখানে কেন?
সেটাতো আমারও প্রশ্ন!
এই সব উচ্চশিক্ষিত অভিবাসী- যাদের বয়স ২৫ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে প্রচন্ড আয় বৈষম্যের শিকার। কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসাবে কাজ করুক আর এমবিএ হয়েও দোকানদার হিসাবে কাজ করুক, পরিসংখ্যান বলছে তারা তাদের সমপদের কানাডিয়ান সহকর্মীর থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কম বেতন পায়। যেন এদের যোগ্যতা সত্যিকার যোগ্যতা নয়, কাগুজে সনদপত্র মাত্র। এরা তো সত্যিকার নাগরিক নয়, নাগরিকের ছায়ামাত্র। এমবিএ হলেও দোকানদারের পদটি এদের অন্য অনেক!
স¤প্রতি (৩ মে, ২০০৩) কানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল দলের ফাইন্যান্স মিনিস্টার জন ম্যানলি সিবিএস নিউজ নেটওয়ার্কের একটি টিভি বিতর্কে স্বীকার করেছেন যে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আগত অভিবাসী যোগ্য চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য পেশাজীবিদেরকে কানাডার সরকার ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্টারিও প্রদেশে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রায় পাঁচ হাজার ডাক্তারের প্রয়োজন। হাসপাতালগুলোতে বিশেষত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দপ্তরে রোগীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষারত তালিকা। অথচ কানাডাতেই কর্মহীন অবস্থায় বসে আছেন অনেক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আগত অভিজ্ঞ চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ। ম্যানলি আরো বলেছেন যে এটা অত্যন্ত হাস্যকর যে এইসব পেশাজীবিদেরকে তাদের যোগ্যতার মাপকাঠিতে অভিবাসন দেয়া হয় অথচ তাদের ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কানাডার কর্মক্ষেত্রে এটা এক ধরনের বৈকল্য। এই লাল নীল ফিতার দৌরাত্ম্যে এবং প্রেত ও প্রচ্ছায়ার দ্বন্দ্বে অর্থনীতিতে পড়েছে এক কালোছায়া। এ প্রসঙ্গে ডাক্তার স্টেলা রহমানের একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল টরান্টোর একটি দৈনিক পত্রিকায়। সেখানে তিনি কৌতুক করে মন্তব্য করেছেন যে কানাডার বহিঃবিশ্বের নাগরিকরদের শরীরবৃত্তির এনাটমি, ফিজিওলজি কি অন্যরকম যে সেখানকার চিকিৎসকগণ এখানে কাজ করতে পারবেন না।
এতে যে দক্ষতার অপব্যয় এবং যোগ্যতার অপমান হচ্ছে শুধু তাই নয়, আশাহত অনেক প্রতিভাবান কর্মীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ছে। আর ফলশ্রুতিতে অর্থনীতির চাকাও শ্লথ গতিতে চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি দেশ হওয়া সত্তেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৌড়ে কানাডা পিছিয়ে পড়ছে অথচ প্রাকৃতিক সম্পদ, দক্ষ কর্মশক্তি বা শিক্ষার মান কোনোটাতেই কানাডার কমতি নেই। কমতি শুধু দক্ষশক্তির চতুর ব্যবহারের।
বিপরীত পক্ষে, কানাডার স্থানীয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ বলছে যে পৃথিবীর সবদেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা অন্যান্য পেশাজীবিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার মান ও কর্মঅভিজ্ঞতার ধরন তাদের জানা নেই। জনস্বাস্থ্য এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ক্ষেত্র যে দুম করে সেখানে যে কোনো চিকিৎসককে বসিয়ে দেয়া যায় না। আর যাচাই বাছাই করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ক্ষেত্র বিশেষে জটিল। যদিও বিশ্ব বিদ্যালয়গুলোতে বিদেশী সনদপত্রের সমতা প্রদানকারী সার্টিফিকেট দেয়া হয়, তবে তা চাকুরিদাতাদের কাছে খুব একটা আমল পায় না। বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষজনশক্তির উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান সে ভ‚মিকা পালন করতে পারতো। অবশ্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং নীতি নির্ধারকদের সদিচ্ছার বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য।
আর বৈষম্যের অপর একটি চিত্র রয়েছে যা ইঙ্গিত করছে মহিলাদের জন্য কানাডা ক্রমশ আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। পুরুষ এবং নারীর আয় বৈষম্য গত দুই দশকে অনেক কমে এসেছে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মহিলারা কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করছে এবং উচ্চআয়ের পেশাগুলোতে মহিলাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে।
আশির দশকে একজন মহিলা যেখানে তার পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় ৬০ শতাংশ আয় করতো নব্বইর দশকের শেষের দিকে সেই বৈষম্য কমে গেল ১০ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমান সময়ে একজন মহিলা তার পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় আয় করেন ৭০ শতাংশ। এই বৈষম্যের কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে জটিল কিছু বিষয়। যেমন, সর্বমোট কার্যঘণ্টা, কাজের প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতা এবং ঘণ্টাভিত্তিক মজুরী হার। অর্থাৎ মহিলারা সাধারণত যে ধরনের কাজ বেছে নেন তাতে মজুরী হার কম অথবা তাদের রয়েছে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি। তবে গত দুই দশকে পুরুষদের গড় আয় যেখানে স্থবির সেখানে মহিলাদের গড় আয় প্রতি দশকে তেরো ভাগ বেড়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে আশির দশকে যেখানে ৫০ লাখ মহিলা কর্মরত ছিলেন, নব্বই দশকে তা উন্নীত হয়েছে ৭৫ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ৫০ ভাগ নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে। অপরপক্ষে, একই সময়ে পুরুষ উপার্জনকারী বেড়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ – ৭২ লাখ থেকে ৮৫ লাখ। ৮০ সালে যেখানে মহিলা কর্মীর সংখ্যা ছিল ৪০ শতাংশ, ২০০০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে। নারী ও পুরুষকর্মীর অনুপাত প্রায় কাঁধে কাঁধ মেলানো।
আজকের তরুণরা অবশ্য বেশি অগ্রসর। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং কর্মজীবনে বেছে নিচ্ছে অধিক আয়ের পেশাসমূহ প্রধানত – আইন, মেডিসিন, বিপণন ইত্যাদি। সমীক্ষায় দেখা যায় যে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের তরুণীরা তাদের পুরুষ সহকর্মীর আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অর্থ উপার্জন করছে। কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও উপার্জন বেড়ে যাবার ফলে এবং পেশাগত সাফল্য ও প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বিলম্বে বিয়ে করছে বা একেবারেই করছে না। এবং বিয়ে করলেও অনেকে সন্তান নিচ্ছেন না বা নিলেও বিলম্বে কম সন্তান ধারণ করছেন। আর যেহেতু উচ্চাকাঙ্খী মহিলাদের অধিকাংশ জন্মসূত্রে কানাডিয়ান শ্বেতাংগ, তাই শ্বেতাংগ জন্মহারও ক্রমশ কমছে। স্ট্যাটিসটিকস কানাডার এক রিপোর্টে দেখা যায় যে সত্তর দশকের শেষ দিকে মেয়েদের বিয়ে করার গড় বয়স ছিল ২২ বছর। নব্বই দশকের শেষ দিকে অর্থাৎ দুই দশক পর তা পিছিয়ে গেল ২৭ বছরে। আর সত্তর দশকে একজন মহিলা যেখানে তিনটি সন্তান ধারণ করতো নব্বই-র দশকে তা কমে এলো দেড়জনে। অন্যদিকে সত্তর দশকে যেখানে ৫০ ভাগ মহিলা উপার্জন করতো এখন সেখানে ৮০ ভাগ কাজে যোগ দিয়েছেন।
কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অধিক অংশগ্রহণের সাথে সাথে ভেঙ্গে পড়ছে সনাতনী পরিবার প্রথা। আর অধিক সংখ্যক নারী ও পুরুষ ঝুঁকে পড়ছে একাকী জীবন অথবা বিবাবহীন একত্র বসবাসে। দুই দশক আগে বিবাহহীন একত্র বসবাসকারী নারী পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখের ওপর। গত দুই দশকে বিবাহহীন দম্পত্তির হার ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশ। একই সাথে সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। ১৯৮১ সালে সন্তানহীন সম্পতির সংখ্যা ছিল ৩৪ শতাংশ, ২০০১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশ। এই ধারা চলতে থাকলে একুশ শতকে যে দৃশ্যটি পরিদৃষ্ট হবে তা হল অপেক্ষাকৃত নবাগত অভিবাসীগণ সনাতনী পরিবার প্রথা বজায় রাখছে এবং সন্তান ধারণ ও লালন পালন করছে। এবং এই অভিবাসীরাই হবে একুশ শতকের কানাডার কর্ণধার।

- Advertisement -

Read More

Recent